চীনে আঘাত হানল টাইফুন ‘বাভি’

চীনে আঘাত হানল টাইফুন ‘বাভি’
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

প্রশান্ত মহাসাগরে সৃষ্টি হওয়া শক্তিশালী টাইফুন ‘বাভি’ চীনের পূর্বাঞ্চলীয় ঝেজিয়াং (Zhejiang) প্রদেশে আঘাত হেনেছে। ঝড়টির প্রভাবে প্রবল বৃষ্টি, দমকা হাওয়া, ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যার আশঙ্কায় কর্তৃপক্ষ অন্তত ২০ লাখের বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছে। ব্যাপক সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে শত শত ফ্লাইট বাতিল, ট্রেন চলাচল সীমিত এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

চীনের জাতীয় আবহাওয়া কেন্দ্র (National Meteorological Center) জানিয়েছে, স্থানীয় সময় শনিবার রাত ১১টা ২০ মিনিটে টাইফুন বাভি ঝেজিয়াং উপকূলে আঘাত হানে। স্থলভাগে আঘাত হানার সময় ঝড়টির কেন্দ্রের কাছে সর্বোচ্চ স্থায়ী বাতাসের গতি ছিল ঘণ্টায় প্রায় ১৪৪ কিলোমিটার (৮৯ মাইল)। পরে এটি ধীরে ধীরে উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে দুর্বল হতে শুরু করলেও প্রবল বর্ষণ ও ঝোড়ো হাওয়ার কারণে এখনও বড় ধরনের ঝুঁকি রয়ে গেছে।

 

আবহাওয়াবিদদের মতে, বাভি চলতি বছরে চীনের মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী টাইফুনগুলোর একটি। ঝড়টি আকারে অত্যন্ত বড় হওয়ায় এর বৃষ্টিবলয় পূর্ব ও উত্তর চীনের বিস্তীর্ণ এলাকায় কয়েক দিন ধরে ভারী বৃষ্টিপাত ঘটাতে পারে। এর ফলে নদীর পানি বৃদ্ধি, পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধস এবং নগরাঞ্চলে জলাবদ্ধতার আশঙ্কা রয়েছে।

 

টাইফুনের আগেই ব্যাপক প্রস্তুতি নেয় চীনা কর্তৃপক্ষ। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ঝেজিয়াং প্রদেশে প্রায় ২২ লাখ, সাংহাইয়ে প্রায় ২ লাখ ৯০ হাজার এবং ফুজিয়ান প্রদেশে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। উপকূলীয় শহরগুলোর বাসিন্দাদের আগেই আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া হয় এবং মাছ ধরার নৌযানগুলোকে বন্দরে ফিরে আসার নির্দেশ দেওয়া হয়।

 

ঝড়ের কারণে পূর্ব চীজুড়ে পরিবহন ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটেছে। সাংহাইয়ের পুডং ও হংকিয়াও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে শত শত ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। রেল কর্তৃপক্ষ বহু উচ্চগতির ট্রেন চলাচল স্থগিত বা সীমিত করেছে। এছাড়া বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকায় ফেরি চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে এবং বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

 

ঝেজিয়াংয়ের ইউয়েকিং (Yueqing) শহরে টাইফুনের তাণ্ডবে ১ হাজার ৩০০টিরও বেশি গাছ উপড়ে বা ভেঙে পড়েছে। অনেক এলাকায় রাস্তা পানিতে তলিয়ে গেছে এবং জরুরি উদ্ধারকর্মীরা এক্সকাভেটর, চেইনসো ও ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে রাস্তা পরিষ্কার ও চলাচল স্বাভাবিক করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

 

চীনে আঘাত হানার আগে টাইফুন বাভি জাপানের দক্ষিণাঞ্চলের সাকিশিমা দ্বীপপুঞ্জ এবং তাইওয়ানের উত্তরাঞ্চলের ওপর দিয়ে অতিক্রম করে। যদিও ঝড়টি তাইওয়ানে সরাসরি আঘাত হানেনি, তবুও প্রবল বাতাস ও ভারী বৃষ্টিতে সেখানে অন্তত ১৩৪ জন আহত হয়েছেন। আহতদের অধিকাংশই মোটরসাইকেল বা সাইকেল চালানোর সময় দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন অথবা উড়ে আসা বস্তুতে আঘাত পেয়েছেন।

 

তাইওয়ানে ঝড়ের আগে ১৪ হাজারের বেশি মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। দ্বীপজুড়ে স্কুল-কলেজ, সরকারি অফিস এবং অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়। পাশাপাশি প্রায় ১৯০টির বেশি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

 

এদিকে ফিলিপাইনে টাইফুন বাভির সঙ্গে শক্তিশালী দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে টানা ভারী বৃষ্টিপাত, আকস্মিক বন্যা এবং ভূমিধসের ঘটনায় অন্তত ১৭ জন নিহত হয়েছেন। দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি প্রদেশে। উদ্ধার অভিযান এখনো অব্যাহত রয়েছে।

 

চীনের জাতীয় আবহাওয়া কেন্দ্র টাইফুন বাভিকে ঘিরে ‘অরেঞ্জ অ্যালার্ট’ বা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে। একই সঙ্গে কয়েকটি অঞ্চলে অতিভারী বৃষ্টিপাতের কারণে পৃথকভাবে রেড রেইন অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, ঝড়টি স্থলভাগে দুর্বল হলেও এর সঙ্গে থাকা বিপুল আর্দ্রতা আগামী কয়েক দিন পূর্ব ও উত্তর চীজুড়ে দীর্ঘস্থায়ী ভারী বৃষ্টিপাত ঘটাতে পারে।

 

আবহাওয়াবিদদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে শক্তিশালী টাইফুনের সংখ্যা ও তীব্রতা বাড়ছে। ফলে এ ধরনের ঝড় দ্রুত শক্তি সঞ্চয় করে স্থলভাগে আঘাত হানছে, যা ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলছে।


সম্পর্কিত নিউজ