{{ news.section.title }}
ইরান ইস্যুতে ট্রাম্পের ১.১৫ ট্রিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা বিল আটকে দিলেন ডেমোক্র্যাটরা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান-নীতি ঘিরে ওয়াশিংটনে রাজনৈতিক বিভাজন আরও গভীর হয়েছে। ইরানের সঙ্গে চলমান সামরিক সংঘাত এবং কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধে জড়ানোর অভিযোগ তুলে সিনেটে ১ দশমিক ১৫ ট্রিলিয়ন ডলারের বার্ষিক প্রতিরক্ষা নীতিমালা বিল (ন্যাশনাল ডিফেন্স অথরাইজেশন অ্যাক্ট বা এনডিএএ) আটকে দিয়েছেন ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ প্রতিরক্ষা বাজেট অনুমোদনের প্রক্রিয়া আপাতত স্থগিত হয়ে গেছে।
মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত প্রক্রিয়াগত ভোটে বিলটি এগিয়ে নেওয়ার পক্ষে ৫০ জন সিনেটর ভোট দিলেও বিপক্ষে ভোট পড়ে ৪৬টি। তবে মার্কিন সিনেটের নিয়ম অনুযায়ী বিতর্ক শেষ করে বিলটি পরবর্তী ধাপে নিতে অন্তত ৬০টি ভোটের প্রয়োজন ছিল। সেই সমর্থন না পাওয়ায় বিলটি এগোতে পারেনি। ভোটাভুটি মূলত দলীয় অবস্থান অনুযায়ী হয়েছে। রিপাবলিকানদের প্রায় সবাই বিলটির পক্ষে ভোট দিলেও সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা জন থুন কৌশলগত কারণে বিপক্ষে ভোট দেন, যাতে পরবর্তীতে একই বিল পুনর্বিবেচনার জন্য আবারও সিনেটে তোলা যায়।
ডেমোক্র্যাটদের অভিযোগ, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করেছেন এবং এখন সেই যুদ্ধের মধ্যেই বিশাল অঙ্কের প্রতিরক্ষা বাজেট অনুমোদনের চেষ্টা করছেন। সিনেটে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমার বলেন, "ট্রাম্প কোনো অনুমোদন ছাড়া, কোনো সুস্পষ্ট কৌশল ছাড়া এবং কোনো প্রস্থান পরিকল্পনা ছাড়াই এই যুদ্ধ শুরু করেছেন।" তার মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে এই বিলের পক্ষে ভোট দেওয়া মানে ইরানে চলমান সামরিক অভিযানের প্রতি কংগ্রেসের নীরব সমর্থন জানানো।
ডেমোক্র্যাটদের আরেকটি বড় আপত্তি প্রতিরক্ষা ব্যয়ের আকার নিয়ে। এনডিএএ বিলে ১.১৫ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয়ের অনুমোদন চাওয়া হয়েছে। এর বাইরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বাজেট সমন্বয় (Budget Reconciliation) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আরও ৩৫০ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা ব্যয় অনুমোদনের অনুরোধ জানিয়েছেন। সব মিলিয়ে তার প্রশাসন প্রায় ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের সামরিক ব্যয় পরিকল্পনা করছে। ডেমোক্র্যাটদের অভিযোগ, সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা এবং অন্যান্য জনকল্যাণমূলক কর্মসূচিতে ব্যয় কমানোর মধ্যেও প্রতিরক্ষা খাতে নজিরবিহীন অর্থ বরাদ্দের চেষ্টা করা হচ্ছে।
এই ভোটাভুটি এমন সময়ে হয়েছে, যখন ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক চাপ আরও বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। প্রশাসন জানিয়েছে, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর পুনরায় নৌ অবরোধ কার্যকর করা হয়েছে এবং একই সঙ্গে নতুন করে বিমান হামলাও শুরু হয়েছে। এর ফলে ইরান যুদ্ধ নিয়ে ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে।
রিপাবলিকানরা অবশ্য ডেমোক্র্যাটদের অবস্থানের তীব্র সমালোচনা করেছেন। সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা জন থুন বলেন, জাতীয় নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে রাজনৈতিক বিরোধিতার হাতিয়ার বানানো উচিত নয়। তার ভাষায়, এই বিল যুক্তরাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনীকে বর্তমান ও ভবিষ্যতের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত রাখবে। তিনি বলেন, সেনা সদস্যদের বেতন বৃদ্ধি, নতুন যুদ্ধজাহাজ, যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ড্রোন প্রযুক্তি এবং উদীয়মান ভূরাজনৈতিক হুমকি মোকাবিলার জন্য এই আইন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এনডিএএ যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আইন। এটি শুধু প্রতিরক্ষা বাজেট নির্ধারণ করে না; বরং সেনাবাহিনীর জনবল, আধুনিক অস্ত্র ক্রয়, সামরিক গবেষণা, ঘাঁটি পরিচালনা, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং সামরিক সদস্যদের সুযোগ-সুবিধাসহ প্রতিরক্ষা নীতির প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নির্ধারণ করে। গত ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রতি বছর এই আইন কংগ্রেসে পাস হয়েছে এবং এটি যুক্তরাষ্ট্রের অল্প কয়েকটি আইনগুলোর একটি, যা সাধারণত দুই দলের সমর্থন পেয়ে থাকে।
তবে চলতি বছর পরিস্থিতি ভিন্ন। ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ডেমোক্র্যাটদের বড় একটি অংশ মনে করছে, বর্তমান বিলটি পাস হলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সামরিক পদক্ষেপ আরও শক্তিশালী রাজনৈতিক সমর্থন পাবে। তাদের দাবি, যুদ্ধের লক্ষ্য, কৌশল, সময়সীমা এবং কংগ্রেসের সাংবিধানিক ভূমিকা স্পষ্ট না করে এত বড় সামরিক বাজেট অনুমোদন দেওয়া উচিত নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী যুদ্ধ ঘোষণার ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে। ১৯৭৩ সালের War Powers Resolution অনুযায়ী, কংগ্রেসের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ছাড়া প্রেসিডেন্ট সেনা মোতায়েন করলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কংগ্রেসকে অবহিত করতে হয় এবং দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান চালাতে আইনপ্রণেতাদের সম্মতি প্রয়োজন। ডেমোক্র্যাটদের অভিযোগ, ট্রাম্প প্রশাসন এই সাংবিধানিক প্রক্রিয়াকে যথাযথভাবে অনুসরণ করেনি।
তবে এই ভোটে বিলটি আটকে গেলেও আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া এখানেই শেষ হয়ে যাচ্ছে না। মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) এবং সিনেট পৃথকভাবে নিজ নিজ সংস্করণের এনডিএএ পাস করার পর উভয় কক্ষের সদস্যদের নিয়ে একটি যৌথ কমিটি চূড়ান্ত সমঝোতা সংস্করণ তৈরি করবে। পরে সেটি আবার প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে ভোটে তোলা হবে। উভয় কক্ষের অনুমোদন পেলে বিলটি প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের জন্য হোয়াইট হাউসে পাঠানো হবে। প্রেসিডেন্ট চাইলে তাতে স্বাক্ষর করে আইন কার্যকর করতে পারবেন অথবা ভেটোও দিতে পারবেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ডেমোক্র্যাটদের এই পদক্ষেপ শুধু একটি প্রতিরক্ষা বিল আটকে দেওয়ার ঘটনা নয়; বরং এটি ইরান যুদ্ধ, কংগ্রেসের সাংবিধানিক ক্ষমতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ প্রতিরক্ষা নীতিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বড় রাজনৈতিক সংঘাতের ইঙ্গিত বহন করছে। বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য নীতি এবং সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির পরিকল্পনা আগামী সপ্তাহগুলোতে মার্কিন রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কে পরিণত হতে পারে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স