দৃশ্যমান হচ্ছে জাপানি অর্থনৈতিক অঞ্চল: ১২ প্রতিষ্ঠানের ৩৫৩ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ, পাইপলাইনে আছে আরও

দৃশ্যমান হচ্ছে জাপানি অর্থনৈতিক অঞ্চল: ১২ প্রতিষ্ঠানের ৩৫৩ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ, পাইপলাইনে আছে আরও
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে গড়ে ওঠা বাংলাদেশ স্পেশাল ইকোনমিক জোনে এখন ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হচ্ছে শিল্পায়নের বাস্তব চিত্র। সেখানে একটি কারখানায় প্রায় ২০০ জন কর্মী-যাদের বেশিরভাগই নারী-সুশৃঙ্খলভাবে প্রোডাকশন লাইনে কাজ করছেন। কেউ চুলের বিন্যাস করছেন, কেউ সেলাই করছেন, আবার কেউ ফ্রেম তৈরির কাজে ব্যস্ত। এখান থেকে উৎপাদিত উচ্চমানের কৃত্রিম চুল বা উইগ সরাসরি রপ্তানি করা হচ্ছে জাপান ও সিঙ্গাপুরে।

এটি আর্টনেচার বাংলাদেশ লিমিটেডের কারখানা। বাংলাদেশ ও জাপান সরকারের যৌথ উদ্যোগে আড়াইহাজারে ১ হাজার একর জমিতে গড়ে ওঠা বাংলাদেশ স্পেশাল ইকোনমিক জোনে বা বিএসইজেডে যে তিনটি প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে উৎপাদন শুরু করেছে, তার মধ্যে আর্টনেচার একটি।

 

কারখানার এই কর্মযজ্ঞের পরিধি আপাতত খুব বড় না হলেও এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি বার্তা দিচ্ছে। জাপানি অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে পরিচিত বিএসইজেড এখন আর শুধু পরিকল্পনা, নথিপত্র বা ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং বাস্তব শিল্প কার্যক্রমের মাধ্যমে ধীরে ধীরে দৃশ্যমান রূপ নিচ্ছে।

 

ইতিমধ্যে দেশি-বিদেশি অন্তত ১২টি প্রতিষ্ঠান এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে জমি বরাদ্দ পেয়েছে। তাদের প্রস্তাবিত সম্মিলিত বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৩৫৩ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে তিনটি প্রতিষ্ঠান উৎপাদনে এসেছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশের আরও প্রায় ৩০টি প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগের বিষয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছে।

 

গত ৯ এপ্রিল সরেজমিনে অর্থনৈতিক অঞ্চলটিতে গিয়ে দেখা যায়, পুরোদমে চলছে উন্নয়ন কাজ। যেসব অংশে উৎপাদন শুরু হয়েছে, সেখানে উন্নতমানের অভ্যন্তরীণ রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। আর যেসব প্লটে এখনও নির্মাণকাজ শুরু হয়নি, সেগুলোতেও প্রশস্ত রাস্তা ও ড্রেনেজ সিস্টেমের কাজ শেষ হয়েছে।

 

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ বা বেজা এখন পর্যন্ত বিএসইজেডের কাছে প্রায় ২৩০ একর জমি হস্তান্তর করেছে। চলতি বছরের মধ্যে আরও ২২০ একর জমি হস্তান্তরের কথা রয়েছে। বেজার একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘ইতিমধ্যে পুরো এলাকা ভরাট করে শিল্প-কারখানা স্থাপনের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে।’

 

বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর খাতও বেশ বৈচিত্র্যপূর্ণ। হোম অ্যাপ্লায়েন্স, টেক্সটাইল কেমিক্যাল, ফাস্ট মুভিং কনজিউমারিং গুডস বা এফএমসিজি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, চুলের সরঞ্জাম ও প্যাকেজিং খাতে বিনিয়োগ আসছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, বিএসইজেড কোনো একক খাতনির্ভর শিল্পাঞ্চল না হয়ে বহুমুখী শিল্পকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠছে।

 

উৎপাদনে যেসব প্রতিষ্ঠান এগিয়ে

২০১৯ সালে তুরস্কভিত্তিক কোচ গ্রুপের হাতে অধিগ্রহণ হওয়া সিঙ্গার বাংলাদেশ লিমিটেড এখন বিনিয়োগ ও পরিধির দিক থেকে এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে এগিয়ে রয়েছে। কোম্পানিটিকে ৩৩ দশমিক ৪ একর জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তাদের প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিমাণ ৭৮ মিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ৫৬ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলার ইতিমধ্যে বিনিয়োগ করা হয়েছে। ২০২৪ সাল থেকে কার্যক্রম শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি হোম অ্যাপ্লায়েন্স খাতে কাজ করছে। বর্তমানে সিঙ্গার বাংলাদেশ এই অর্থনৈতিক অঞ্চলের সবচেয়ে বড় কার্যকর শিল্প ইউনিট।

 

জাপানভিত্তিক লায়ন কল্লোল লিমিটেড ৮ দশমিক ৪ একর জমিতে এফএমসিজি উৎপাদন শুরু করেছে। তাদের পরিকল্পিত ১৯ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের মধ্যে ৭ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলার ইতিমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে। প্রথম ধাপে তাদের পণ্যের তালিকায় রয়েছে মামা লেমন লিকুইড ডিশ ওয়াশ ও সিস্টেমা টুথব্রাশ। পর্যায়ক্রমে তারা ঘরোয়া ও ব্যক্তিগত পরিচর্যার আরও পণ্য উৎপাদনের পরিকল্পনা করছে। চলতি বছরের মার্চ থেকে কারখানাটি উৎপাদনে গেছে।

 

বর্তমানে চালু থাকা তিন প্রতিষ্ঠানের তালিকায় সর্বশেষ নাম আর্টনেচার। ৪ দশমিক ৯ একর জমিতে এই প্রতিষ্ঠানের ২০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ৯ মিলিয়ন ডলার ইতিমধ্যে বিনিয়োগ করা হয়েছে। কারখানাটিতে শুধু উৎপাদনই হচ্ছে না, সেখানে একটি গবেষণা ও উন্নয়ন বিভাগও রয়েছে। ওই বিভাগে কর্মীরা গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী পণ্যের বিশেষায়িত নকশা তৈরি করছেন। আর্টনেচার ২০২৫ সালের নভেম্বরে কার্যক্রম শুরু করেছে।

 

কারখানাটির জেনারেল ম্যানেজার মো. তানভীর রহমান বলেন, ‘আমরা এখন শতভাগ রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছি। ভবিষ্যতে আমরা কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত ফাইবার প্রক্রিয়াজাতকরণে কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছি।’

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে রেডিমেড উইগের অভ্যন্তরীণ বাজার থাকলেও আর্টনেচারের লক্ষ্য মূলত কাস্টমাইজড পণ্যের বাজার, যা স্থানীয়ভাবে এখনও ততটা সুপ্রতিষ্ঠিত নয়।

 

উৎপাদনের অপেক্ষায় নতুন বিনিয়োগ

জার্মানির রুডলফ বাংলাদেশ লিমিটেড ও জাপানের নিকা বাংলাদেশ টেক্সটাইল কেমিক্যাল খাতে বিনিয়োগ করছে। রুডলফ তাদের পরিকল্পিত ২০ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে ২ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। অন্যদিকে নিকা তাদের ৭ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে ৫ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে।

 

খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগ প্লাডিস এসিআই বাংলাদেশ লিমিটেড ৭ দশমিক ২ একর জমিতে কারখানা নির্মাণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাদের প্রস্তাবিত ২৭ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের বিপরীতে ইতিমধ্যে ৩ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছে।

 

চীনা বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও বিশেষ তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। বিএসএন বাংলাদেশ প্যাকেজিং কোম্পানি ৯ দশমিক ৩ একর জমিতে ৮০ মিলিয়ন ডলারের একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে, যা এই অঞ্চলের জন্য এককভাবে প্রস্তাবিত সর্বোচ্চ বিনিয়োগ। ইতিমধ্যে তারা ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ নিশ্চিত করেছে। এ ছাড়া লিডারস লেবেল ম্যাটেরিয়াল বাংলাদেশ তাদের পরিকল্পিত ২৫ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে ৩ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। সুইডেনের নিলোর্ন বাংলাদেশ ইউ-২ লিমিটেড ২ দশমিক ৪৭ একর জমিতে ১৫ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

 

টেক্সটাইল অ্যাকসেসরিজ উৎপাদনে নিয়োজিত জাপানের বেঙ্গল আইরিস তাকুমি তাদের ৭ মিলিয়ন ডলারের পরিকল্পনার বিপরীতে ২ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের একটি স্থানীয় প্রতিষ্ঠান ৫ একর জমিতে ২৫ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের লক্ষ্যে জমি বরাদ্দ নিয়েছে।

 

অবকাঠামো প্রস্তুতিতে অগ্রগতি, গ্যাস সংযোগে অপেক্ষা

উৎপাদনকারী বিনিয়োগকারীদের জন্য অবকাঠামোগত প্রস্তুতিই হলো চুক্তি সই ও কারখানা চালুর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য। এ দিক থেকে বিএসইজেড উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করলেও এখনও কিছু কাজ বাকি রয়েছে। বিদ্যুৎ সংযোগ ইতিমধ্যে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। নিরবচ্ছিন্ন ও গুণগত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে ২৩০ কিলোভোল্টের একটি বিশেষ সাবস্টেশন তৈরির কাজ চলছে। পানি সরবরাহ ও বর্জ্য শোধনাগার ব্যবস্থা এখন পুরোপুরি চালু রয়েছে। তবে জ্বালানিনির্ভর শিল্পগুলোর জন্য অত্যন্ত জরুরি প্রাকৃতিক গ্যাস সংযোগের বিষয়টি এখনও প্রক্রিয়াধীন।

 

বিএসইজেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক চিহারু তাগাওয়া জানান, সরকারের পক্ষ থেকে একটি গ্যাস সরবরাহ স্টেশন প্রস্তুত করা হয়েছে। ২০২৬ সালের মাঝামাঝি নাগাদ এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে গ্যাস সরবরাহ শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ‘গ্যাস সরবরাহ শুরু হলে জ্বালানিনির্ভর শিল্পগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে।’ তবে গ্যাস সংযোগ না পাওয়া পর্যন্ত বড় শিল্পগুলোর বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এটি একটি সীমাবদ্ধতা হিসেবে থেকে যাচ্ছে। বিষয়টির ওপর বিনিয়োগকারীরা তীক্ষ্ণ নজর রাখছেন।

 

নির্বাচনের পর বিনিয়োগ আগ্রহে নতুন গতি

চিহারু তাগাওয়া জানান, বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের পর বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ব্যাপকভাবে বেড়েছে। এখন ৩০টিরও বেশি কোম্পানি এখানে বিনিয়োগের বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমরা সুনির্দিষ্ট সংখ্যা বলতে পারছি না; তবে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান ও কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশের অন্তত ৩০টি প্রতিষ্ঠান বিএসইজেডে বিনিয়োগে আগ্রহী। দিন দিন এই সংখ্যা বাড়ছে।’

 

বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের মূল তালিকায় রয়েছে হোম অ্যাপ্লায়েন্স, মোটরসাইকেলের যন্ত্রাংশ, ব্যাটারি, এফএমসিজি ও ভোগ্যপণ্য। বাংলাদেশের বড় অভ্যন্তরীণ বাজার, রপ্তানি সম্ভাবনা এবং একটি নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রশাসনিক ও পরিচালনাগত সুযোগ-সুবিধাকে এই আগ্রহের মূল কারণ হিসেবে দেখছেন তাগাওয়া। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা বিডা ও বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীও একই মত পোষণ করেন। তিনি বলেন, বৃহৎ পরিসরে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি অন্য বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও ইতিবাচক প্রভাব তৈরি করে।

 

আশিক চৌধুরী আরও বলেন, ‘এ ধরনের বড় আকারের বিনিয়োগ বাজারে একটি ইতিবাচক বার্তা দেয়। ইতিমধ্যে বেশ কিছু বড় বিনিয়োগ প্রস্তাব আমাদের হাতে রয়েছে, যা এখন আলোচনার পর্যায়ে আছে। আশা করছি, এ বছর বিনিয়োগ আসার ক্ষেত্রে বড় ধরনের অগ্রগতি দেখা যাবে।’

 

সম্ভাবনার পথে বিএসইজেড

বিএসইজেড এখন পর্যন্ত প্রায় ৩ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ৬ থেকে ৭ বছরের মধ্যে পুরো ১ হাজার একর জমিতে ৯০ থেকে ১০০টি কোম্পানিকে জায়গা দেওয়া হবে। এর ফলে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ১ থেকে ২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এখন প্রায় ২৬৮ একর জমি বরাদ্দের জন্য বাকি আছে। বেজার উপসচিব মোহাম্মদ জাকারিয়া মিঠু জানান, এখন তাদের মূল লক্ষ্য হলো বিনিয়োগের এই আগ্রহকে বাস্তবে রূপান্তর করা।

বর্তমানে বিএসইজেডের বাস্তব চিত্র-চালু থাকা কারখানা, ফাঁকা প্লটগুলোর মধ্য দিয়ে নির্মিত প্রশস্ত রাস্তা এবং প্রায় প্রস্তুত গ্যাস অবকাঠামো-বলছে, এই অঞ্চলটি তার প্রাথমিক ধাপ সফলভাবে অতিক্রম করেছে। তবে এর সাফল্যের পূর্ণাঙ্গ গল্পটি এখনও লেখা বাকি। পাইপলাইনে থাকা ৩০টিরও বেশি কোম্পানি কত দ্রুত উৎপাদনে যাবে, তার ওপরই নির্ভর করছে বিএসইজেড দুই দেশের সরকারের কাঙ্ক্ষিত শিল্প মাইলফলক হয়ে উঠতে পারবে কি না।


সম্পর্কিত নিউজ