শরীর নিজের আবর্জনা নিজেই পরিষ্কার করে! ব্যায়াম কেন এই প্রক্রিয়ার চাবিকাঠি?

শরীর নিজের আবর্জনা নিজেই পরিষ্কার করে! ব্যায়াম কেন এই প্রক্রিয়ার চাবিকাঠি?
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

আমরা যখন ব্যায়াম করি, তখন আমাদের লক্ষ্য থাকে আমাদের ওজন কমানো বা পেশিবহুল শরীর গঠনের দিকে। কিন্তু শরীরের উপরিভাগের এই পরিবর্তনের আড়ালে, আমাদের প্রতিটি কোষের ভেতরে এক বিস্ময়কর পরিচ্ছন্নতা অভিযান চলতে থাকে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় অটোফ্যাগি। গ্রিক শব্দটির আক্ষরিক অর্থ নিজেকে খাওয়া হলেও, এটি কোনো ধ্বংসাত্মক প্রক্রিয়া নয়। এটি কোষের ভেতরে জমে থাকা আবর্জনা পরিষ্কার করে শরীরকে নতুন প্রাণশক্তি দেওয়ার এক অনন্য পদ্ধতি।

জাপানি বিজ্ঞানী ইয়োশিনোরি ওসুমি এই অটোফ্যাগি প্রক্রিয়ার রহস্য উন্মোচন করে ২০১৬ সালে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর থেকে এটি চিকিৎসাবিজ্ঞানে আলোচনার কেন্দ্র বিন্দুতে রয়েছে। প্রতিটি কোষের ভেতরে যখন ক্ষতিগ্রস্ত প্রোটিন বা বিকল অঙ্গাণু জমা হয়, তখন অটোফ্যাগি সেই বর্জ্যগুলোকে ভেঙে নতুন উপাদানে রূপান্তর করে। সহজ কথায়, এটি আপনার শরীরের একটি রিসাইক্লিং প্ল্যান্ট বা পুনর্ব্যবহারযোগ্য কারখানা। যদি এই প্রক্রিয়াটি স্থবির হয়ে পড়ে, তবে কোষের ভেতর বিষাক্ত বর্জ্য জমে ক্যানসার, আলঝেইমার’স বা ডায়াবেটিসের মতো জটিল রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।

​সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, এই অটোফ্যাগি প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রাকৃতিক চাবি হলো শারীরিক সক্রিয়তা বা ব্যায়াম। ব্যায়ামের সময় কোষের ভেতর যে শক্তির সংকট তৈরি হয়, তা অটোফ্যাগি শুরু করার জন্য মস্তিষ্ককে সংকেত দেয়। অর্থাৎ, ঘাম ঝরালে কেবল ক্যালরি পোড়ে না, বরং শরীরের প্রতিটি কোষকে ভেতর থেকে তরুণ ও বিষমুক্ত করে। বার্ধক্যকে জয় করতে এবং রোগমুক্ত দীর্ঘায়ু পেতে অটোফ্যাগি ও ব্যায়ামের এই অভ্যন্তরীণ রসায়ন বোঝা বর্তমান সময়ে খুবই জরুরি।

ব্যায়াম কীভাবে অটোফ্যাগি বাড়ায়?
শারীরিক পরিশ্রমের সময় আমাদের শরীরের কোষে শক্তির চাহিদা হঠাৎ করেই বেড়ে যায়। তখন কোষ ভেতরের অপ্রয়োজনীয় বা ক্ষতিগ্রস্ত অংশ সরিয়ে নতুন করে সাজানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। এই সংকেতের ফলে অটোফ্যাগি সক্রিয় হয়। বিশেষ করে মাঝারি থেকে তীব্র ব্যায়াম AMPK ও mTOR নামের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সিগন্যালিং পথকে প্রভাবিত করে থাকে। AMPK সক্রিয় হলে অটোফ্যাগি বাড়ে, আর mTOR দমে গেলে কোষ পরিচ্ছন্নতা মোডে চলে যায়। ফলে ব্যায়াম সরাসরি কোষকে পরিষ্কার ও পুনর্গঠনে উদ্দীপ্ত করে।

ব্যায়াম না করলে কী ঘটে?
যখন দীর্ঘদিন শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা থাকে। তখন কোষে ক্ষতিগ্রস্ত মাইটোকন্ড্রিয়া জমে থাকে। শরীরের শক্তি উৎপাদন কমে যায়। অক্সিডেটিভ স্ট্রেস বাড়ে এবং প্রদাহ দীর্ঘস্থায়ী হয়। এ অবস্থায় অটোফ্যাগি পর্যাপ্ত না চলায় কোষ কার্যত নিজের ভেতরে আবর্জনা জমিয়ে রাখে। সময়ের সঙ্গে এটি ডায়াবেটিস, স্নায়বিক অবক্ষয়, হৃদরোগ এবং দ্রুত বার্ধক্যের ঝুঁকি বাড়ায়।

মাইটোকন্ড্রিয়া হলো আমাদের কোষের শক্তিকেন্দ্র। এগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলে শক্তি কমতে শুরু করে, ক্লান্তি বাড়ে, এবং কোষের কার্যকারিতাও কমে যায়। অটোফ্যাগির একটি বিশেষ অংশ, মাইটোফ্যাগি, এই বিকল মাইটোকন্ড্রিয়াগুলো সরিয়ে দেয়। ব্যায়াম এই মাইটোফ্যাগিকে উল্লেখযোগ্যভাবে সক্রিয় করে।

ফলে নিয়মিত ব্যায়াম মানে কোষের শক্তিকেন্দ্রও নিয়মিত নবায়ন হওয়া।

বার্ধক্য, রোগঝুঁকি ও অটোফ্যাগি! 
বয়স বাড়ার সঙ্গে অটোফ্যাগির দক্ষতা কমে যেতে শুরু করে। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ এই প্রক্রিয়াকে দীর্ঘদিন সক্রিয় রাখতে সহায়তা করে। তাই যারা নিয়মিত ব্যায়াম করেন, তাদের কোষের বয়স অনেক সময় প্রকৃত বয়সের চেয়ে কম থাকে। এ কারণেই ব্যায়ামকে অনেক বিজ্ঞানী সেলুলার অ্যান্টি-এজিং টুল বলে থাকেন।

শুধু জিম নয় হাঁটা, দৌড়, সাইক্লিংও কার্যকর!
অটোফ্যাগি বাড়াতে যে শুধু ভারী জিমের প্রয়োজন  তা কিন্তু নয়। দ্রুত হাঁটা, সাইক্লিং, সাঁতার, দৌড় এসবই যথেষ্ট।

ব্যায়াম না করলে শরীর “নিজের কোষ খেয়ে ফেলে”, কথাটি বেশ ভয়ংকর শোনালেও এর ভেতরে আছে বেঁচে থাকার জ্ঞান। অটোফ্যাগি হলো কোষের বেঁচে থাকার এক কৌশল। কিন্তু এই কৌশল সক্রিয় রাখতে শরীরকে নড়াচড়া করানো জরুরি। শরীরকে স্থির রাখলে কোষও স্থবির হয়ে যায়। আর নড়াচড়া করলেই কোষ জেগে ওঠে, নিজেকে পরিষ্কার করে এবং নতুন করে কাজ শুরু করে। 


সম্পর্কিত নিউজ