{{ news.section.title }}
পদ্মা ব্যারাজ কী, কেন গুরুত্ব পাচ্ছে প্রকল্পটি
দীর্ঘ কয়েক দশকের আলোচনা, সমীক্ষা ও পরিকল্পনার পর অবশেষে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে বহুল আলোচিত পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানি সংকট, নদীর নাব্যতা হ্রাস, লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও কৃষিতে পানির ঘাটতি মোকাবিলায় এটি একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাস্তবায়িত হলে এটি শুধু একটি ব্যারাজ প্রকল্পই হবে না; বরং দেশের পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষি, মৎস্য, নৌপথ ও পরিবেশ রক্ষায় বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলতে পারে।
ষাটের দশক থেকে শুরু হওয়া পরিকল্পনার বাস্তব রূপ
পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের ধারণা নতুন নয়। ১৯৬১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান পানি ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ প্রথমবারের মতো এ বিষয়ে সমীক্ষা শুরু করে। পরে বিভিন্ন সময়ে আরও কয়েকটি প্রাক-সম্ভাব্যতা ও সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালিত হয়।
ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণের আগেই গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকায় পানি সংরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আলোচনা শুরু হলেও ১৯৭৫ সালে ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজ চালুর পর বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ, উজানে পানি প্রত্যাহারের ফলে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বহু নদীতে শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
পরবর্তীতে ২০০২ সালে পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা কুষ্টিয়ার ঠাকুরবাড়ী অথবা রাজবাড়ীর পাংশায় ব্যারাজ নির্মাণের সুপারিশ করে। এরপর ২০০৯ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে বিস্তারিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, প্রকৌশল নকশা এবং কারিগরি মূল্যায়নের কাজ সম্পন্ন হয়।
পদ্মা ব্যারাজ কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, রাজবাড়ীর পাংশা এলাকায় পদ্মা নদীর ওপর নির্মিত হবে মূল ব্যারাজ। এর মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে বিপুল পরিমাণ পানি সংরক্ষণ করে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোতে স্বাদু পানির প্রবাহ নিশ্চিত করা হবে। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, ব্যারাজে প্রায় ২৯০ কোটি ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। এর ফলে গড়াই-মধুমতি, হিসনা-মাথাভাঙ্গা, চন্দনা-বারাশিয়া, ইছামতি ও বড়াল নদী ব্যবস্থার পুনরুজ্জীবন ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততার বিস্তার কমানো, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং সুন্দরবনের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রেও এ প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কী কী থাকবে এই মেগা প্রকল্পে
পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ মূল ব্যারাজ নির্মাণ করা হবে। এতে থাকবে-
- ৭৮টি পানি নির্গমন পথ
- ১৮টি নিম্নস্রোত নিয়ন্ত্রণ কাঠামো
- মাছ চলাচলের বিশেষ পথ
- নৌযান চলাচলের জন্য নেভিগেশন লক
- নদীতীর রক্ষাবাঁধ
- গড়াই, চন্দনা ও হিসনা নদীর জন্য পৃথক পানি গ্রহণ কাঠামো
এছাড়া নদী ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে গড়াই-মধুমতি নদী ব্যবস্থায় ১৩৫ দশমিক ৬ কিলোমিটার খনন এবং হিসনা নদী ব্যবস্থায় প্রায় ২৪৬ কিলোমিটার পুনঃখননের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পের মাধ্যমে ১৬৫ কিলোমিটার দীর্ঘ জলাধারও তৈরি হবে, যা ভবিষ্যতে পানি সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
শুধু পানি নয়, থাকবে বিদ্যুৎ ও বহুমুখী যোগাযোগ সুবিধা
সরকার এ প্রকল্পকে শুধু পানি ব্যবস্থাপনায় সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না। পরিকল্পনায় জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগও রাখা হয়েছে। পাশাপাশি ব্যারাজের ওপর সড়ক যোগাযোগ, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন এবং গ্যাস পাইপলাইন স্থাপনের চিন্তাভাবনা রয়েছে।
ফলে এটি ভবিষ্যতে একটি বহুমুখী অবকাঠামোগত করিডরে পরিণত হতে পারে। প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ২৩ লাখ ৯০ হাজার টন ধান উৎপাদন এবং প্রায় ২ লাখ ৩৪ হাজার টন মাছ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে বলে সরকারি হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
কোন কোন এলাকা উপকৃত হবে
পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের প্রভাব পড়বে দেশের চারটি বিভাগের ২৬ জেলার ১৬৩ উপজেলায়। প্রথম পর্যায়ে ১৯ জেলার ১২০ উপজেলা সরাসরি উপকৃত হবে। এর মধ্যে রয়েছে-
- খুলনা বিভাগের কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, মাগুরা, যশোর, নড়াইল, বাগেরহাট, খুলনা ও সাতক্ষীরা
- ঢাকা বিভাগের রাজবাড়ী, ফরিদপুর ও গোপালগঞ্জ
- রাজশাহী বিভাগের পাবনা, রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ
- বরিশাল বিভাগের পিরোজপুর
বিশেষ করে যশোরের ভবদহ অঞ্চলের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধানে প্রকল্পটি সহায়ক হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
ফারাক্কার প্রভাব ও ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা
বিশ্লেষকদের মতে, পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের পেছনে সবচেয়ে বড় প্রেক্ষাপট হলো ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজ। ১৯৭৫ সালে ফারাক্কা চালুর পর শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীতে পানিপ্রবাহ কমে যায়। এর ফলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বহু নদী শুকিয়ে পড়ে, লবণাক্ততা বাড়ে এবং কৃষি ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বর্তমানে ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদও চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে। ফলে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পকে শুধু পানি ব্যবস্থাপনা নয়, কৌশলগত ও ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
ব্যয় ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা
প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার ৪৪৩ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। তবে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনায় প্রথম পর্যায়ে প্রায় ৩৩ হাজার ৪৭৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব অনুমোদন পেয়েছে।
জুলাই ২০২৬ থেকে জুন ২০৩৩ মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়-এর বন্যা ও পানি ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মাশফিকুস সালেহীন মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানি সংকট মোকাবিলায় এ প্রকল্প কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
তার মতে, শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ বৃদ্ধি পেলে লবণাক্ততা কমবে, কৃষি উৎপাদন বাড়বে এবং কিছু নদী পুনরুদ্ধারের সুযোগ সৃষ্টি হবে। তবে একই সঙ্গে নদীর হাইড্রো-মরফোলজিক্যাল পরিবর্তন নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজন অনুযায়ী সমীক্ষা হালনাগাদ করারও পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।