দেশে এলো ১ লাখ টন জ্বালানি তেল, খালাস হচ্ছে ইআরএল জেটিতে

দেশে এলো ১ লাখ টন জ্বালানি তেল, খালাস হচ্ছে ইআরএল জেটিতে
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি ও হরমুজ প্রণালি ঘিরে সরবরাহ জটিলতার কারণে দীর্ঘ বিরতির পর দেশে পৌঁছেছে ক্রুড অয়েলবাহী ট্যাংকার জাহাজ ‘এমটি নিনেমিয়া’। সৌদি আরব থেকে ১ লাখ টন ক্রুড অয়েল নিয়ে আসা জাহাজটি বুধবার (৬ মে) দুপুরে চট্টগ্রাম বন্দরের কুতুবদিয়া বহির্নোঙরে নোঙর করে। বৃহস্পতিবার (৭ মে) থেকে এই তেল লাইটার জাহাজের মাধ্যমে পতেঙ্গার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) জেটিতে খালাস প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি) সূত্র জানায়, বিকল্প রুট ব্যবহার করে সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে গত ২১ এপ্রিল রওনা দেয় ‘এমটি নিনেমিয়া’। দীর্ঘ ১৫ দিনের যাত্রা শেষে বুধবার দুপুর ১২টা ১৫ মিনিটে জাহাজটি কুতুবদিয়া অ্যাঙ্করেজে পৌঁছায়। এর আগে জাহাজটির সকাল ১১টার দিকে পৌঁছানোর কথা থাকলেও সমুদ্র উত্তাল থাকায় প্রায় সোয়া এক ঘণ্টা দেরি হয়।

 

জাহাজটি থেকে ক্রুড অয়েল খালাসের জন্য আগে থেকেই ছয়টি লাইটার জাহাজ প্রস্তুত রাখা হয়। সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রতিটি লাইটার জাহাজ একেক ট্রিপে প্রায় ৪ হাজার টন পর্যন্ত ক্রুড অয়েল পরিবহন করতে সক্ষম। সে হিসাবে প্রতিদিন অন্তত ২৪ হাজার টন ক্রুড খালাস করা সম্ভব হতে পারে। তবে সমুদ্র উত্তাল থাকলে নিরাপত্তার কারণে প্রতিটি ট্রিপে কিছুটা কম তেল পরিবহন করা হতে পারে।

 

বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক বলেন, জাহাজটি বুধবার বেলা ১১টার দিকে পৌঁছানোর কথা থাকলেও বৈরী সমুদ্র পরিস্থিতির কারণে কুতুবদিয়ায় নোঙর করতে কিছুটা সময় লেগেছে। বুধবার দুপুর থেকেই ছয়টি লাইটার জাহাজ দিয়ে কার্গো খালাসের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। তিনি বলেন, প্রতিটি লাইটার ৪ হাজার টন করে ক্রুড বহন করতে সক্ষম হলেও আবহাওয়া ও সাগরের অবস্থার ওপর নির্ভর করে খালাস কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।

 

ইস্টার্ন রিফাইনারি দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার, যা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) অধীন পরিচালিত। রিফাইনারিটি পুরোপুরি আমদানি করা ক্রুড অয়েলের ওপর নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ও হরমুজ প্রণালি ঘিরে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় গত ফেব্রুয়ারির পর নতুন ক্রুড অয়েল চালান দেশে পৌঁছাতে বিলম্ব হয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইআরএল সর্বশেষ ১৮ ফেব্রুয়ারির পর আর নতুন কাঁচামাল পায়নি; ফলে মজুত দ্রুত কমে গিয়ে উৎপাদন কমাতে হয় এবং শেষ পর্যন্ত কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।

 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন চালানটি ইস্টার্ন রিফাইনারির জন্য বড় স্বস্তি নিয়ে এসেছে। বহির্নোঙর থেকে লাইটার জাহাজে করে ক্রুড অয়েল পতেঙ্গায় পৌঁছানোর পর প্রায় এক মাস বন্ধ থাকা রিফাইনারিটি ধাপে ধাপে উৎপাদনে ফিরবে। কিছু সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, খালাস ও কারিগরি প্রস্তুতি শেষ হলে ৮ বা ৯ মে থেকে ইআরএল পূর্ণ উৎপাদনে ফিরতে পারে।

 

বাংলাদেশ সাধারণত সরকার-টু-সরকার পদ্ধতিতে সৌদি আরব থেকে অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে মারবান ক্রুড আমদানি করে। এসব ক্রুড পরিবহনের দায়িত্ব পালন করে সরকারি পতাকাবাহী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন। তবে চলমান মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে নির্ধারিত চালানগুলো সময়মতো দেশে আনা যায়নি। সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দরে লোড করা ১ লাখ টন ক্রুডবাহী ‘এমটি নর্ডিক পালং’ নামের জাহাজটি আটকে পড়ে এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবল দানা বন্দর থেকে নির্ধারিত আরেক চালানও বাতিল হয় বলে জানা গেছে।

 

যুদ্ধ পরিস্থিতি ও হরমুজ প্রণালি ঘিরে অনিশ্চয়তার কারণে এবার তেল পরিবহন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিএসসির এমডি জানান, যুদ্ধের আগে প্রতি টন জ্বালানি পরিবহনে যেখানে ৫০ থেকে ৬০ ডলার খরচ হতো, এবার সেখানে ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৪২ ডলার। জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি, রুট পরিবর্তন, নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং বীমা ব্যয়-সব মিলিয়ে ক্রুড পরিবহনের খরচ বেড়েছে। এ অবস্থায় দেশের জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে তেল পরিবহনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

 

ইস্টার্ন রিফাইনারি বছরে গড়ে প্রায় ১৫ থেকে ১৬ লাখ টন ক্রুড অয়েল প্রক্রিয়াজাত করে। বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার বড় অংশই পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানির মাধ্যমে পূরণ হয়; আর বাকি অংশ আসে চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারিতে আমদানি করা ক্রুড পরিশোধনের মাধ্যমে। ফলে রিফাইনারির উৎপাদন বন্ধ থাকলে আমদানি করা পরিশোধিত জ্বালানির ওপর চাপ বাড়ে।

 

বিএসসি সূত্রে আরও জানা গেছে, চলতি মাসেই আরও দুই লাখ টন ক্রুড অয়েল দেশে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরা বন্দর থেকে ১০ মে ১ লাখ টন ক্রুড লোড করার সূচি রয়েছে। সবকিছু পরিকল্পনামাফিক এগোলে ২১ মের মধ্যে সেই চালান দেশে পৌঁছাতে পারে। এছাড়া মাসের শেষদিকে সৌদি আরব থেকে আরও ১ লাখ টন ক্রুড আনার বিষয়েও বিপিসির সঙ্গে কাজ চলছে।

 

এদিকে জ্বালানি সরবরাহে চাপ কমাতে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানিও অব্যাহত রয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ২৭ হাজার টন জেট ফুয়েল নিয়ে ‘এসইএস ব্রেভ’ নামের একটি জাহাজ বুধবার চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর কথা জানায় জাহাজটির স্থানীয় এজেন্ট প্রাইড শিপিং লাইন। এর আগে গত সোমবার ২৫ হাজার টন ফার্নেস অয়েল নিয়ে আরেকটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছায়।

 

জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘এমটি নিনেমিয়া’র আগমন শুধু একটি ক্রুড চালান নয়; এটি দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্বস্তির বার্তা। কারণ দীর্ঘদিন ক্রুড না আসায় ইআরএল বন্ধ হয়ে যায় এবং স্থানীয়ভাবে পরিশোধিত জ্বালানি উৎপাদন ব্যাহত হয়। নতুন চালান খালাস ও উৎপাদন শুরু হলে ডিজেলসহ বিভিন্ন পেট্রোলিয়াম পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ কিছুটা কমবে।

 

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও হরমুজ প্রণালি ঘিরে ঝুঁকি অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানিতে অনিশ্চয়তা থেকেই যাবে। কারণ দেশের অপরিশোধিত জ্বালানির বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। তাই ভবিষ্যতে আমদানি উৎস, রুট, জাহাজ ব্যবস্থাপনা এবং কৌশলগত মজুত-সব ক্ষেত্রে বিকল্প পরিকল্পনা জোরদার করা জরুরি বলে মনে করছেন তারা।


সম্পর্কিত নিউজ