{{ news.section.title }}
হাম ছড়াচ্ছে, ঝুঁকিতে গর্ভবতী নারীরাও
দেশজুড়ে হামের উদ্বেগজনক প্রাদুর্ভাবের মধ্যে এবার শুধু শিশুরাই নয়, প্রাপ্তবয়স্করাও আক্রান্ত হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। বিশেষ করে গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে এই সংক্রমণ বাড়তি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। সময়মতো টিকাদান না হওয়া, সংক্রমণের দ্রুত বিস্তার এবং পরিবারের ভেতরে আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে থাকার কারণেই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
রাজধানীর মিরপুরের বাসিন্দা সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা রুমানা আক্তারের (ছদ্মনাম) পরিবারও সম্প্রতি এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। তার পাঁচ বছরের ছেলে প্রথমে জ্বর ও পরে শরীরে লালচে দানা নিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা নিশ্চিত করেন, শিশুটি হামে আক্রান্ত।
ছেলের সেবাযত্ন করতে গিয়েই কয়েকদিন পর রুমানার শরীরেও জ্বর, দুর্বলতা ও অস্বস্তি দেখা দেয়। পরে চিকিৎসকের পরামর্শে পরীক্ষা করালে জানা যায়, তিনিও হামের সংক্রমণে আক্রান্ত হয়েছেন। রুমানা বলেন, “ছেলেকে তো একা রাখা যায় না। ওর পাশে থেকেই যত্ন নিতে হয়েছে। কিন্তু পরে ডাক্তার বললেন, গর্ভাবস্থায় হাম হলে বাচ্চার জন্যও ঝুঁকি থাকতে পারে। তখন খুব ভয় পেয়ে যাই।”
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার (১২ মে) পর্যন্ত দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৩৬ হাজার ৮৮১ শিশু। এর মধ্যে ৭ হাজার ২৪ জনের সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৩২ হাজার ৮৭৭ শিশু। একই সময়ে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ৪২৪ জনের।
স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে সাত শিশুর মৃত্যু হচ্ছে এবং সহস্রাধিক নতুন আক্রান্ত শনাক্ত হচ্ছে। জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, হামের ভাইরাস অত্যন্ত সংক্রামক হওয়ায় আক্রান্ত শিশুদের মাধ্যমে পরিবারের অন্য সদস্যদের মধ্যেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে এখন অনেক প্রাপ্তবয়স্ক ও গর্ভবতী নারীও ঝুঁকিতে পড়ছেন।
শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. রিয়াজ মোবারক বলেন, “এখন হাসপাতালে প্রতিদিনই প্রাপ্তবয়স্ক রোগী পাওয়া যাচ্ছে। জ্বর, কাশি, শরীরে লালচে দানা, চোখ লাল হওয়া ও দুর্বলতা নিয়ে অনেক বড় মানুষ চিকিৎসা নিতে আসছেন। সাধারণত প্রাপ্তবয়স্কদের মৃত্যুঝুঁকি তুলনামূলক কম হলেও গর্ভবতী নারী আক্রান্ত হলে সেটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হয়।”
তিনি বলেন, গর্ভাবস্থায় হামের সংক্রমণ হলে মা ও গর্ভের শিশুর উভয়ের জন্যই জটিলতা তৈরি হতে পারে। এতে গর্ভপাত, অপরিণত সন্তান জন্ম, শিশুর কম ওজন নিয়ে জন্মানো, জন্মগত ত্রুটি এমনকি হৃদরোগের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
ডা. রিয়াজ মোবারক আরও বলেন, “হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশি, ব্যবহার্য জিনিসপত্র কিংবা কাছাকাছি অবস্থানের মাধ্যমেও ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে। তাই গর্ভবতী নারীদের আক্রান্ত শিশু বা রোগীর কাছ থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকতে হবে।” তার পরামর্শ, আক্রান্ত পরিবারের সদস্য থাকলে গর্ভবতী নারীকে প্রয়োজনে আলাদা কক্ষে রাখতে হবে। পাশাপাশি মাস্ক ব্যবহার, ঘনঘন সাবান দিয়ে হাত ধোয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা জরুরি।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গাইনি বিভাগের প্রধান ও ভাইস প্রিন্সিপাল অধ্যাপক ডা. মুসাররাত সুলতানা সুমি বলেন, “গর্ভবতী নারীদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা অনেক সময় কম থাকে। তাই হামের মতো সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হলে তাদের শারীরিক জটিলতা দ্রুত বাড়তে পারে।” তিনি বলেন, জ্বর, কাশি, চোখ লাল হওয়া বা শরীরে লালচে দানা ওঠার মতো উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়মতো টিকা না নেওয়াই বর্তমান পরিস্থিতির অন্যতম বড় কারণ। নিয়ম অনুযায়ী শিশুদের ৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সে হাম-রুবেলা টিকা দেওয়ার কথা থাকলেও অনেক শিশুই নির্ধারিত সময়ে টিকা পায়নি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরকার ইতোমধ্যে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে। এতে নতুন আক্রান্তের সংখ্যা কিছুটা কমার ইঙ্গিত মিললেও পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। অন্তত আরও এক মাস পরিস্থিতি উদ্বেগজনক থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চিকিৎসকরা বলছেন, হামের লক্ষণ দেখা দিলে আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে। আক্রান্ত ব্যক্তিকে আলাদা রাখতে হবে এবং শিশু, বৃদ্ধ ও গর্ভবতী নারীদের বিশেষভাবে সুরক্ষিত রাখতে হবে। বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, শুধু চিকিৎসা নয়-সচেতনতা, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং সময়মতো টিকাদানই পারে হামের ভয়াবহ বিস্তার রোধ করতে।