{{ news.section.title }}
কসর নামাজ কী? কখন কিভাবে পড়তে হয়
সফরে বা ভ্রমণে (নিয়তসহ ৭৮ কি.মি./৪৮ মাইল দূরে) যোহর, আসর ও এশার ৪ রাকাত ফরজ নামাজ ২ রাকাত পড়া ওয়াজিব, যা কসর নামে পরিচিত। ফজর ও মাগরিবের নামাজ যথারীতি পড়তে হয়। মুসাফির অবস্থায় ইচ্ছাকৃত কসর না করা গুনাহ এবং সাধারণত ১৫ দিনের কম অবস্থানের নিয়তে কসর করা যায়।
সফরের সময় নামাজের বিশেষ ছাড়কে ‘কসর’ বলা হয়। ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী, একজন মুসাফির বা ভ্রমণকারী ব্যক্তি ৪ রাকাত বিশিষ্ট ফরজ নামাজগুলোকে সংক্ষিপ্ত করে ২ রাকাত আদায় করবেন।
কসর নামাজ কী?
কসর (قصر) একটি আরবি শব্দ, যার অর্থ হলো সংক্ষিপ্ত করা বা কমানো। ইসলামী পরিভাষায়, সফর বা ভ্রমণের সময় চার রাকাত বিশিষ্ট ফরজ নামাজগুলোকে কমিয়ে দুই রাকাত আদায় করাকে 'কসর নামাজ' বলা হয়। এটি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে মুসাফির বা ভ্রমণকারীদের জন্য একটি বিশেষ উপহার ও সহজ বিধান।
পবিত্র কুরআন এবং বিশুদ্ধ হাদিসের আলোকে কসর নামাজের বিস্তারিত বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:
পবিত্র কুরআনের আলোকে কসর
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা মুসাফিরের জন্য নামাজ সংক্ষিপ্ত করার স্পষ্ট অনুমতি দিয়েছেন:
“তোমরা যখন জমিনে সফর করবে, তখন তোমাদের জন্য নামাজের কসর করায় (সংক্ষিপ্ত করায়) কোনো আপত্তি নেই, যদি তোমরা আশঙ্কা করো যে কাফিররা তোমাদেরকে বিঘ্নিত করতে পারে।” (সুরা আন-নিসা, আয়াত: ১০১)
আয়াতের ব্যাখ্যা ও সংশয় নিরসন:
আয়াতে 'ভয়ের' কথা উল্লেখ থাকলেও পরবর্তীতে যখন ইসলামে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন সাহাবিরা প্রশ্ন করেছিলেন যে এখন তো কোনো ভয় নেই, তবে কেন আমরা কসর করব?
এ প্রশ্নের জবাবে হজরত উমর (রা.) বর্ণনা করেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেছিলেন:
“এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য একটি সাদকা (উপহার)। সুতরাং তোমরা তাঁর সাদকা গ্রহণ করো।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৬৮৬)
হাদিস শরিফের আলোকে কসর
রাসুলুল্লাহ (সা.) সফর অবস্থায় সবসময়ই নামাজ কসর করে পড়তেন। এ বিষয়ে বহু বিশুদ্ধ হাদিস বর্ণিত হয়েছে:
স্থায়ী সুন্নাহ: হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বলেন, “আমি সফর অবস্থায় নবী করিম (সা.)-এর সঙ্গী হয়েছি। তিনি সফরে কখনো চার রাকাত (ফরজ) নামাজ পড়েননি। অনুরূপভাবে হজরত আবু বকর, উমর এবং ওসমান (রা.)-ও সফর অবস্থায় কখনো চার রাকাত পড়েননি।” (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)
নিয়মের প্রমাণ: হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমরা আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর সাথে মদিনা থেকে মক্কার উদ্দেশ্যে বের হলাম। অতঃপর তিনি মদিনায় ফিরে আসা পর্যন্ত সবসময়ই দুই রাকাত করে নামাজ আদায় করেছিলেন।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১০৮১)
আয়শার (রা.) বর্ণনা: হজরত আয়শা (রা.) বলেন, “সর্বপ্রথম যখন নামাজ ফরজ করা হয়েছিল, তখন দুই রাকাত করেই ফরজ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে মুকিম বা স্থায়ী বাসিন্দার জন্য নামাজ পূর্ণ (চার রাকাত) করা হয় এবং সফরের নামাজ আগের মতোই (দুই রাকাত) বহাল রাখা হয়।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১০৯০)
নিচে কসর নামাজের নিয়ম ও শর্তগুলো বিস্তারিত দেওয়া হলো:
কসর নামাজের প্রধান নিয়ম
রাকাত সংখ্যা: জোহর, আসর এবং এশার ৪ রাকাত ফরজ নামাজ ২ রাকাত পড়তে হবে।
অপরিবর্তিত নামাজ: ফজর (২ রাকাত) এবং মাগরিব (৩ রাকাত) নামাজের কোনো কসর নেই; এগুলো পূর্ণাঙ্গভাবেই আদায় করতে হবে।
বিতর ও সুন্নত: বেতের নামাজ পূর্ণ ৩ রাকাতই পড়তে হবে। সুন্নতে মুয়াক্কাদা পড়ার ক্ষেত্রে সুযোগ ও পরিবেশ থাকলে পড়া উত্তম, নতুবা না পড়লে কোনো গুনাহ নেই।
কসর করার শর্তাবলি
১. সফরের দূরত্ব: নিজ এলাকার সীমানা থেকে কমপক্ষে ৪৮ মাইল বা প্রায় ৭৮ কিলোমিটার দূরে যাওয়ার নিয়ত থাকতে হবে।
২. সময়সীমা: গন্তব্যে পৌঁছানোর পর সেখানে একটানা ১৫ দিনের কম থাকার নিয়ত থাকলে কসর করতে হবে। কিন্তু ১৫ দিন বা তার বেশি থাকার নিয়ত করলে সেখানে যাওয়ার পর থেকে পূর্ণ নামাজ পড়তে হবে।
৩. সীমানা অতিক্রম: সফরের নিয়তে নিজ গ্রাম বা শহরের নির্ধারিত সীমানা অতিক্রম করার পর থেকে কসর শুরু করতে হয়।
ইমাম ও মুক্তাদির বিধান
যদি কোনো মুসাফির ব্যক্তি স্থানীয় (মুকিম) ইমামের পেছনে নামাজ পড়েন, তবে তাকে ইমামের অনুসরণ করে পূর্ণ ৪ রাকাতই পড়তে হবে।
যদি মুসাফির ব্যক্তি ইমামতি করেন, তবে তিনি ২ রাকাত পড়ে সালাম ফিরাবেন। এরপর স্থানীয় মুক্তাদিরা দাঁড়িয়ে যার যার বাকি ২ রাকাত সুরা পাঠ ছাড়াই আদায় করে নেবেন।
অনিচ্ছাকৃত ভুল হলে
ভুলবশত মুসাফির ব্যক্তি ৪ রাকাত পূর্ণ করে ফেললে—যদি তিনি ২ রাকাত শেষে 'আত্তাহিয়াতু' (প্রথম বৈঠক) পড়ে থাকেন, তবে 'সিজদা সাহু' করলে নামাজ হয়ে যাবে। তবে ইচ্ছাকৃতভাবে ৪ রাকাত পড়া মাকরূহে তাহরিমি বা গুনাহের কাজ।