সিন্ডিকেটের চাপে থমকে আছে বায়ুবিদ্যুৎ খাত?

সিন্ডিকেটের চাপে থমকে আছে বায়ুবিদ্যুৎ খাত?
ছবির ক্যাপশান, প্রতীকী এআই জেনারেটেড ছবি

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের বাতাসে লুকিয়ে রয়েছে বিপুল বিদ্যুৎ সম্ভাবনা। অথচ সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর পরিবর্তে দেশ এখনও ব্যাপকভাবে নির্ভর করছে আমদানিনির্ভর গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের ওপর। ফলে একদিকে যেমন বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বাড়ছে চাপ, অন্যদিকে সাধারণ মানুষকে সহ্য করতে হচ্ছে লোডশেডিং ও উচ্চ বিদ্যুৎ বিলের বোঝা।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের USAID এবং NREL–এর গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় ৭১০ কিলোমিটার দীর্ঘ উপকূলীয় এলাকায় প্রায় ৩০ হাজার মেগাওয়াট বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সম্ভাবনার সামান্য অংশও কাজে লাগানো গেলে দেশের বিদ্যুৎ খাতে আমূল পরিবর্তন আসতে পারে।

 

তবে বাস্তবতা হলো, বর্তমানে বাংলাদেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাত্র ০.২২ শতাংশ আসে বায়ুশক্তি থেকে। বিশ্লেষকদের মতে, এর অন্যতম কারণ হলো দীর্ঘদিন ধরে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎ খাতে গড়ে ওঠা শক্তিশালী আমদানি ও ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট।

 

প্রতি বছর কয়লা, গ্যাস ও জ্বালানি আমদানিতে বাংলাদেশকে প্রায় ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, অর্থাৎ প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়। সমালোচকদের দাবি, এই বিশাল আমদানি ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলো কখনোই চাইবে না দেশ সহজ ও কম খরচে বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনে এগিয়ে যাক। কারণ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে কমিশনভিত্তিক বড় বাণিজ্যের সুযোগ তুলনামূলকভাবে কম।

 

দীর্ঘদিন ধরে দেশে একটি প্রচলিত ধারণা ছিল যে বাংলাদেশের বাতাসে পর্যাপ্ত গতি নেই, তাই বায়ুবিদ্যুৎ কার্যকর নয়। তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিক প্রযুক্তির ১২০ থেকে ১৬০ মিটার উচ্চতার টারবাইন কম গতির বাতাসেও কার্যকরভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সক্ষম। শুধু তাই নয়, সৌরবিদ্যুতের মতো এটি কেবল দিনের আলোয় সীমাবদ্ধ নয়; বর্ষাকাল কিংবা রাতেও বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব।

 

বিশেষজ্ঞরা উদাহরণ হিসেবে কক্সবাজার বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র-এর ৬০ মেগাওয়াট প্রকল্পের কথা উল্লেখ করছেন, যা বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে বায়ুশক্তির কার্যকারিতার বাস্তব প্রমাণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ, দেশে বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পের যন্ত্রাংশ আমদানিতে এখনও উচ্চ শুল্ক ও কর বিদ্যমান। ফলে এই খাতে বড় বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হচ্ছে। অনেকের মতে, সরকার যদি নীতিগত সহায়তা, কর ছাড় এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করত, তাহলে বেসরকারি খাতও এই খাতে ব্যাপকভাবে এগিয়ে আসতে পারত।

 

জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিবছর জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় হওয়া বিপুল অর্থের মাত্র ৫ থেকে ১০ শতাংশও যদি বায়ুবিদ্যুৎ ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ করা হতো, তাহলে বাংলাদেশ আজ অনেকাংশে লোডশেডিংমুক্ত হতে পারত। একই সঙ্গে ডলারের ওপর চাপ কমে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও স্থিতিশীল থাকত।

 

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, বাংলাদেশের গভীর সমুদ্র এলাকায় (অফশোর) বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যে অফশোর উইন্ড ফার্মের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। বাংলাদেশও যদি এখন থেকেই পরিকল্পিত বিনিয়োগ ও নীতিগত সংস্কার শুরু করে, তাহলে ভবিষ্যতে পরিচ্ছন্ন, সাশ্রয়ী এবং টেকসই বিদ্যুৎ ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।

 

তাদের মতে, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিনির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার এখনই উপযুক্ত সময়।


সম্পর্কিত নিউজ