{{ news.section.title }}
জুমার নামাজ কত রাকাত, নিয়ম, গুরুত্ব ও ফজিলত
জুমার নামাজ মূলত ২ রাকাত ফরজ, যা জামাতের সাথে ইমামের পেছনে আদায় করতে হয়। তবে এই ফরজের আগে ও পরে সুন্নাত ও নফল মিলিয়ে সাধারণত ১০ বা ১২ রাকাত নামাজ পড়া হয়।
জুমার নামাজ মূলত ২ রাকাত ফরজ। তবে সুন্নাত ও নফলসহ জুমার দিন সাধারণত ১০ বা ১২ রাকাত নামাজ আদায় করা হয়।
জুমার নামাজের রাকাত বিন্যাস (হানাফি মাযহাব অনুযায়ী):
ফরজ: ২ রাকাত (খুতবার পরে জামাতে)।
পূর্বের সুন্নত: ৪ রাকাত সুন্নতে মুয়াক্কাদা।
পরের সুন্নত: ৪ রাকাত সুন্নতে মুয়াক্কাদা।
পরের অতিরিক্ত সুন্নত: ২ রাকাত (সুন্নতে গায়রে মুয়াক্কাদা বা নফল)।
অনেকে ফরজের আগে ও পরে মিলিয়ে মোট ১২ বা ১৪ রাকাত আদায় করেন, তবে ফরজ ২ রাকাতই অবশ্য পালনীয়।
সব মিলিয়ে জুমার গুরুত্বপূর্ণ নামাজ মোট ১০ রাকাত। এর বাইরে মসজিদে প্রবেশ করে খুতবা শুরু হওয়ার আগে 'দুখুলুল মসজিদ' বা 'তাহিয়াতুল মসজিদ' হিসেবে ২ রাকাত নামাজ পড়ারও নিয়ম আছে।
জুমার নামাজ আদায়ের সঠিক নিয়ম ও পদ্ধতি নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
জুমার নামাজের ধারাবাহিক নিয়ম
জুমার নামাজের সময় জোহরের ওয়াক্তেই শুরু হয়। জুমার নামাজ মূলত ১০ রাকাত (সুন্নত ও ফরজ মিলিয়ে) এবং এর প্রধান ধাপগুলো হলো:
১. মসজিদে প্রবেশ ও তাহিয়াতুল মসজিদ: মসজিদে প্রবেশের পর খুতবা শুরু হওয়ার আগে দুই রাকাত 'তাহিয়াতুল মসজিদ' নামাজ আদায় করা সুন্নত।
২. ৪ রাকাত কবলাল জুমা: এটি জুমার ফরজের আগে পড়তে হয়। যদি খুতবা শুরু হয়ে যায়, তবে নামাজ সংক্ষিপ্ত করে দ্রুত শেষ করে খুতবা শোনা ওয়াজিব।
৩. খুতবা শোনা: ইমাম সাহেব যখন মিম্বরে বসে খুতবা শুরু করেন, তখন সব ধরণের কথা বলা বা অন্য নামাজ পড়া বন্ধ করে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনা ওয়াজিব।
৪. ২ রাকাত ফরজ নামাজ: খুতবা শেষ হলে ইমামের পেছনে জামাতের সাথে এই ২ রাকাত ফরজ নামাজ আদায় করতে হয়।
৫. ৪ রাকাত বাদাল জুমা: ফরজের পর এই ৪ রাকাত সুন্নত নামাজ আদায় করতে হয়।
জুমার নামাজের নিয়ম ও পদ্ধতি
জুমার ২ রাকাত ফরজ নামাজ ইমামের পেছনে জামাতে পড়ার নিয়ম ৫ ওয়াক্ত নামাজের মতোই, তবে কিছু নির্দিষ্ট বিষয় খেয়াল রাখতে হয়:
নিয়াত: মনে মনে এই ইচ্ছা পোষণ করা যে, আমি ইমামের পেছনে জুমার ২ রাকাত ফরজ নামাজ আদায় করছি।
তাকবীরে তাহরিমা: ইমাম সাহেব 'আল্লাহু আকবার' বলে হাত বাঁধলে আপনিও হাত বাঁধবেন এবং 'সানা' পড়বেন। এরপর চুপচাপ ইমামের কিরাত (সুরা পাঠ) শুনবেন।
রুকু ও সিজদা: ইমামের অনুসরণ করে রুকু ও সিজদা সম্পন্ন করবেন।
তাশাহুদ ও সালাম: দ্বিতীয় রাকাতে সিজদার পর বসে তাশাহুদ, দরুদ ও দোয়া মাসুরা পড়ে ইমামের সাথে সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করবেন।
কিছু গুরুত্বপূর্ণ আদব
গোসল ও পরিচ্ছন্নতা: জুমার দিন গোসল করা, পরিষ্কার কাপড় পরা এবং সুগন্ধি ব্যবহার করা সুন্নত।
আগে যাওয়া: আজান হওয়ার সাথে সাথে সব কাজ বন্ধ করে দ্রুত মসজিদের দিকে যাওয়া কুরআনের নির্দেশ।
নিরবতা পালন: খুতবা চলাকালীন মোবাইল ব্যবহার করা, কথা বলা বা এমনকি কাউকে কথা বলতে নিষেধ করার জন্যও শব্দ করা নিষেধ।
জুমার নামাজের গুরুত্ব
কুরআন ও হাদিসের আলোকে জুমার নামাজের গুরুত্ব অপরিসীম। ইসলামে জুমার দিনকে 'সাপ্তাহিক ঈদ' এবং দিনগুলোর মধ্যে 'শ্রেষ্ঠ দিন' হিসেবে গণ্য করা হয়।
কুরআনের আলোকে গুরুত্ব
পবিত্র কুরআনে জুমার নামাজের গুরুত্ব সম্পর্কে মহান আল্লাহ একটি স্বতন্ত্র সুরা—'সুরা আল-জুমুআ'—নাজিল করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন:
"হে মুমিনগণ! জুমার দিনে যখন নামাজের জন্য আজান দেওয়া হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হও এবং বেচাকেনা ত্যাগ করো। এটিই তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে।" (সুরা জুমুআ, আয়াত: ৯)
এই আয়াত দ্বারা জুমার নামাজ পড়া ফরজ করা হয়েছে এবং আজানের পর ব্যবসা-বাণিজ্য বা দুনিয়াবি কাজ করা হারাম বা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
হাদিসের আলোকে গুরুত্ব
হাদিস শরিফে জুমার দিন এবং এই নামাজের অনেক ফজিলত বর্ণিত হয়েছে:
শ্রেষ্ঠ দিন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "সূর্য উদিত হয় এমন দিনগুলোর মধ্যে জুমার দিন হলো শ্রেষ্ঠ দিন"। এই দিনেই হযরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং এই দিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে।
গুনাহ মাফ: যে ব্যক্তি জুমার দিন উত্তমরূপে গোসল ও পবিত্রতা অর্জন করে মসজিদে যায় এবং মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনে, তার এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমা পর্যন্ত (এবং অতিরিক্ত আরও তিন দিনের) ছোট গুনাহগুলো মাফ করে দেওয়া হয়।
উটের কুরবানির সওয়াব: জুমার আজানের পর সবার আগে মসজিদে প্রবেশকারী ব্যক্তি একটি উট কুরবানি করার সমান সওয়াব লাভ করেন।
দোয়া কবুলের বিশেষ সময়: জুমার দিন এমন একটি সময় আছে, যখন বান্দা আল্লাহর কাছে যা চায়, আল্লাহ তাকে তা-ই দান করেন।
হুঁশিয়ারি: যারা অবহেলা করে জুমার নামাজ ত্যাগ করে, তাদের সম্পর্কে রাসূল (সা.) কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, "যে ব্যক্তি পরপর তিনটি জুমা অলসতা করে ছেড়ে দেবে, আল্লাহ তার অন্তরে মোহর মেরে দেবেন"।
জুমার নামাজের ফজিলত
জুমার দিনের ফজিলত বা গুরুত্ব অপরিসীম। বিভিন্ন সহিহ হাদিসের আলোকে এই দিনের বিশেষ কিছু ফজিলত নিচে দেওয়া হলো:
১. গুনাহ মাফ হওয়ার মাধ্যম
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি জুমার দিন উত্তমরূপে গোসল করে মসজিদে যায় এবং ইমামের খুতবা মনোযোগ দিয়ে শোনে, তার এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমা পর্যন্ত (এবং অতিরিক্ত আরও তিন দিনের) সমস্ত ছোট গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।
২. আমলনামায় বিশাল সওয়াব
জুমার দিন আগে আগে মসজিদে যাওয়ার বিশেষ সওয়াব রয়েছে। নবীজি (সা.) এর বর্ণনা অনুযায়ী:
প্রথম ঘণ্টায় প্রবেশকারী: একটি উট কুরবানি করার সওয়াব পান।
দ্বিতীয় ঘণ্টায় প্রবেশকারী: একটি গরু কুরবানি করার সওয়াব পান।
তৃতীয় ঘণ্টায় প্রবেশকারী: একটি দুম্বা কুরবানি করার সওয়াব পান।
চতুর্থ ঘণ্টায় প্রবেশকারী: একটি মুরগি সদকা করার সওয়াব পান।
পঞ্চম ঘণ্টায় প্রবেশকারী: একটি ডিম সদকা করার সওয়াব পান।
৩. দোয়া কবুলের বিশেষ সময়
জুমার দিনে এমন একটি মুহূর্ত বা সময় আছে, যে সময় কোনো মুসলিম বান্দা আল্লাহর কাছে যা চায়, আল্লাহ তাকে তা-ই দান করেন। অধিকাংশ আলেমের মতে, এই সময়টি হলো আসর থেকে মাগরিবের মধ্যবর্তী সময়।
৪. প্রতিটি কদমে এক বছরের ইবাদতের সওয়াব
একটি হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি জুমার দিন আগেভাগে গোসল করে পায়ে হেঁটে মসজিদে যায়, তার প্রতি কদমে (পদক্ষেপে) এক বছর নফল রোজা ও এক বছর নফল নামাজের সওয়াব আমলনামায় লেখা হয়।
৫. জাহান্নাম থেকে মুক্তি ও বিশেষ মর্যাদা
জুমার দিন ও রাতে (বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত) ইন্তেকালকারী ব্যক্তিকে আল্লাহ তায়ালা কবরের আজাব থেকে রক্ষা করেন।
এই দিনকে ইসলামের ইতিহাসে 'সাপ্তাহিক ঈদ' বলা হয়েছে, যা অন্য সাধারণ দিনের চেয়ে বেশি মর্যাদাপূর্ণ।