{{ news.section.title }}
মাত্র ২১ বছরে ঘন জঙ্গল হারাল সেন্টমার্টিন, এর পেছনে জমি বিক্রির অজানা গল্প জানুন!
সেন্টমার্টিনের সবুজ মানচিত্র চোখের সামনে বদলে গেছে। মাত্র ২১ বছরের ব্যবধানে দ্বীপের যে অংশে একসময় ঘন জঙ্গল, কেয়াবন, ঝোপঝাড়, প্রাকৃতিক খাল ও জলাভূমি ছিল, সেখানে এখন অনেক জায়গায় দেখা যায় খোলা জমি, ভরাট এলাকা, বসতি ও পর্যটন স্থাপনার বিস্তার। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই পরিবর্তনের পেছনে শুধু পর্যটনের চাপ নয়, আছে জমি বেচাকেনা, দালালচক্র ও দুর্বল ভূমি ব্যবস্থাপনার দীর্ঘ গল্প।
সেন্টমার্টিনের স্থানীয় বাসিন্দা তাইয়ুব উল্লাহর ভাষ্য, ২০০৩-০৪ সাল থেকেই দ্বীপে জঙ্গল উজাড় করে জমি বের করা, জমি দখল এবং বহিরাগতদের কাছে কম দামে বিক্রির প্রবণতা বাড়তে থাকে। তাঁর দাবি, সে সময় বহিরাগতদের কাছে জমি বিক্রি ও নামজারিতে কড়াকড়ি থাকলেও বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি। স্থানীয় দালালচক্র ও প্রভাবশালী মহল বিভিন্নভাবে জমি কেনাবেচার পথ তৈরি করে।
তাইয়ুব উল্লাহর অভিযোগ, ভূমি অফিসের দুর্নীতি, দালালদের দৌরাত্ম্য এবং স্থানীয় মানুষের আর্থিক সংকট মিলিয়ে দ্বীপে জমির বাজার অস্বাভাবিকভাবে বদলে যায়। অনেক পরিবার দ্রুত টাকা পাওয়ার আশায় বাপ-দাদার জমি বিক্রি করে দেয়। কোথাও কোথাও ওয়ারিশ সনদ নিয়ে জটিলতা, আত্মীয়স্বজনকে বঞ্চিত করা, ভাইবোনের মধ্যে বিরোধ, মামলা ও পারিবারিক দূরত্বও তৈরি হয়। জমির মালিকানা বদলাতে থাকে, আর একই সঙ্গে হারাতে থাকে দ্বীপের প্রাকৃতিক সুরক্ষা।
পরিবেশবিদদের মতে, সেন্টমার্টিনের জঙ্গল শুধু গাছপালা নয়, এটি দ্বীপের বেঁচে থাকার প্রাকৃতিক ঢাল। কেয়াবন, ঝোপঝাড়, খাল, জলাভূমি ও উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী ঢেউ, জলোচ্ছ্বাস, মাটিক্ষয় ও লবণাক্ততার চাপ কমাতে ভূমিকা রাখে। এসব জায়গা কেটে বা ভরাট করে স্থাপনা নির্মাণ করলে দ্বীপের পরিবেশগত ভারসাম্য দ্রুত নষ্ট হয়। ফলে সমুদ্রের ঢেউ সরাসরি বসতি ও স্থাপনায় আঘাত করে, উপকূল ক্ষয় বাড়ে এবং জীববৈচিত্র্য সংকটে পড়ে।
সেন্টমার্টিনকে ১৯৯৯ সালে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল দ্বীপের কোরাল, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য, কেয়াবন, জলাভূমি ও প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা করা। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ঘোষণার পরও দ্বীপে অবৈধ স্থাপনা, অপরিকল্পিত হোটেল-রিসোর্ট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং পর্যটকের অতিরিক্ত চাপ অব্যাহত ছিল। সাম্প্রতিক সময়েও কেয়াগাছ কাটার অভিযোগ সামনে এসেছে, যা দ্বীপটির জন্য বড় সতর্কবার্তা।
স্থানীয়দের একাংশ মনে করেন, শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সেন্টমার্টিনকে রক্ষা করা যায়নি। তাইয়ুব উল্লাহর মতে, যখন স্থানীয় মানুষ কম দামে জমি বিক্রি করছিল, তখন সরকার চাইলে দ্বীপের জঙ্গল, খাল, জলাভূমি, সৈকত ও সংরক্ষণযোগ্য জমির বড় অংশ অধিগ্রহণ করতে পারত। এতে স্থানীয়রা ন্যায্যমূল্য পেতেন, জমি নিয়ে পারিবারিক প্রতারণা কমত এবং সরকার পরিকল্পিতভাবে সংরক্ষিত অঞ্চল, বনায়ন ও নিয়ন্ত্রিত পর্যটন এলাকা তৈরি করতে পারত।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সেন্টমার্টিন রক্ষায় যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে হবে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা, মালিকানা অধিকার ও পরিবেশ সংরক্ষণের ভারসাম্য রেখে। দ্বীপবাসীর বিকল্প আয়, স্বচ্ছ ভূমি রেকর্ড, অবৈধ স্থাপনা নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পর্যটক সীমিতকরণ ছাড়া শুধু আইন করে কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না।
সেন্টমার্টিনের হারিয়ে যাওয়া জঙ্গল এখন এক বড় শিক্ষা। জমি বিক্রি করে সাময়িক লাভ হলেও দ্বীপ হারালে ক্ষতি হবে সবার। তাই এখনই বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, কঠোর নজরদারি এবং স্থানীয়দের অংশগ্রহণ নিশ্চিত না করা গেলে সেন্টমার্টিনের বাকি সবুজ অংশও একই পরিণতির মুখে পড়তে পারে।