{{ news.section.title }}
সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মিলবে ‘অ্যান্টিভেনম’
বর্ষা মৌসুমে সাপের উপদ্রব ও সাপের কামড়ের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় দেশের সব জেলা হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম (সাপের বিষের প্রতিষেধক) ইনজেকশন সরবরাহ করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ফলে এখন সাপে কাটার পর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গেলেই রোগীরা বিনামূল্যে প্রয়োজনীয় অ্যান্টিভেনম চিকিৎসা পাবেন বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার (সিডিসি) লাইন ডিরেক্টর মো. হালিমুর রশীদ জানান, বর্ষা মৌসুমকে সামনে রেখে আগেভাগেই দেশের প্রতিটি জেলা হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম ইনজেকশন পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে সাপের কামড়ে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা আরও কার্যকর করতে চিকিৎসকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
তিনি বলেন, শুধু ওষুধ সরবরাহ করাই নয়, উপজেলা পর্যায়ের চিকিৎসকদের সাপের বিষক্রিয়ার ধরন, জরুরি চিকিৎসা এবং অ্যান্টিভেনম ব্যবহারের বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, যাতে রোগীরা দ্রুত ও সঠিক চিকিৎসা পান।
নীলফামারীর ডিমলা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রাশেদুজ্জমান জানান, তাদের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম মজুত রয়েছে। সাপে কাটার যেকোনো রোগীকে দ্রুত চিকিৎসা দেওয়ার জন্য চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রস্তুত আছেন।
একই তথ্য জানিয়েছেন সিলেটের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. জন্মেজয় দত্ত। তিনি বলেন, সিলেট সদর হাসপাতালসহ জেলার সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম রয়েছে। বর্ষা মৌসুমে সাপের কামড়ের রোগী বাড়ার আশঙ্কা থাকায় আগেই প্রয়োজনীয় ইনজেকশন পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি উপজেলা পর্যায়ের চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণও সম্পন্ন করা হয়েছে।
রাঙ্গামাটি জেলা সিভিল সার্জন ডা. নূয়েন খীসাও জানিয়েছেন, জেলার সদর হাসপাতাল এবং সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রয়োজনীয় অ্যান্টিভেনম সংরক্ষণ করা হয়েছে। তিনি সাপে কাটার পর ওঝা, কবিরাজ বা ঝাড়ফুঁকের ওপর নির্ভর না করে যত দ্রুত সম্ভব সরকারি হাসপাতালে নেওয়ার আহ্বান জানান।
তার ভাষায়, সাপের কামড়ের পর সময়মতো অ্যান্টিভেনম প্রয়োগ করা গেলে অধিকাংশ রোগীকেই সুস্থ করা সম্ভব। চিকিৎসায় দেরি হলে বিষক্রিয়া শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ক্ষতি করতে পারে, এমনকি মৃত্যুঝুঁকিও বেড়ে যায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ সাপের কামড়ের শিকার হন। এর মধ্যে ২৫ থেকে ২৭ লাখ মানুষের শরীরে বিষ প্রবেশ করে। প্রতিবছর প্রায় দেড় লাখ মানুষের মৃত্যু হয় এবং প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ স্থায়ীভাবে অন্ধত্ব বা পঙ্গুত্বের শিকার হন। আফ্রিকার ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চল, দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সাপের কামড়ের ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ ইউনিটের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৪ লাখ ৩ হাজার মানুষ সাপের কামড়ের শিকার হন। তাদের মধ্যে প্রায় ৭ হাজার ৫১১ জনের মৃত্যু হয়। মোট ঘটনার প্রায় এক-চতুর্থাংশ বিষাক্ত সাপের কামড়। আক্রান্তদের মধ্যে ১০ দশমিক ৬ শতাংশ দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক অক্ষমতা এবং ১ দশমিক ৯ শতাংশ মানসিক জটিলতায় ভোগেন।
গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, সাপের কামড়ে আক্রান্তদের প্রায় ৯৫ শতাংশই গ্রামীণ এলাকার বাসিন্দা। মাঠে কাজ করা কৃষক, জেলে, শ্রমিক ও বনজীবীদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। নারীদের তুলনায় পুরুষদের সাপের কামড়ে আক্রান্ত হওয়ার হার প্রায় ১ দশমিক ৪ গুণ বেশি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্ষাকালে বন্যা, জলাবদ্ধতা ও বসতবাড়ির আশপাশে পানি জমে থাকায় সাপ লোকালয়ে চলে আসে। তাই এ সময় মাঠে কাজ করা, রাতে চলাচল করা বা ঝোপঝাড়ে প্রবেশের সময় বিশেষ সতর্ক থাকতে হবে। রাতে টর্চ ব্যবহার, ঘরের চারপাশ পরিষ্কার রাখা এবং খালি পায়ে চলাফেরা না করারও পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, সাপে কাটার পর আক্রান্ত ব্যক্তিকে শান্ত রাখুন, অপ্রয়োজনীয় নড়াচড়া কমিয়ে দ্রুত নিকটস্থ সরকারি হাসপাতাল বা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। ক্ষতস্থানে কাটা, বিষ চুষে বের করার চেষ্টা, শক্ত করে বেঁধে রাখা বা ঝাড়ফুঁকের মতো কুসংস্কারে বিশ্বাস না করে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়াই জীবন বাঁচানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।