{{ news.section.title }}
নতুন বিশ্ব অর্থনীতির খেলায় বাংলাদেশ কেন ব্রিক্সকে গুরুত্ব দিচ্ছে না?
বাংলাদেশের জন্য ব্রিক্স জোটে যোগদান এখন আর শুধু কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয় নয়। পরিবর্তিত বিশ্ব অর্থনীতি, ডলারনির্ভর বাণিজ্যব্যবস্থা, নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের বাস্তবতায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পদক্ষেপ হয়ে উঠতে পারে।
ব্রিক্স মূলত উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর একটি প্রভাবশালী প্ল্যাটফর্ম। ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার মাধ্যমে যাত্রা শুরু করা এই জোট পরবর্তী সময়ে সম্প্রসারণের পথে এগিয়েছে। বাংলাদেশ ২০২৩ সালে ব্রিক্সে যোগদানের আগ্রহ প্রকাশ করে এবং সদস্যপদের জন্য আনুষ্ঠানিক আবেদনও করে। তবে পরবর্তী সম্প্রসারণে বাংলাদেশ সদস্যপদ পায়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্রিক্সে যুক্ত হওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক সুযোগ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে রপ্তানি বাজার বৈচিত্র্যকরণ, বিনিয়োগ আকর্ষণ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বিকল্প মুদ্রায় বাণিজ্যের সম্ভাবনা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
বর্তমানে বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে ডলারের ওপর নির্ভরতা বেশি। বৈশ্বিক বাজারে ডলারের ওঠানামা, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাপ অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলে। ব্রিক্সের দেশগুলো নিজেদের মধ্যে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়ানোর আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ এ ধরনের ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হতে পারলে আমদানি ব্যয় ব্যবস্থাপনা ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপ কমানোর ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ পেতে পারে।
ব্রিক্সে চীন ও ভারতের মতো বাংলাদেশের বড় বাণিজ্য অংশীদার রয়েছে। একই সঙ্গে রাশিয়া, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা ও সম্প্রসারিত ব্রিক্স কাঠামোর অন্যান্য দেশ বাংলাদেশের জন্য নতুন বাজার হতে পারে। তৈরি পোশাকের বাইরে ওষুধ, চামড়া, কৃষিপণ্য, হালকা প্রকৌশল ও তথ্যপ্রযুক্তি সেবা রপ্তানির ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
অর্থনৈতিক সহযোগিতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিনিয়োগ ও অবকাঠামো। ব্রিক্সভিত্তিক নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ইতিমধ্যে রয়েছে। বড় অবকাঠামো, জ্বালানি, পরিবহন, নগর উন্নয়ন ও জলবায়ু সহনশীল প্রকল্পে অর্থায়নের ক্ষেত্রে এ ধরনের বহুপাক্ষিক প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশের জন্য কার্যকর হতে পারে।
তবে ব্রিক্সে যোগদানের সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু কূটনৈতিক ভারসাম্যের প্রশ্নও রয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি পশ্চিমা বাজার, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের ওপরও নির্ভরশীল। তাই ব্রিক্সের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর ক্ষেত্রে ঢাকা সতর্ক ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি বজায় রাখতে চাইবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে অবস্থান নয়, বরং জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে বহুমুখী অংশীদারত্ব গড়ে তোলা।
বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় অর্থনীতি ও ভূরাজনীতি ক্রমেই পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে। বাণিজ্য, মুদ্রা, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের প্রশ্নে নতুন জোট ও নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। এমন বাস্তবতায় ব্রিক্স বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি কূটনৈতিক ফোরাম নয়, বরং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক অবস্থান শক্তিশালী করার সম্ভাব্য প্ল্যাটফর্ম।
বাংলাদেশ যদি পরিকল্পিতভাবে ব্রিক্সের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে পারে, তাহলে নতুন বাজার, বিকল্প অর্থায়ন, বিনিয়োগ ও দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতার সুযোগ কাজে লাগানো সম্ভব হবে। তবে এ ক্ষেত্রে বাস্তবসম্মত কূটনীতি, বাণিজ্যিক প্রস্তুতি এবং জাতীয় স্বার্থভিত্তিক নীতিগত অবস্থানই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।