{{ news.section.title }}
হরমুজের পর এবার বাব আল-মান্দেব? হুথিদের নতুন হুমকিতে বিশ্ব বাণিজ্য ও তেলবাজারে
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত নতুন এক বিপজ্জনক মোড়ে পৌঁছানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার পর এবার লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার বাব আল-মান্দেব প্রণালিও বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি আন্দোলন। বিশ্লেষকদের মতে, যদি এই হুমকি বাস্তবে রূপ নেয়, তাহলে বিশ্বের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ একসঙ্গে ঝুঁকির মুখে পড়বে, যার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর।
যুক্তরাষ্ট্রের ইরানে ধারাবাহিক বিমান হামলা এবং একই সময়ে হুথিদের সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের ধারণা, তেহরান সংঘাতকে শুধু পারস্য উপসাগরে সীমাবদ্ধ না রেখে লোহিত সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত করার কৌশল নিতে পারে, যাতে ওয়াশিংটনের ওপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানো যায়।
এরই মধ্যে ইরান হরমুজ প্রণালিকে কৌশলগত চাপ সৃষ্টির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার সক্ষমতা দেখিয়েছে। এখন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের নজর বাব আল-মান্দেবের দিকে। এই সংকীর্ণ জলপথটি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে এবং সৌদি আরব, ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে তেল ও পণ্যবাহী জাহাজ চলাচলের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ব বাণিজ্যের উল্লেখযোগ্য অংশ এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপগামী বিপুল পরিমাণ জ্বালানি এই পথ ব্যবহার করে পরিবাহিত হয়। ফলে এই রুটে সামান্য অস্থিরতাও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
সোমবার ইয়েমেনের হুথি আন্দোলনের রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য মোহাম্মদ আল-ফারাহ সতর্ক করে বলেন, সৌদি আরব যদি ইয়েমেনে সামরিক হামলা অব্যাহত রাখে, তাহলে বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভিকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি দাবি করেন, এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব-দুটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথই একযোগে অচল হয়ে যেতে পারে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। তবে এই মূল্য পূর্বাভাস হুথি নেতার দাবি; এটি আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থাগুলোর নিশ্চিত পূর্বাভাস নয়।
আল-ফারাহ আরও অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে ইয়েমেনে নতুন হামলা চালাতে উৎসাহ দিচ্ছে। তার ভাষায়, এমন পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের নিজের স্বার্থেরও পরিপন্থী হবে। যদিও ওয়াশিংটন বা রিয়াদ এ অভিযোগের পক্ষে কোনো স্বীকৃতি দেয়নি।
মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ফাওয়াজ গেরগেস রয়টার্সকে বলেন, ইরান এখন যুক্তরাষ্ট্রকে দেখাতে চাইছে যে প্রয়োজন হলে তারা একই সময়ে হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব-দুটি কৌশলগত সমুদ্রপথকেই ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। তার মতে, এতে সংঘাত শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বৈশ্বিক জ্বালানি ও সামুদ্রিক বাণিজ্যের নিরাপত্তাও সরাসরি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।
বিশ্লেষকদের মতে, সবচেয়ে বড় আশঙ্কা তাৎক্ষণিক সর্বাত্মক যুদ্ধ নয়; বরং ধাপে ধাপে উত্তেজনা বাড়তে থাকা। সামরিক ও কূটনৈতিক মহলে এই পরিস্থিতিকে "মিশন ক্রিপ" হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে, যেখানে উভয় পক্ষ সংঘাতের মাত্রা ধীরে ধীরে বাড়ালেও সরাসরি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে। কিন্তু প্রতিটি নতুন পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তোলে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক মধ্যপ্রাচ্য শান্তি আলোচক ডেনিস রসের মতে, ওয়াশিংটনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করা, যাতে ইরান আবারও আলোচনার টেবিলে ফিরতে রাজি হয় এবং শুধু আলোচনা নয়, একটি গ্রহণযোগ্য সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই সম্ভাবনা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
হুথিরা অতীতেও বাব আল-মান্দেবে তাদের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তারা লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে ধারাবাহিক হামলা চালায়। তাদের দাবি ছিল, এসব হামলার লক্ষ্য ছিল ইসরায়েলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজ। তবে হামলার কারণে বিশ্বের বৃহত্তম শিপিং কোম্পানিগুলোর অনেকেই নিরাপত্তার কারণে জাহাজগুলোকে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরিয়ে ইউরোপে পাঠাতে শুরু করে। এতে পরিবহন ব্যয় ও যাত্রার সময় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য হুথি অবস্থানে বিমান হামলা চালায় এবং বহুজাতিক নৌবাহিনী লোহিত সাগরে টহল জোরদার করে।
লন্ডনের কিংস কলেজের নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষক আন্দ্রেয়াস ক্রিগের মতে, বাব আল-মান্দেব বন্ধ করার হুমকি ইরানের জন্য এক ধরনের "শেষ কৌশলগত বিকল্প"। তার মূল্যায়ন অনুযায়ী, যদি যুক্তরাষ্ট্র ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর হামলা আরও জোরদার করে, তাহলে তেহরান হুথিদের মাধ্যমে লোহিত সাগরের এই গুরুত্বপূর্ণ পথেও চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এতে হরমুজ প্রণালির সংকটের পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে আরও বড় ধাক্কা লাগতে পারে।
সৌদি আরবভিত্তিক গালফ রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান আবদুলআজিজ সাগের বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর একটি বড় অংশ মনে করছে, ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ আগের তুলনায় অনেক সংকুচিত হয়েছে। তবে তিনি একই সঙ্গে সতর্ক করে বলেন, হুথিরা সামুদ্রিক পথ ব্যাহত করার সক্ষমতা রাখলেও তেহরানের স্পষ্ট নির্দেশনা ছাড়া বড় ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনা কম। তার মতে, যদি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের বিরুদ্ধে নতুন অভিযান শুরু হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা হুথিদের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করতে আরও বড় সামরিক অভিযান চালাতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে প্রতিটি সামরিক পদক্ষেপ শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তাই নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থাকেও প্রভাবিত করতে পারে। বিশেষ করে হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব-এই দুটি কৌশলগত জলপথ একসঙ্গে অস্থিতিশীল হয়ে পড়লে তার প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বব্যাপী অনুভূত হতে পারে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স