বেলিংহামের জোড়া গোলে সেমিফাইনালে ইংল্যান্ড

বেলিংহামের জোড়া গোলে সেমিফাইনালে ইংল্যান্ড
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে নাটক, বিতর্ক, উত্তেজনা আর অতিরিক্ত সময়ের লড়াই-সবকিছু মিলিয়ে স্মরণীয় এক ম্যাচ উপহার দিল ইংল্যান্ড ও নরওয়ে। মিয়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এই লড়াইয়ে জুড বেলিংহামের জোড়া গোলে ২-১ ব্যবধানে জয় তুলে নিয়ে সেমিফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে ইংল্যান্ড। তবে ম্যাচটি যতটা না বেলিংহামের পারফরম্যান্সের জন্য আলোচিত, তার চেয়েও বেশি আলোচনা হচ্ছে রেফারিং, ভিএআর এবং একটি বিতর্কিত সমতাসূচক গোল নিয়ে।

ম্যাচের শুরু থেকেই বলের দখল ছিল ইংল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণে। টমাস টুখেলের দল ছোট ছোট পাসে আক্রমণ গড়ার চেষ্টা করলেও নরওয়ের সুশৃঙ্খল রক্ষণ তাদের খুব বেশি জায়গা দিচ্ছিল না। জুড বেলিংহাম, ডেকলান রাইস, এলিয়ট অ্যান্ডারসন এবং হ্যারি কেন মাঝমাঠ থেকে খেলা গড়ে তুললেও প্রথম ২০ মিনিটে পরিষ্কার গোলের সুযোগ খুব কমই তৈরি করতে পারে থ্রি লায়ন্স।

 

অন্যদিকে নরওয়ে অপেক্ষা করছিল দ্রুত পাল্টা আক্রমণের। আর্লিং হালান্ড, আন্দ্রেয়াস শেলদেরুপ ও আলেকজান্ডার সোরলোথকে সামনে রেখে কয়েকবার দ্রুতগতির আক্রমণ চালায় তারা।

 

প্রথম বড় সুযোগটি আসে নরওয়ের কাছ থেকেই। হালান্ডের একটি শক্তিশালী হেড দারুণভাবে রুখে দেন জর্ডান পিকফোর্ড। গোলরক্ষকের এই সেভ ইংল্যান্ডকে শুরুতেই পিছিয়ে পড়া থেকে বাঁচায়।

 

তবে কয়েক মিনিট পর আর রক্ষা হয়নি।

ম্যাচের প্রথমার্ধের মাঝামাঝি সময়ে বাম প্রান্ত দিয়ে আক্রমণে ওঠেন আন্দ্রেয়াস শেলদেরুপ। বক্সের ভেতরে ঢুকে তার নেওয়া শট দূরের পোস্টে লেগে জালে জড়িয়ে যায়। পিকফোর্ড বলের নাগাল পেলেও গোল ঠেকাতে পারেননি। এই গোলেই ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় নরওয়ে।

 

গোল হজমের পর ইংল্যান্ডের খেলায় অস্থিরতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গ্যালারিতে থাকা ইংলিশ সমর্থকেরাও কিছুটা হতাশ হয়ে পড়েন। তীব্র গরমের কারণে কুলিং ব্রেকের সময় টমাস টুখেলকে বেশ উত্তেজিতভাবে খেলোয়াড়দের নির্দেশনা দিতে দেখা যায়। ম্যাচ শেষে তিনি স্বীকার করেন, সেই সময় দলের পারফরম্যান্সে তিনি মোটেও সন্তুষ্ট ছিলেন না।

 

প্রথমার্ধের শেষ দিকে আসে ম্যাচের সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্ত।

নরওয়ের গোলরক্ষক অরইয়ান নিয়ল্যান্ড একটি দীর্ঘ গোলকিক নেন। নরওয়ের খেলোয়াড়দের দাবি, বলটি মাঝ আকাশে স্টেডিয়ামের স্কাই-ক্যামেরার তারে লেগে দিক পরিবর্তন করে নিচে নেমে আসে। সেই বল পান ইংল্যান্ডের এলিয়ট অ্যান্ডারসন। তিনি দ্রুত বল বাড়িয়ে দেন অ্যান্থনি গর্ডনের কাছে। গর্ডনের পাস পেয়ে বক্সে ঢুকে নিখুঁত শটে গোল করেন জুড বেলিংহাম।

 

গোলের পরপরই তীব্র প্রতিবাদ জানায় নরওয়ের খেলোয়াড়রা। তাদের দাবি ছিল, ফিফার নিয়ম অনুযায়ী বল যদি কোনো বাহ্যিক বস্তুর-যেমন ক্যামেরার তার-স্পর্শ করে, তাহলে খেলা থামিয়ে ড্রপ বল দিতে হয়। সেই ক্ষেত্রে গোলটি বৈধ হওয়ার কথা নয়।

 

কিন্তু রেফারি ক্লেমঁ তুরপাঁ গোলটি বহাল রাখেন। পরে ফিফা জানায়, ম্যাচে ব্যবহৃত ‘কানেক্টেড বল’ প্রযুক্তির সেন্সরে বলের সঙ্গে কোনো ক্যামেরা তারের সংস্পর্শের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বলের তথাকথিত ‘হার্টবিট’ ডেটাতেও কোনো অস্বাভাবিকতা ধরা পড়েনি। তাই গোলটি বৈধ বলে নিশ্চিত করে ফিফা।

 

তবে এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হতে পারেনি নরওয়ে।

ম্যাচ শেষে নরওয়ের কোচ স্টালে সোলবাক্কেন বলেন, তিনি নিজে ঘটনাটি স্পষ্টভাবে না দেখলেও তার খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফের সবাই নিশ্চিত যে বলটি ক্যামেরার তারে লেগেছিল। যদিও তিনি এটাও বলেন, এই বিতর্ক যেন নরওয়ের অসাধারণ বিশ্বকাপ যাত্রাকে আড়াল না করে।

 

প্রথমার্ধ শেষ হয় ১-১ সমতায়।

পরিসংখ্যানে বলের দখলে এগিয়ে ছিল ইংল্যান্ড। তবে কার্যকর আক্রমণ এবং পাল্টা আক্রমণে নরওয়ে ছিল অনেক বেশি বিপজ্জনক। হালান্ড ও শেলদেরুপ বারবার ইংল্যান্ডের রক্ষণে চাপ সৃষ্টি করেন। অন্যদিকে বেলিংহামের সমতাসূচক গোল ম্যাচটিকে নতুন করে উন্মুক্ত করে দেয়।

 

বিরতিতে দুই কোচই নিজেদের কৌশলে পরিবর্তনের পরিকল্পনা করেন। নরওয়ে লিড হারানোর হতাশা কাটিয়ে আবারও আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে প্রস্তুত হয়, আর ইংল্যান্ড ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে নেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে মাঠে ফেরে।

 

দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকেই ম্যাচের চিত্র বদলে যায়। প্রথমার্ধে বলের দখলে এগিয়ে থাকলেও বিরতির পর আরও আক্রমণাত্মক হয়ে মাঠে নামে নরওয়ে। মাঝমাঠে মার্টিন ওডেগার্ড খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করতে থাকেন, আর সামনে আর্লিং হালান্ড, আন্দ্রেয়াস শেলদেরুপ ও আলেকজান্ডার সোরলোথ একের পর এক আক্রমণ সাজাতে থাকেন।

 

দ্বিতীয়ার্ধের প্রথম দশ মিনিটেই ইংল্যান্ডের রক্ষণে কয়েকবার আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয় নরওয়ে। ডান দিক দিয়ে ওডেগার্ডের কর্নার থেকে বক্সের ভেতরে উঠে আসেন হালান্ড। প্রথম হেডটি ক্লিয়ার হলেও ফিরতি আক্রমণে আবারও বল পেয়ে জোরালো শট নেন তিনি। এবারও দারুণভাবে বাধা হয়ে দাঁড়ান জর্ডান পিকফোর্ড।

 

এরপর আসে ম্যাচের আরেকটি বড় বিতর্ক।

প্রায় ৫৮ মিনিটে কর্নার থেকে আসা বলে আর্লিং হালান্ডের হালকা ধাক্কায় জায়গা তৈরি করে হেড নেন টরবইর্ন হেগেম। বল সরাসরি জালে জড়িয়ে যায় এবং নরওয়ের খেলোয়াড়রা গোল উদযাপন শুরু করেন। কিন্তু ভিএআরের পর রেফারি ক্লেমঁ তুরপাঁ মনিটরে রিপ্লে দেখে গোলটি বাতিল করেন।

 

রেফারির মতে, হেড নেওয়ার আগে হালান্ড ইংল্যান্ডের এক ডিফেন্ডারকে ধাক্কা দিয়ে অবৈধ সুবিধা নিয়েছিলেন। এই সিদ্ধান্তে নরওয়ের ফুটবলাররা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান। গ্যালারিতে থাকা নরওয়ের সমর্থকেরাও তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর বিশ্লেষণে বলা হয়, ম্যাচের দুটি বড় সিদ্ধান্তই নরওয়ের বিপক্ষে গেছে-প্রথমার্ধে বেলিংহামের গোল এবং দ্বিতীয়ার্ধে হেগেমের বাতিল হওয়া গোল। ফলে ম্যাচ শেষে রেফারিং নিয়েই সবচেয়ে বেশি আলোচনা শুরু হয়।

 

তবে এসব বিতর্কের মাঝেও আক্রমণের ধার কমায়নি নরওয়ে।

 

৬৮ মিনিটে আন্দ্রেয়াস শেলদেরুপ বাম দিক দিয়ে বক্সে ঢুকে নিচু ক্রস বাড়ান। কিন্তু সোরলোথ বল স্পর্শ করতে পারেননি। কয়েক মিনিট পর আবারও হালান্ডের শক্তিশালী শট ব্লক করে দেন জন স্টোনস।

 

অন্যদিকে ইংল্যান্ডও সুযোগ তৈরি করছিল।

৭৪ মিনিটে বুকায়ো সাকার নিচু ক্রস গোললাইন থেকে ক্লিয়ার করতে বাধ্য হন নরওয়ের এক ডিফেন্ডার। বলটি ক্রসবারের নিচ দিয়ে জালে ঢুকে যেতে পারত। অল্পের জন্য রক্ষা পায় নরওয়ে।

 

ম্যাচের শেষ দিকে জুড বেলিংহাম আরেকটি হেড নিলেও তা পোস্টের বাইরে চলে যায়। ৯০ মিনিট শেষে স্কোরলাইন ১-১ থাকায় ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে।

 

অতিরিক্ত সময়ের শুরু থেকেই আক্রমণের গতি বাড়িয়ে দেয় ইংল্যান্ড। ৯৩ মিনিটে হ্যারি কেনের হেড অসাধারণ দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন অরইয়ান নিয়ল্যান্ড। কিন্তু কয়েক মিনিট পর ঘটে ম্যাচের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।

 

মরগান রজার্স দূর থেকে জোরালো শট নিলে বলটি ঠিকমতো তালুবন্দি করতে পারেননি নিয়ল্যান্ড। গোলরক্ষকের হাত ফসকে বল সামনে চলে আসে। মুহূর্তের মধ্যে সেখানে পৌঁছে যান জুড বেলিংহাম। কোনো ভুল না করে ফিরতি বল জালে জড়িয়ে ইংল্যান্ডকে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে দেন তিনি।

 

এটি ছিল ম্যাচে বেলিংহামের দ্বিতীয় গোল এবং বিশ্বকাপে তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গোলগুলোর একটি।

 

গোল করার পর সতীর্থদের সঙ্গে উদযাপনে মেতে ওঠেন রিয়াল মাদ্রিদের এই মিডফিল্ডার। পুরো ইংল্যান্ড বেঞ্চ তখন আনন্দে উচ্ছ্বসিত।

 

তবে নাটক তখনও শেষ হয়নি।

অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধে বক্সের ভেতরে ডিয়েড স্পেন্স পড়ে গেলে প্রথমে ইংল্যান্ডের পক্ষে পেনাল্টির বাঁশি বাজান রেফারি।

 

কিন্তু ভিএআরের নির্দেশে রিপ্লে দেখার পর তিনি নিজের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন। দেখা যায়, স্পেন্সের সঙ্গে ডিফেন্ডারের সংস্পর্শ থাকলেও সেটি পেনাল্টি দেওয়ার মতো নয়। ফলে পেনাল্টির সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়। এই সিদ্ধান্তে এবার অসন্তোষ প্রকাশ করেন ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়রা।

 

এদিকে অতিরিক্ত সময়ের বিরতির সময় আর্লিং হালান্ডকে তুলে নেন নরওয়ের কোচ স্টালে সোলবাক্কেন। ম্যাচ শেষে তিনি জানান, দীর্ঘ সময় খেলার কারণে হালান্ড শারীরিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন এবং ইনজুরির ঝুঁকি এড়াতেই তাকে মাঠ থেকে তুলে নেওয়া হয়।

 

শেষ কয়েক মিনিটে সমতায় ফেরার মরিয়া চেষ্টা চালায় নরওয়ে।

ওডেগার্ড একাধিক লং বল খেলেন বক্সের ভেতরে। শেলদেরুপ ও সোরলোথও সুযোগ তৈরির চেষ্টা করেন। কিন্তু ইংল্যান্ডের রক্ষণভাগ শেষ পর্যন্ত আর কোনো ভুল করেনি।

 

রেফারির শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে হাঁটু গেড়ে বসে পড়েন ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়রা। টমাস টুখেল দুই হাত উঁচিয়ে উল্লাস প্রকাশ করেন। অন্যদিকে নরওয়ের ফুটবলারদের অনেককেই হতাশায় মাঠে বসে থাকতে দেখা যায়।

 

ম্যাচ শেষে টমাস টুখেল বলেন, এটি শুধু ফুটবল নয়, মানসিক শক্তিরও পরীক্ষা ছিল। তার ভাষায়, কঠিন পরিস্থিতিতেও খেলোয়াড়রা বিশ্বাস হারায়নি এবং শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে গেছে।

 

জুড বেলিংহাম বলেন, নরওয়ে তাদের সবচেয়ে কঠিন প্রতিপক্ষগুলোর একটি ছিল। তিনি স্বীকার করেন, ম্যাচটি জিততে ইংল্যান্ডকে নিজেদের সর্বোচ্চটা দিতে হয়েছে।

 

অন্যদিকে নরওয়ের কোচ স্টালে সোলবাক্কেন রেফারির কয়েকটি সিদ্ধান্ত নিয়ে হতাশা প্রকাশ করলেও বলেন, তার দল বিশ্বকাপে নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছে এবং খেলোয়াড়দের নিয়ে তিনি গর্বিত।

 

ম্যাচ শেষে ফিফাও প্রথমার্ধের বিতর্কিত সমতাসূচক গোল নিয়ে ব্যাখ্যা দেয়। সংস্থাটি জানায়, ম্যাচে ব্যবহৃত Connected Ball Technology-এর তথ্য অনুযায়ী বলটি স্কাই-ক্যামেরার তার স্পর্শ করেনি। তাই রেফারির সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল বলে তারা নিশ্চিত করে।

 

পরিসংখ্যানেও ছিল দুই দলের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। বলের দখলে এগিয়ে ছিল ইংল্যান্ড, তবে নরওয়ে ছিল অনেক বেশি কার্যকর এবং সরাসরি আক্রমণভাগে ভয়ংকর। হালান্ড, ওডেগার্ড ও শেলদেরুপ বারবার ইংল্যান্ডের রক্ষণকে পরীক্ষায় ফেলেছেন। অন্যদিকে জুড বেলিংহাম, বুকায়ো সাকা ও অ্যান্থনি গর্ডনের গতিশীল ফুটবল ইংল্যান্ডকে ম্যাচে ফিরিয়ে আনে।

 

এই জয়ের মাধ্যমে ২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে জায়গা করে নিল টমাস টুখেলের ইংল্যান্ড। দীর্ঘ ৬০ বছরের বিশ্বকাপ শিরোপা-খরা ঘোচানোর স্বপ্ন এখনো বেঁচে আছে থ্রি লায়ন্সদের। আর নরওয়ের জন্য এটি ছিল বেদনাদায়ক বিদায়। আর্লিং হালান্ড ও মার্টিন ওডেগার্ডের নেতৃত্বে দুর্দান্ত একটি টুর্নামেন্ট খেলেও শেষ পর্যন্ত বিতর্ক, আক্ষেপ এবং অতিরিক্ত সময়ের নাটকে থেমে গেল তাদের বিশ্বকাপ অভিযান।


সম্পর্কিত নিউজ