৪০ বছর পর বিশ্বকাপে আবার মুখোমুখি আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড, ফিরছে ‘হ্যান্ড অব গড’-এর সেই ইতিহাস

৪০ বছর পর বিশ্বকাপে আবার মুখোমুখি আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড, ফিরছে ‘হ্যান্ড অব গড’-এর সেই ইতিহাস
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

চার দশকের অপেক্ষার অবসান। আবারও বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে ফুটবল বিশ্বের দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপের সেই ঐতিহাসিক লড়াইয়ের ৪০ বছর পর আবার বিশ্বকাপের নকআউট মঞ্চে দেখা হচ্ছে দুই দলের। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত এই দ্বৈরথ ঘিরে ইতোমধ্যেই বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোও ম্যাচটিকে এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম বড় আকর্ষণ হিসেবে দেখছে।

আগামী ১৫ জুলাই (বাংলাদেশ সময় রাত ১টা) যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়ার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে এই বহুল প্রতীক্ষিত সেমিফাইনাল। ম্যাচটির বিজয়ী জায়গা করে নেবে ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে।

 

কঠিন পথ পেরিয়ে শেষ চারে দুই পরাশক্তি

ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার সেমিফাইনালে ওঠার পথ মোটেও সহজ ছিল না। শেষ ৩২-এ কেপ ভার্দের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে ৩-২ গোলের নাটকীয় জয়, শেষ ষোলোতে মিসরের বিপক্ষে ২-০ পিছিয়ে থেকেও ৩-২ ব্যবধানে অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন এবং কোয়ার্টার ফাইনালে ১০ জনের সুইজারল্যান্ডকে অতিরিক্ত সময়ে ৩-১ গোলে হারিয়ে শেষ চার নিশ্চিত করে লিওনেল স্কালোনির দল। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে নির্ধারিত সময়ে ১-১ সমতা থাকলেও জুলিয়ান আলভারেজ ও লাওতারো মার্টিনেজের অতিরিক্ত সময়ের দুই গোলে জয় নিশ্চিত হয় আলবিসেলেস্তেদের।

 

অন্যদিকে থমাস টুখেলের অধীনে ইংল্যান্ডও দুর্দান্ত ছন্দে রয়েছে। শেষ ৩২-এ মেক্সিকোকে ৩-২ গোলে হারানোর পর কোয়ার্টার ফাইনালে ডার্ক হর্স নরওয়েকে ২-১ ব্যবধানে বিদায় করে সেমিফাইনালে ওঠে থ্রি লায়ন্সরা। নরওয়ের বিপক্ষে জুড বেলিংহ্যামের জোড়া গোলই পার্থক্য গড়ে দেয়। টুখেলের দল টানা পাঁচটি বড় টুর্নামেন্টের মধ্যে চতুর্থবারের মতো সেমিফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে।

 

ফিরছে ১৯৮৬-এর সেই অমর স্মৃতি

আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড নাম দুটি উচ্চারিত হলেই ফিরে আসে ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের কথা। আজতেকা স্টেডিয়ামে দিয়েগো ম্যারাডোনা মাত্র চার মিনিটের ব্যবধানে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত এবং সবচেয়ে নান্দনিক-দুটি গোলই করেছিলেন।

 

প্রথম গোলটি ছিল বিখ্যাত 'হ্যান্ড অব গড', যেখানে হাত দিয়ে বল জালে পাঠিয়েও গোল আদায় করে নেন ম্যারাডোনা। আর কয়েক মিনিট পর মাঝমাঠ থেকে বল নিয়ে পাঁচজন ইংলিশ খেলোয়াড় ও গোলরক্ষককে কাটিয়ে করেন সেই অবিশ্বাস্য গোল, যেটিকে পরে ফিফা "গোল অব দ্য সেঞ্চুরি" হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। শেষ পর্যন্ত ২-১ ব্যবধানে জিতে আর্জেন্টিনা সেমিফাইনালে ওঠে এবং পরে বিশ্বকাপও জেতে।

 

শুধু ফুটবল নয়, ইতিহাসও জড়িয়ে আছে

আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুধু ফুটবলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ডস (মালভিনাস) যুদ্ধের মাত্র চার বছর পর হয়েছিল ১৯৮৬ সালের সেই বিশ্বকাপ ম্যাচ। তাই আর্জেন্টিনার অনেক মানুষের কাছে ম্যারাডোনার জয় ছিল কেবল একটি ফুটবল ম্যাচ নয়, বরং জাতীয় গৌরবের প্রতীকও। এই ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট দুই দেশের ফুটবল দ্বৈরথকে আরও আবেগঘন করে তুলেছে।

 

বিশ্বকাপে মুখোমুখি ইতিহাস

বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত পাঁচবার মুখোমুখি হয়েছে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড।

  • ১৯৬২ – ইংল্যান্ড ৩-১ আর্জেন্টিনা
  • ১৯৬৬ – ইংল্যান্ড ১-০ আর্জেন্টিনা (কোয়ার্টার ফাইনাল)
  • ১৯৮৬ – আর্জেন্টিনা ২-১ ইংল্যান্ড (কোয়ার্টার ফাইনাল)
  • ১৯৯৮ – ২-২ ড্র, টাইব্রেকারে আর্জেন্টিনার জয়
  • ২০০২ – ইংল্যান্ড ১-০ আর্জেন্টিনা


অর্থাৎ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড তিনবার জিতলেও নকআউট পর্বে আর্জেন্টিনা এগিয়ে রয়েছে।

 

নতুন প্রজন্মের নতুন লড়াই

এবার অবশ্য ম্যারাডোনা কিংবা বেকহ্যামের যুগ নয়। এখন লড়াই হবে লিওনেল মেসি বনাম জুড বেলিংহ্যাম, এনজো ফার্নান্দেজ বনাম ডেকলান রাইস, জুলিয়ান আলভারেজ বনাম জন স্টোনস কিংবা লাওতারো মার্টিনেজ বনাম মার্ক গেহিদের মধ্যে।

 

৩৯ বছর বয়সী মেসি এখনও আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় ভরসা। অন্যদিকে জুড বেলিংহ্যাম ইংল্যান্ডের নকআউট পর্বের দুই ম্যাচেই জোড়া গোল করে দুর্দান্ত ফর্মে রয়েছেন। দুই দলের মাঝমাঠের লড়াইও ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

 

ইতিহাস নাকি নতুন অধ্যায়?

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর বিশ্লেষণে এই ম্যাচকে এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে আবেগঘন ও ঐতিহাসিক সেমিফাইনাল হিসেবে দেখা হচ্ছে। একদিকে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জিতে ইতিহাস গড়ার স্বপ্নে আর্জেন্টিনা, অন্যদিকে ১৯৬৬ সালের পর প্রথম বিশ্বকাপ শিরোপা জয়ের আশায় ইংল্যান্ড।

 

১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনা লিখেছিলেন ইতিহাস। চার দশক পর একই মঞ্চে এবার মেসি, বেলিংহ্যাম, কেইন কিংবা আলভারেজদের মধ্যে কে লিখবেন নতুন ইতিহাস-সেই উত্তর মিলবে মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামের ৯০ মিনিট, কিংবা তারও বেশি সময়ের লড়াই শেষে।,


সম্পর্কিত নিউজ