{{ news.section.title }}
কুতুবদিয়ায় ভিড়ল ১ লাখ টন অপরিশোধিত তেলবাহী ‘নিনেমিয়া’
সৌদি আরব থেকে এক লাখ টন ক্রুড অয়েল নিয়ে আসা ট্যাংকার জাহাজ ‘এমটি নিনেমিয়া’ কুতুবদিয়া অ্যাংকরে পৌঁছেছে। বুধবার (৬ মে) দুপুরে জাহাজটি কুতুবদিয়া চ্যানেলে নোঙর করে। কাস্টমস ও সার্ভেয়ার কোম্পানির আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার পর বিকাল থেকেই ক্রুড লাইটারিং শুরুর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। সবকিছু পরিকল্পনামাফিক এগোলে বৃহস্পতিবার বা শুক্রবারের মধ্যে বন্ধ থাকা ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন কার্যক্রম পুনরায় চালু হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক জানান, বুধবার দুপুর ১২টার পর ‘এমটি নিনেমিয়া’ কুতুবদিয়ায় পৌঁছায়। জাহাজটি মার্শাল আইল্যান্ডসের পতাকাবাহী। ক্রুড স্থানান্তরের জন্য লাইটার জাহাজ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। বড় ট্যাংকার সরাসরি ইস্টার্ন রিফাইনারির জেটিতে যেতে না পারায় কুতুবদিয়া অ্যাংকর থেকে ছোট জাহাজের মাধ্যমে ধাপে ধাপে ক্রুড অয়েল খালাস করা হবে।
এর আগে মঙ্গলবার ইস্টার্ন রিফাইনারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী শরীফ হাসনাত জানিয়েছিলেন, ‘এমটি নিনেমিয়া’ বাংলাদেশ জলসীমার কাছাকাছি অবস্থান করছে। জাহাজটি কুতুবদিয়ায় নোঙর করার পর অফিসিয়াল আনুষ্ঠানিকতা শেষে লাইটারিং শুরু হবে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সব প্রস্তুতি ঠিক থাকলে ৭ মে প্ল্যান্ট চালুর আশা ছিল। তবে অন্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, লাইটার জাহাজের মাধ্যমে ক্রুড ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পৌঁছানো এবং কারিগরি প্রস্তুতি শেষ হওয়ার ওপর নির্ভর করে ৮ মে সকাল থেকে উৎপাদন শুরু হতে পারে।
ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের মালিকানাধীন দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত পেট্রোলিয়াম রিফাইনারি। চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় অবস্থিত এই রিফাইনারিতে পরিশোধনের জন্য ব্যবহৃত শতভাগ ক্রুড অয়েল আমদানি করতে হয়। বাংলাদেশ সাধারণত জি-টু-জি পদ্ধতিতে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ক্রুড অয়েল আমদানি করে থাকে। সরকারি আমদানিকৃত এসব ক্রুড পরিবহনের দায়িত্ব পালন করে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন।
ক্রুড অয়েল সংকটের কারণে গত ১২ এপ্রিল ইস্টার্ন রিফাইনারির মূল প্ল্যান্ট ক্রুড ডিস্টিলেশন ইউনিট বা সিডিইউ বন্ধ হয়ে যায়। পরে সিডিইউনির্ভর অন্য ইউনিটগুলোর কার্যক্রমও ব্যাহত হয়। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ ফেব্রুয়ারির পর থেকে রিফাইনারিতে নতুন কোনো ক্রুড চালান পৌঁছায়নি। ফলে প্রায় আড়াই মাস পর এই চালান আসায় দেশের জ্বালানি খাতে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও হরমুজ প্রণালি ঘিরে নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে বাংলাদেশের ক্রুড আমদানিতে জটিলতা তৈরি হয়। সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দর থেকে এক লাখ টন ক্রুড লোড করা নর্ডিক পোলাক্স নামের একটি ট্যাংকার হামলার আশঙ্কায় আটকে পড়ে। একই সময়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবল দানা বন্দর থেকে ক্রুড আনার নির্ধারিত সূচিও ব্যাহত হয়। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে মালিকপক্ষের জাহাজ পাঠাতে অনীহা দেখা দেওয়ায় ‘ওমেরা গ্যালাক্সি’ নামের ট্যাংকারের যাত্রাও বাতিল হয়। এসব কারণে বিকল্প উৎস ও রুট ব্যবহার করে সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে ‘এমটি নিনেমিয়া’ জাহাজে ক্রুড আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
ইস্টার্ন রিফাইনারি চালু হলে প্রথম ধাপে ডিজেল উৎপাদন স্বাভাবিক করার ওপর জোর দেওয়া হতে পারে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, ক্রুড রিফাইনারিতে পৌঁছালে প্রতিদিন প্রায় ৪ হাজার টন ডিজেল উৎপাদন সম্ভব হবে। দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় ডিজেল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ পরিবহন, কৃষি সেচ, শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর ব্যবহার রয়েছে।
বিপিসি ও বিএসসি সূত্রে জানা গেছে, জ্বালানি সরবরাহে ধারাবাহিকতা রাখতে আরও ক্রুড আমদানির প্রক্রিয়া চলছে। ফুজাইরা থেকে আরও এক লাখ টন ক্রুড নেওয়ার জন্য ‘এমটি ফসিল’ নামের আরেকটি জাহাজ ফুজাইরার পথে রয়েছে। জাহাজটি ১১ মে বাংলাদেশের উদ্দেশে ছাড়ার কথা রয়েছে। এ ছাড়া মে মাসের শেষ দিকে বা জুনের শুরুতে আরও এক লাখ টন ক্রুড আমদানির পরিকল্পনাও রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, ‘এমটি নিনেমিয়া’র আগমন শুধু একটি জাহাজের চালান নয়, বরং দেশের একমাত্র রিফাইনারির উৎপাদন পুনরায় চালুর জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। দীর্ঘদিন ক্রুড সংকটে রিফাইনারির কার্যক্রম বন্ধ থাকায় আমদানি করা পরিশোধিত জ্বালানির ওপর চাপ বাড়ছিল। এখন ক্রুড সরবরাহ শুরু হলে স্থানীয়ভাবে পরিশোধন কার্যক্রম পুনরায় চালু হবে এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ কিছুটা কমতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি স্থিতিশীল না হলে বাংলাদেশের ক্রুড আমদানিতে ঝুঁকি থেকেই যাবে। কারণ দেশের অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বড় অংশই মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর এবং সেসব চালান অনেক ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালি ঘিরে চলাচল করে। তাই ভবিষ্যতে আমদানি উৎস, রুট এবং জাহাজ ব্যবস্থাপনায় বিকল্প পরিকল্পনা রাখা জরুরি বলে মনে করছেন তারা।