সালাতুত তাসবিহ নামাজের নিয়ম, নিয়ত ও ফজিলত

সালাতুত তাসবিহ নামাজের নিয়ম, নিয়ত ও ফজিলত
ছবির ক্যাপশান, সালাতুত তাসবিহ নামাজের নিয়ম, নিয়ত ও ফজিলত

সালাতুত তাসবিহ একটি অত্যন্ত বরকতময় নফল নামাজ। মহানবী (সা.) এই নামাজের মাধ্যমে জীবনের ছোট-বড়, ইচ্ছাকৃত-অনিচ্ছাকৃত সকল গুনাহ ক্ষমার উপায় হিসেবে প্রতিদিন, সপ্তাহে, মাসে অথবা জীবনে একবার হলেও আদায় করতে বলেছেন। এর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য ও বিপুল সওয়াব লাভ করা যায়।

সালাতুত তাসবিহ একটি বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ নফল নামাজ। এই নামাজে একটি নির্দিষ্ট তাসবিহ অধিক পরিমাণে পাঠ করে আল্লাহর প্রশংসা ও গুণগান করা হয়। নিচে এই নামাজের নিয়ত, নিয়ম এবং ফজিলত বিস্তারিত আলোচনা করা হলো: 

১. মূল তাসবিহ

এই নামাজে ৪ রাকাত মিলিয়ে মোট ৩০০ বার নিচের তাসবিহটি পড়তে হয়: 

আরবি: سُبْحَانَ اللهِ وَالْحَمْدُ للهِ وَلَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَاللهُ أَكْبَرُ
উচ্চারণ: সুবহানাল্লাহি ওয়াল হামদুলিল্লাহি ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার।
অর্থ: আল্লাহ পবিত্র, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং আল্লাহ মহান। 

২. সালাতুত তাসবিহ নামাজের নিয়ত 

ইসলামে যেকোনো ইবাদতের জন্য মনের ইচ্ছাই হচ্ছে মূল নিয়ত। আপনি মনে মনে এভাবে নিয়ত করতে পারেন: "আমি কেবলামুখী হয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ৪ রাকাত সালাতুত তাসবিহ নফল নামাজ আদায় করছি, আল্লাহু আকবার।" 

(যদি কেউ মুখে আরবি উচ্চারণ করতে চান: "নাওয়াইতু আন উসাল্লিয়া লিল্লাহি তাআলা আরবাআ রাকাআতি সালাতিত তাসবিহি সুন্নাতু রাসুলিল্লাহি তাআলা মুতাওয়াজ্জিহান ইলা জিহাতিল কাবাতিশ শারিফাতি আল্লাহু আকবার"। তবে এটি বাধ্যতামূলক নয়)। 

৩. নামাজ আদায়ের নিয়ম (প্রতি রাকাতে ৭৫ বার) 

এই নামাজ মোট ৪ রাকাত এবং প্রতি রাকাতে মোট ৭৫ বার তাসবিহ পড়তে হয়।

প্রথম রাকাত:

  1. নামাজে দাঁড়িয়ে হাত বাঁধার পর প্রথমে 'সানা' (সুবহানাকা আল্লাহুম্মা...) পড়বেন। এরপর সূরা ফাতেহা পড়ার আগে উক্ত তাসবিহটি ১৫ বার পড়বেন।

  2. এরপর স্বাভাবিক নিয়মে সূরা ফাতেহা এবং অন্য একটি সূরা পড়বেন। রুকুতে যাওয়ার আগে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থাতেই তাসবিহটি ১০ বার পড়বেন।

  3. এরপর রুকুতে যাবেন। রুকুর স্বাভাবিক তাসবিহ (সুবহানা রাব্বিয়াল আজিম) পড়ার পর এই তাসবিহটি ১০ বার পড়বেন।

  4. রুকু থেকে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে (সামিআল্লাহু লিমান হামিদাহ ও রাব্বানা লাকাল হামদ বলার পর) তাসবিহটি ১০ বার পড়বেন。

  5. এরপর প্রথম সেজদায় যাবেন। সেজদার স্বাভাবিক তাসবিহ (সুবহানা রাব্বিয়াল আলা) পড়ার পর এই তাসবিহটি ১০ বার পড়বেন।

  6. সেজদা থেকে উঠে দুই সেজদার মাঝে সোজা হয়ে বসে তাসবিহটি ১০ বার পড়বেন।

  7. এরপর দ্বিতীয় সেজদায় গিয়ে সেজদার স্বাভাবিক তাসবিহ শেষ করে তাসবিহটি ১০ বার পড়বেন। 

হিসাব: ১৫+১০+১০+১০+১০+১০+১০ = ৭৫ বার। 

পরবর্তী রাকাতসমূহ:

  • দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ রাকাতও একইভাবে আদায় করতে হবে। তবে দ্বিতীয় রাকাতে যখন তাশাহুদের (আত্তাহিইয়াতু) জন্য বসবেন, তখন আগে ১০ বার তাসবিহ পড়ে তারপর তাশাহুদ পড়বেন। একইভাবে চতুর্থ রাকাতেও শেষ বৈঠকে তাশাহুদ পড়ার আগে ১০ বার তাসবিহ পড়ে নিতে হবে। 

৪. ভুল হলে করণীয়

  • নামাজের কোনো রুকনে যদি তাসবিহ পড়তে ভুল হয়ে যায় বা সংখ্যা কম হয়ে যায়, তবে পরবর্তী যেকোনো রুকনে তা আদায় করে সংখ্যা পূরণ করে নিতে হবে।

  • কোনো কারণে সাজদায়ে সাহু (ভুল সংশোধনের সেজদা) দিতে হলে, সেই সেজদা বা তার মধ্যবর্তী বৈঠকে এই তাসবিহ পড়তে হবে না।

  • তাসবিহ গোনার জন্য আঙুলের কর বা তসবিহ ব্যবহার না করে আঙুল চেপে চেপে মনে মনে সংখ্যা হিসাব করা উত্তম। 

৫. সালাতুত তাসবিহ এর ফজিলত 

হাদিস শরিফে এই নামাজের অনেক বড় ফজিলত বর্ণনা করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর চাচা হযরত আব্বাস (রা.)-কে এই নামাজ শিক্ষা দিয়ে বলেছিলেন, এই নামাজ আদায় করলে আল্লাহ তায়ালা বান্দার আগের, পরের, পুরাতন, নতুন, ইচ্ছাকৃত, অনিচ্ছাকৃত, ছোট, বড়, গোপন ও প্রকাশ্য—সব ধরনের গুনাহ ক্ষমা করে দেন। 

রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছিলেন: 

  • সম্ভব হলে প্রতিদিন একবার এই নামাজ পড়বেন।

  • প্রতিদিন না পারলে সপ্তাহে একবার।

  • সপ্তাহে না পারলে মাসে একবার।

  • মাসে না পারলে বছরে একবার।

  • আর বছরেও যদি সম্ভব না হয়, তবে জীবনে অন্তত একবার হলেও এই নামাজ আদায় করা উচিত।


সম্পর্কিত নিউজ