AI কীভাবে বদলে দিচ্ছে ডিজিটাল মার্কেটিং?

AI কীভাবে বদলে দিচ্ছে ডিজিটাল মার্কেটিং?
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

এক সময় ডিজিটাল মার্কেটিং মানেই ছিল ফেসবুকে একটি পোস্ট কিংবা গুগলে কিছু কি-ওয়ার্ডের খেলা। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে সেই ধারণায় এখন এসেছে আমূল পরিবর্তন। আজকের প্রতিযোগিতামূলক বাজারে সফল হতে হলে কেবল বিজ্ঞাপনই যথেষ্ট নয়,প্রয়োজন মানুষের মনের ভাষা বুঝতে পারা এবং সঠিক সময়ে সঠিক ব্যক্তির কাছে তা পৌঁছে দেয়া। আর এই বিশাল কর্মযজ্ঞের অন্তরালের কারিগর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI। ডিজিটাল মার্কেটিং এখন আর কেবল সৃজনশীলতার বিষয় না, এটি ডেটা এবং অ্যালগরিদমের এক নিখুঁত বিজ্ঞান হয়ে উঠেছে।

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা AI-কে  ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের নতুন চালক বলছেন। এর কারণও বেশ স্পষ্ট। একজন মানুষের পক্ষে কয়েক কোটি গ্রাহকের ডেটা বিশ্লেষণ করে তাদের পছন্দ-অপছন্দ বের করা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু AI এটি করছে কয়ক সেকেন্ডের ভিতরে। চ্যাটবটের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক কাস্টমার সার্ভিস থেকে শুরু করে প্রেডিক্টিভ অ্যানালিটিক্স-এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে গ্রাহক কী কিনতে পারেন, তা আগেভাগে বলে দেওয়া, সবখানেই এখন AI-এর জয়জয়কার।

​AI যে কেবল কাজের গতি বাড়াচ্ছে তা কিন্তু নয়, এটি মার্কেটিংয়ের প্রতিটি ধাপকেও আরও ব্যক্তিগত বা কাস্টমাইজড করছে। এখন আপনি যখন কোনো ই-কমার্স সাইটে আপনার পছন্দের জিনিসের সাজেশন দেখেন, তখন বুঝে নিতে হবে পর্দার আড়ালে কোনো এক শক্তিশালী AI ইঞ্জিন আপনার আচরণ বিশ্লেষণ করছে। প্রযুক্তির এই বিপ্লব একদিকে যেমন ব্যবসার সাফল্যকে করছে  আকাশচুম্বী, অন্যদিকে আবার গ্রাহকদের দিচ্ছে একদম নতুন এক অভিজ্ঞতার আস্বাদ।

আগে, একটি বিজ্ঞাপন প্রায় সব ব্যবহারকারীর জন্য একইরকম দেখানো হতো। কিন্তু AI-এর মাধ্যমে আজ কোম্পানি নির্দিষ্ট ব্যবহারকারীর আগ্রহ, ব্রাউজিং প্যাটার্ন, ক্রয় ইতিহাস এবং সামাজিক আচরণ বিশ্লেষণ করে। এর ফলে একটি ওয়েবসাইটে দুই জন ব্যবহারকারী যদি একসাথে বসেও,তাদের প্রত্যেকের জন্য আলাদা প্রোডাক্ট সাজেশন, বিজ্ঞাপন এবং অফার দেখানো সম্ভব হয়।

এটা কেবল বিক্রয়ই বাড়ায় না, এর কারণে গ্রাহকের সাথে সংযোগও অনেক গভীর হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, কাস্টমাইজড মার্কেটিংয়ে কনভার্শন রেট সাধারণ বিজ্ঞাপনের তুলনায় ৩০-৫০℅ বেশি হয়ে থাকে।

AI চালিত চ্যাটবট এখন কাস্টমার সার্ভিসের মূল উপাদান। তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দেয়, অর্ডার ট্র্যাকিং করে, সমস্যার সমাধান নির্দেশ করে এবং ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা মসৃণ করে। এর ফলে কোম্পানি মানুষের উপর চাপ কমিয়ে দেয়, এবং ব্যবহারকারী অবিচ্ছিন্ন সেবা পায়।

AI কেবল ব্যবহারকারীর আচরণ বোঝে, বিশাল ডেটাসেট থেকে প্যাটার্ন চিনে ব্যবসার জন্য সিদ্ধান্ত তৈরি করে। যেমন, কোন সময়ে কোন প্রোডাক্ট বেশি বিক্রি হয়, কোন সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে বিজ্ঞাপন কার্যকর, কোন ধরনের কন্টেন্ট বেশি এনগেজমেন্ট তৈরি করে ইত্যাদি সব কিছু AI বিশ্লেষণ করে। এই বিশ্লেষণ মানুষের চেয়ে দ্রুত এবং কম ত্রুটিপূর্ণ হয়ে থাকে। ফলে মার্কেটিং কৌশল আরও তীক্ষ্ণ এবং ফলপ্রসূ হয়।

AI আজ কন্টেন্ট ক্রিয়েশনেও প্রবেশ করেছে। ব্লগ পোস্ট, সোশ্যাল মিডিয়া কপি, ভিডিও স্ক্রিপ্ট, গ্রাফিক্সসহ কিছু ক্ষেত্রে প্রোডাক্ট ডেসক্রিপশনও AI তৈরি করছে। বিশেষ করে NLP বা Natural Language Processing প্রযুক্তির মাধ্যমে AI স্বাভাবিক ও আকর্ষণীয় কন্টেন্ট তৈরি করতে সক্ষম।

ডিজিটাল বিজ্ঞাপন ব্যয় সাধারণত অনেক বড় খাত। AI এর সাহায্যে কোম্পানি নির্ধারণ করতে পারে, কোন বিজ্ঞাপন কত টাকায় কোথায় কার্যকর হবে। রিয়েল-টাইম বিডিং, প্রেডিক্টিভ অ্যানালিটিক্স এবং ROI বিশ্লেষণ এখন AI-এর মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে করা হচ্ছে। ফলে বাজেটের সর্বোচ্চ ব্যবহার হয় এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমে যায়।

AI-এর সঙ্গে ভয়েস সার্চ ক্রমশ জনপ্রিয় হচ্ছে। মানুষ “Hey Google” বা “Alexa” বলে পণ্য বা তথ্য খোঁজার সময় AI ব্যবহার করে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক ফলাফল দেখায়। এছাড়া Augmented Reality (AR) এবং Virtual Reality (VR) এর সঙ্গে AI যুক্ত হয়ে কাস্টমারকে ভার্চুয়াল ট্রায়াল এবং ইন্টারেক্টিভ অভিজ্ঞতা দেয়। যেমন ভার্চুয়াল পোশাক ট্রায়াল, মেকআপ, বা ঘরের আসবাব সাজানো।

AI ক্রমশ আরও শক্তিশালী হচ্ছে। মেশিন লার্নিং, ডীপ লার্নিং এবং প্রেডিক্টিভ অ্যানালিটিক্সের মাধ্যমে ডিজিটাল মার্কেটিং হবে আরও স্বয়ংক্রিয়, আরও ব্যক্তিগতকৃত এবং আরও প্রেডিক্টিভ। ছোট ব্যবসাও AI ব্যবহার করে বড় কোম্পানির সমান কৌশল নিতে পারবে। কিন্তু এটিতে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে, যেমন- ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা, ডেটা প্রাইভেসি এবং অ্যালগরিদমের পক্ষপাত দূরীকরণ। এই বিষয়গুলো ঠিক না হলে AI-ভিত্তিক মার্কেটিং ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।


সম্পর্কিত নিউজ