{{ news.section.title }}
ইরানের ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ ধ্বংসের হুমকি ট্রাম্পের
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান সামরিক উত্তেজনা আরও তীব্র হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে ধারণা করা অত্যন্ত সুরক্ষিত ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ (Pickaxe Mountain) লক্ষ্য করে শিগগিরই হামলা চালানোর ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর ধারাবাহিকভাবে আরও শক্তিশালী হামলা চালাবে এবং তেহরানের পক্ষে তা ঠেকানো সম্ভব হবে না।
সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের রেডিও উপস্থাপক হিউ হিউইটের অনুষ্ঠানে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, “আমরা পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন ধ্বংস করব। ইরানিদের প্রস্তুত থাকতে বলুন।” তিনি আরও দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ওই স্থাপনার ওপর নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছে এবং সেখানে বর্তমানে উল্লেখযোগ্য কোনো তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। তবে ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যেকোনো অবকাঠামো ধ্বংসে ওয়াশিংটন পিছপা হবে না বলেও জানান তিনি।
ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র যখনই ওই স্থাপনায় নতুন কোনো কার্যক্রমের তথ্য পায়, তখনই সামরিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তার ভাষায়, ইরান এখন তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে অনাগ্রহী, কারণ সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলো ধারাবাহিকভাবে হামলার মুখে পড়ছে। তিনি ইঙ্গিত দেন, খুব শিগগিরই পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনও যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন ইরানের অন্যতম সুরক্ষিত সামরিক ও পারমাণবিক স্থাপনার একটি। এটি নাটাঞ্জ (Natanz) ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রের কাছাকাছি অবস্থিত এবং পাহাড়ের গভীরে নির্মিত দুটি শক্তিশালী ভূগর্ভস্থ টানেল কমপ্লেক্স রয়েছে সেখানে। পশ্চিমা নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, এই স্থাপনাগুলো এতটাই গভীরে নির্মিত যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রচলিত ‘বাঙ্কার বাস্টার’ বোমার পক্ষেও সেগুলো ধ্বংস করা অত্যন্ত কঠিন।
এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কয়েক দিন ধরে পাল্টাপাল্টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চলছে। সাম্প্রতিক সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের একাধিক সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। অপরদিকে ইরানও যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশ ও সামরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুর দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করেছে।
সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প আরও বলেন, “আজ রাতে আমরা তাদের খুব কঠোরভাবে আঘাত করব। আগামীকালও একইভাবে হামলা চলবে। এটি ঠেকানোর মতো কিছুই তাদের হাতে নেই।” তার এই মন্তব্যের পর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা।
একই দিনে ট্রাম্প ঘোষণা দেন, যুক্তরাষ্ট্র আবারও উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানি জাহাজ চলাচলের ওপর অবরোধ কার্যকর করছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল খোলা রাখা হবে, তবে তার জন্য ফি বা অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা করা হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। যদিও এই পরিকল্পনা কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডর। বৈশ্বিক অপরিশোধিত তেলের একটি বড় অংশ প্রতিদিন এই পথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে। ফলে সেখানে যেকোনো সামরিক উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, তেলের দাম এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনকে লক্ষ্যবস্তু করার ঘোষণা শুধু একটি সামরিক হুমকি নয়; এটি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে সম্পূর্ণভাবে নিষ্ক্রিয় করার কৌশলের অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে নাটাঞ্জসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরও পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ধারণা, ইরান ভূগর্ভস্থ কিছু স্থাপনায় কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারে। সেই কারণেই পাহাড়ের গভীরে নির্মিত এই স্থাপনাটি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
তবে সামরিক বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এত গভীরে নির্মিত স্থাপনা ধ্বংস করা অত্যন্ত জটিল। প্রচলিত অস্ত্র দিয়ে সফল অভিযান চালানো কঠিন হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র যদি বড় ধরনের হামলার পথ বেছে নেয়, তাহলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে ট্রাম্পের বক্তব্যের পর ইরানের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করা হয়নি। তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তেহরান বারবার বলে এসেছে, যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো নতুন হামলার জবাব আরও কঠোরভাবে দেওয়া হবে।
আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলের আশঙ্কা, বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে তা শুধু দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং উপসাগরীয় অঞ্চল, হরমুজ প্রণালি, লোহিত সাগর এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিও নতুন করে অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে।