{{ news.section.title }}
সুইজারল্যান্ডকে ৩–১ গোলে হারিয়ে সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে নাটক যেন আর্জেন্টিনার পিছুই ছাড়ছে না। শেষ ষোলোতে মিসরের বিপক্ষে ২-০ গোলে পিছিয়ে থেকেও অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন করেছিল লিওনেল স্কালোনির দল। এবার কোয়ার্টার ফাইনালেও আরেকটি কঠিন পরীক্ষা পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত সেমিফাইনালে জায়গা করে নিল বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।
কানসাস সিটির বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালে নির্ধারিত সময়ে ১-১ সমতায় থাকা ম্যাচে অতিরিক্ত সময়ে জুলিয়ান আলভারেজ ও লাওতারো মার্টিনেজের গোলে সুইজারল্যান্ডকে ৩-১ ব্যবধানে হারিয়েছে আর্জেন্টিনা। এই জয়ে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপার স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখল আলবিসেলেস্তেরা। সেমিফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড।
ম্যাচ শুরুর আগে আবেগঘন এক মুহূর্তের সাক্ষী হয় কানসাস সিটি স্টেডিয়াম। সদ্য প্রয়াত আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি আন্তোনিও রাতিনের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে কালো আর্মব্যান্ড পরে মাঠে নামেন লিওনেল মেসি ও তার সতীর্থরা। একই সঙ্গে সম্প্রতি মারা যাওয়া দক্ষিণ আফ্রিকার মিডফিল্ডার জেডেন অ্যাডামসের স্মরণে দুই দল এক মিনিট নীরবতা পালন করে।
খেলা শুরু হতেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে আর্জেন্টিনা। এরই ফল মেলে ১০ মিনিটে। লিওনেল মেসির কর্নার থেকে দুর্দান্ত হেডে বল জালে পাঠিয়ে দলকে এগিয়ে দেন অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার। বিশ্বকাপে এটি ছিল লিভারপুল মিডফিল্ডারের গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি গোল, আর মেসির জন্য আরেকটি অ্যাসিস্ট।
তবে গোল খাওয়ার পর ভেঙে পড়েনি সুইজারল্যান্ড। গ্রানিত জাকার নেতৃত্বে মাঝমাঠে দারুণ লড়াই করে তারা ধীরে ধীরে ম্যাচে ফিরে আসে। ড্যান এনদোয়ে, রিকার্দো রদ্রিগেজ ও জিব্রিল সাওয়ের সমন্বয়ে একাধিকবার আর্জেন্টিনার রক্ষণে চাপ সৃষ্টি করে সুইসরা। প্রথমার্ধেই এমিলিয়ানো মার্টিনেজকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সেভ করতে হয়।
বিরতির পর সুইজারল্যান্ড আরও সাহসী হয়ে ওঠে। ৫০ মিনিটে দারুণ একটি সুযোগ পেলেও লিসান্দ্রো মার্টিনেজের অসাধারণ ডিফেন্ডিংয়ে গোল থেকে বঞ্চিত হয় তারা। কিন্তু ৬৭ মিনিটে আর রক্ষা হয়নি। রিকার্দো রদ্রিগেজের নিখুঁত পাস থেকে ড্যান এনদোয়ে গোল করে ম্যাচে সমতা ফেরান। গোলটি পুরো ম্যাচের চিত্রই বদলে দেয়।
গোলের পর ম্যাচে নাটকীয়তা আরও বাড়ে। ৭২ মিনিটে লিয়ান্দ্রো পারেদেসের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় প্রথমে পারেদেসকে হলুদ কার্ড দেখান পর্তুগিজ রেফারি জোয়াও পিনহেইরো। কিন্তু ভিএআরের সাহায্যে ফিফার নতুন "Mistaken Identity Protocol" প্রয়োগ করে সিদ্ধান্ত বদলানো হয়। রিপ্লেতে দেখা যায়, ব্রিল এমবোলো ডাইভ দিয়েছিলেন। ফলে পারেদেসের হলুদ কার্ড বাতিল করে দ্বিতীয় হলুদ দেখিয়ে মাঠ থেকে বের করে দেওয়া হয় এমবোলোকে। এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ম্যাচের পর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা হয়।
একজন কম নিয়েও দারুণ লড়াই চালিয়ে যায় সুইজারল্যান্ড। নির্ধারিত সময়ের শেষ দিকে মেসি, আলভারেজ, ম্যাক অ্যালিস্টার ও নিকো গনসালেস একের পর এক সুযোগ তৈরি করলেও দুর্দান্ত গোলকিপিং করেন গ্রেগর কোবেল। ফলে ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে।
অতিরিক্ত সময়ের প্রথম ১৫ মিনিটেও গোলের দেখা মেলেনি। আর্জেন্টিনা বলের দখল ধরে রাখলেও সুইস রক্ষণ ছিল অবিচল। মনে হচ্ছিল ম্যাচটি হয়তো টাইব্রেকারেই গড়াবে।
কিন্তু ১১২ মিনিটে ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেন জুলিয়ান আলভারেজ। প্রায় ২৫ গজ দূর থেকে নেওয়া তাঁর দুর্দান্ত বাঁকানো শট কোবেলের নাগালের বাইরে দিয়ে জড়িয়ে যায় জালে। দীর্ঘ সময় ধরে সমতা ধরে রাখা সুইজারল্যান্ড মুহূর্তেই পিছিয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে আলভারেজের এই গোলকেই উল্লেখ করেছে।
গোল খাওয়ার পর মরিয়া হয়ে ওঠে সুইজারল্যান্ড। তবে সেই সুযোগেই পাল্টা আক্রমণে আরেকটি আঘাত হানে আর্জেন্টিনা। অতিরিক্ত সময়ের যোগ করা মুহূর্তে দ্রুতগতির কাউন্টার অ্যাটাক থেকে লাওতারো মার্টিনেজ গোল করে ৩-১ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করেন।
স্কোরলাইন শেষ পর্যন্ত ৩-১ হলেও ম্যাচটি মোটেও একপেশে ছিল না। বলের নিয়ন্ত্রণে আর্জেন্টিনা এগিয়ে থাকলেও সুইজারল্যান্ড পুরো ম্যাচজুড়েই সংগঠিত ফুটবল খেলেছে। বিশেষ করে গ্রানিত জাকা মাঝমাঠে অসাধারণ নেতৃত্ব দিয়েছেন, আর কোবেল একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সেভ করে দলকে দীর্ঘ সময় ম্যাচে টিকিয়ে রেখেছিলেন।
লিওনেল মেসির টানা বিশ্বকাপে গোল করার ধার এই ম্যাচে থেমে গেলেও তিনি আবারও দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। প্রথম গোলের অ্যাসিস্ট করেন, একাধিক সুযোগ তৈরি করেন এবং পুরো ম্যাচজুড়ে সুইস রক্ষণকে ব্যস্ত রাখেন। অন্যদিকে এমিলিয়ানো মার্টিনেজও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সেভ করে আর্জেন্টিনাকে ম্যাচে ধরে রাখেন।
এই জয় শুধু সেমিফাইনালে ওঠার গল্প নয়, বরং আর্জেন্টিনার মানসিক দৃঢ়তারও আরেকটি প্রমাণ। শেষ ষোলোতে মিসরের বিপক্ষে অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের পর এবার সুইজারল্যান্ডের কঠিন প্রতিরোধ ভেঙে আবারও নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব দেখাল স্কালোনির শিষ্যরা। তবে সামনে আরও বড় পরীক্ষা। সেমিফাইনালে অপেক্ষা করছে হ্যারি কেইনের ইংল্যান্ড। আর বিশ্বকাপ ধরে রাখার স্বপ্ন পূরণ করতে হলে সেই পরীক্ষাতেও উতরে যেতে হবে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের।