রাতভর ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের ভয়াবহ হামলা

রাতভর ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের ভয়াবহ হামলা
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যে হরমুজ প্রণালি ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সামরিক সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে। টানা তৃতীয় রাতের মতো ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সময়ে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটি ও তাদের মিত্রদের লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি করেছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। এতে অঞ্চলজুড়ে নতুন করে নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও অস্থিরতা বেড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, স্থানীয় সময় সোমবার বিকেল ৪টা ৪৫ মিনিটে নতুন সামরিক অভিযান শুরু হয়। সেন্টকমের দাবি, এই হামলার লক্ষ্য ছিল ইরানের উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা এবং এমন সামরিক অবকাঠামো, যেগুলো ব্যবহার করে হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে হামলা চালানো হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভাষ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক নৌপথে নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতেই এ অভিযান পরিচালিত হয়েছে।

 

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, রাতভর বন্দর আব্বাস, কেশম দ্বীপ, বুশেহর, আবু মুসা এবং দক্ষিণাঞ্চলের আরও কয়েকটি এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। ইরানের সরকারি বার্তা সংস্থা আইআরএনএ জানিয়েছে, বন্দর আব্বাসের পশ্চিমাঞ্চলে একটি স্থানে হামলা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি। তবে দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি স্থানে অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির তথ্য পাওয়া গেছে।

 

এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, ওমান উপসাগরের কাছে তাদের দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে। এতে একজন ভারতীয় নাবিক নিহত এবং আরও আটজন আহত হয়েছেন। ঘটনাটির জন্য ইরানকে দায়ী করেছে আবুধাবি। যদিও তেহরান আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া জানায়নি।

 

অন্যদিকে ইরানের আধা-সরকারি তাসনিম নিউজ এজেন্সি দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালিতে "নিয়ম লঙ্ঘনকারী" কয়েকটি জাহাজের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়েছে এবং বন্দর আব্বাসের কাছে একটি মার্কিন এমকিউ-৯ (MQ-9) ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। তবে এসব দাবির স্বাধীন কোনো নিশ্চিতকরণ এখনো পাওয়া যায়নি।

 

আইআরজিসি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, মার্কিন হামলার জবাবে তারা মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থসংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে "প্রতিশোধমূলক অভিযান" শুরু করেছে। ইরানের দাবি, কুয়েতে একটি মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। তবে সেখানে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা বা সামরিক স্থাপনা ধ্বংসের যে দাবি করা হয়েছে, তা আন্তর্জাতিক কোনো স্বাধীন সূত্র এখনো নিশ্চিত করেনি।

 

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগে কংগ্রেসকে জানিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকবে এবং হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক নৌচলাচল নিরাপদ রাখতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ইরানি জাহাজের বিরুদ্ধে পুনর্বহাল নৌ অবরোধ কার্যকর করার কথাও জানিয়েছে। সেন্টকমের ভাষ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের সন্দেহ হলে সংশ্লিষ্ট জাহাজে তল্লাশি চালানো হবে এবং প্রয়োজন হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

এদিকে মার্কিন সিনেটের ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমার প্রশাসনের সামরিক পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, কংগ্রেসের মতামতকে উপেক্ষা করে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করা উচিত নয় এবং প্রশাসনের উচিত কূটনৈতিক সমাধানের পথকে অগ্রাধিকার দেওয়া। এদিকে কাতার, ওমান ও পাকিস্তানসহ কয়েকটি মধ্যস্থতাকারী দেশ উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে।

 

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হওয়ায় এই সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপর এর প্রভাব আরও গভীর হতে পারে। সাম্প্রতিক হামলা-পাল্টা হামলার পর উপসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, অন্যদিকে ইরানও তাদের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি আরও জোরদার করেছে।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স


সম্পর্কিত নিউজ