{{ news.section.title }}
বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে, ব্যারেলপ্রতি ছাড়াল ৯০ ডলার
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক সংঘাত আরও তীব্র হওয়ায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা, হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহনে বিঘ্ন এবং সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগের কারণে সোমবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে, যা গত ১১ জুনের পর সর্বোচ্চ।
সোমবার ০২:৪১ জিএমটি পর্যন্ত লেনদেনে সেপ্টেম্বর সরবরাহের ব্রেন্ট ক্রুড চুক্তির দাম ২ দশমিক ০৯ ডলার বা ২ দশমিক ৩৭ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯০ দশমিক ১৯ ডলারে ওঠে। একই সময়ে আগস্ট সরবরাহের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (WTI) ক্রুডের দাম ১ দশমিক ৭১ ডলার বা ২ দশমিক ০৭ শতাংশ বেড়ে ৮৪ দশমিক ২০ ডলারে পৌঁছায়। দিনের পরবর্তী লেনদেনে ব্রেন্টের দাম আরও বেড়ে প্রায় ৯০ দশমিক ৮০ ডলার এবং ডব্লিউটিআই প্রায় ৮৪ দশমিক ৭০ ডলারে ওঠে।
গত সপ্তাহে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ এবং ডব্লিউটিআই ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে। এটি যথাক্রমে এপ্রিল ও মার্চের পর সবচেয়ে বড় সাপ্তাহিক মূল্যবৃদ্ধি।
কেন বাড়ছে তেলের দাম?
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, তেলের দাম বৃদ্ধির প্রধান কারণ হলো মধ্যপ্রাচ্যে দ্রুত অবনতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতি। যুক্তরাষ্ট্র টানা নবম রাত ইরানে হামলা চালিয়েছে। একই সময়ে ইরানও পাল্টা হামলা অব্যাহত রেখেছে। কুয়েত ও বাহরাইন জানিয়েছে, তারা নতুন করে ইরানি হামলার মুখে পড়েছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ কার্যকর করছে বলে জানিয়েছে ওয়াশিংটন। অন্যদিকে ইরান বলছে, তারা হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের ঘোষিত নৌ চলাচলের নিয়ম অমান্যকারী জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করছে। ফলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুটে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বিশ্ববাজারে তেলের দামের চিত্র–২০২৬
| তারিখ | দাম (ব্যারেল/ডলার) |
| ২৭ ফেব্রুয়ারি | ৭২ |
| ৩০ এপ্রিল | ১২৬ |
| ২৬ জুন | ৭২ |
| ২ জুলাই | ৭৮ |
| ৮ জুলাই | ৭৯ |
| ২০ জুলাই | ৯০ |
হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডরগুলোর একটি। বিশ্বে সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেল ও তরল জ্বালানির প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে যায়। ফলে এই রুটে সামান্য বিঘ্নও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে।
সাম্প্রতিক উত্তেজনার কারণে জাহাজ চলাচলও কমে এসেছে। লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ গ্রুপ (LSEG)–এর তথ্য অনুযায়ী, রোববার মাত্র চারটি জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে, যেখানে আগের দিন এই সংখ্যা ছিল আটটি। শুক্রবারের পর থেকে অন্তত তিনটি পরিশোধিত জ্বালানি বহনকারী ট্যাংকার এবং একটি ভেরি লার্জ ক্রুড ক্যারিয়ার (VLCC) তেল বোঝাইয়ের জন্য প্রণালিতে প্রবেশ করেছে।
যুক্তরাজ্যের United Kingdom Maritime Trade Operations (UKMTO) সোমবার ভোরে ওমানের কুমজার উপকূলের উত্তর-পশ্চিমে একটি জাহাজে আগুন লাগার খবরও জানিয়েছে। তবে কী কারণে আগুন লেগেছে, তা এখনো নিশ্চিত করা হয়নি।
ট্যাংকারে বিস্ফোরণের দাবি
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালির দক্ষিণে একটি বিকল্প নৌপথ দিয়ে যাওয়ার সময় দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে বিস্ফোরণ ঘটে এবং সেগুলো অচল হয়ে পড়ে। আইআরজিসির অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ট্যাংকারগুলোকে ওই পথ ব্যবহার করতে উৎসাহ দিয়েছিল।
তবে রয়টার্স এই দাবির স্বাধীন সত্যতা যাচাই করতে পারেনি।
বাজার বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা
ডাচ আর্থিক প্রতিষ্ঠান ING বলেছে, উপসাগরীয় অঞ্চলের উত্তেজনা দ্রুত কমবে-এমন কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তেলের বাজারে আরও অস্থিরতা তৈরি হতে পারে এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
অন্যদিকে বার্কলেজ–এর বিশ্লেষক অমরপ্রীত সিং বলেছেন, আগামী কয়েক দিন ও সপ্তাহে বোঝা যাবে এই দ্বিমুখী নৌ অবরোধের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল রপ্তানি কতটা টেকসই থাকে। তাঁর মতে, বাজার এখনো সরবরাহ সংকটের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি মূল্যায়ন করছে না। বর্তমানে বৈশ্বিক তেলের মজুত গত পাঁচ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম পর্যায়ে রয়েছে।
এলএনজি পরিবহনেও প্রভাব
শুধু অপরিশোধিত তেল নয়, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) পরিবহনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবারের পর থেকে কোনো এলএনজি ট্যাংকার হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেনি। কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে উৎপাদন চললেও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে বহু এলএনজি জাহাজ উপসাগরে অপেক্ষমাণ অবস্থায় রয়েছে।
১০০ ডলার ছাড়াবে?
বিশ্লেষকদের মধ্যে এখন আলোচনা শুরু হয়েছে, তেলের দাম আবার ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার অতিক্রম করতে পারে কি না। এর আগে সংঘাতের প্রথম ধাপে ব্রেন্টের দাম প্রায় ১২৬ ডলার পর্যন্ত উঠেছিল। বর্তমানে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি, কমে যাওয়া মজুত এবং হরমুজ প্রণালির অনিশ্চয়তা মূল্যবৃদ্ধির চাপ আরও বাড়াচ্ছে। তবে এটি নির্ভর করবে সংঘাত কতদিন স্থায়ী হয় এবং হরমুজ দিয়ে জ্বালানি পরিবহন কতটা স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হয় তার ওপর।
বাংলাদেশসহ আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ঝুঁকি
তেলের আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশসহ আমদানিনির্ভর দেশগুলো সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়তে পারে। অতীতে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় জ্বালানি আমদানি ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে আবারও জ্বালানি বাজার, পরিবহন খাত এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে প্রভাব পড়তে পারে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স