নবম পে-স্কেলে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতন কত?

নবম পে-স্কেলে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতন কত?
ছবির ক্যাপশান, এআই ছবি

দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার পর অবশেষে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রস্তুতি দৃশ্যমান পর্যায়ে পৌঁছেছে। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে এ খাতে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ১ জুলাই থেকেই নতুন পে-স্কেল কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে নীতিগত অনুমোদন দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেও একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

প্রায় এক দশকের বেশি সময় পর নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সম্ভাবনায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। বিশেষ করে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দীর্ঘদিন ধরেই নতুন পে-স্কেলের দাবি জানিয়ে আসছিলেন তারা।

 

জানা গেছে, নবম পে-কমিশন মোট ২০টি গ্রেডভিত্তিক নতুন বেতন কাঠামোর সুপারিশ করেছে। কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী, সরকারি চাকরিজীবীদের সর্বনিম্ন বেতন বর্তমান ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে। অন্যদিকে সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

 

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে সরকার দুটি বিকল্প পদ্ধতি বিবেচনা করছে। প্রথম পরিকল্পনা অনুযায়ী, তিন ধাপে পুরো বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করা হবে। এতে প্রথম বছরে প্রস্তাবিত মূল বেতনের ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি কার্যকর করা হবে। দ্বিতীয় বছরে বাকি অংশের বেতন সমন্বয় করা হবে। আর তৃতীয় বছরে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত ও অন্যান্য ভাতা পর্যায়ক্রমে যুক্ত করা হবে।

 

অন্যদিকে দ্বিতীয় বিকল্প পরিকল্পনায় দুই অর্থবছরের মধ্যে ধাপে ধাপে পুরো পে-স্কেল বাস্তবায়নের চিন্তাও রয়েছে। তবে কোন পদ্ধতি চূড়ান্ত হবে, সে বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি।

 

এদিকে মূল্যস্ফীতি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ এবং সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় পুরো বিষয়টি পর্যালোচনার জন্য মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি নতুন বেতন কাঠামোর সম্ভাব্য প্রভাব, অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ এবং বাস্তবায়ন কৌশল নিয়ে কাজ করছে।

 

পে-কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, নবম পে-স্কেল পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে সরকারের অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হতে পারে। এর মধ্যে প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধিতে। বাকি অর্থ ব্যয় হবে পেনশনভোগী ও এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য।

 

বর্তমানে দেশে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং প্রায় ৯ লাখ পেনশনভোগী রয়েছেন। তাদের পেছনে সরকারের বর্তমান বাৎসরিক ব্যয় প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়িত হলে এই ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হওয়ায় সরকার একবারে পুরো সুবিধা কার্যকর করতে চাইছে না। এজন্য ধাপে ধাপে বেতন ও ভাতা বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যাতে বাজেটের ওপর চাপ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।

 

আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের আকার হতে পারে প্রায় ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১৮ শতাংশ বেশি। একই সঙ্গে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল বাজেট কাঠামোর মধ্যেই নতুন পে-স্কেলের ব্যয় সমন্বয়ের পরিকল্পনা করছে সরকার।

 

উল্লেখ্য, সর্বশেষ ২০১৫ সালে অষ্টম জাতীয় পে-স্কেল ঘোষণা করা হয়েছিল। এরপর প্রায় ১১ বছর নতুন কোনো পে-স্কেল কার্যকর হয়নি। এর মধ্যে করোনা মহামারি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট, ডলারের অস্থিরতা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সরকারি চাকরিজীবীদের বাস্তব আয় অনেকটাই কমে যায়। ফলে নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছিল।

 

বিশ্লেষকদের মতে, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন সরকারি চাকরিজীবীদের আর্থিক স্বস্তি বাড়াবে এবং বাজারে ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি করবে। তবে একই সঙ্গে অতিরিক্ত অর্থ সরবরাহের কারণে মূল্যস্ফীতির ওপর কী প্রভাব পড়ে, সেটিও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।


সম্পর্কিত নিউজ