চীনের তিয়াংগং স্পেস স্টেশন: মহাকাশে মানুষের টিকে থাকার এক নতুন লড়াই!

চীনের তিয়াংগং স্পেস স্টেশন: মহাকাশে মানুষের টিকে থাকার এক নতুন লড়াই!
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

গবেষণার মানচিত্রে এক সময় একক আধিপত্য ছিল নাসা বা রাশিয়ার। কিন্তু চীন এখন দ্রুত বদলে দিচ্ছে সেই সমীকরণ। পৃথিবীর কক্ষপথে সগর্বে অবস্থান করা চীনের নিজস্ব মহাকাশ স্টেশন তিয়াংগং (Tiangong) বা স্বর্গীয় প্রাসাদ এখন আর কেবল একটি গবেষণাগার নয়, এটি চীনের অদম্য প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং মহাকাশ অভিযানের নতুন যুগের এক জীবন্ত বিজ্ঞাপন। যখন আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের (ISS) আয়ু ফুরিয়ে আসার আলোচনা চলছে, ঠিক তখনই তিয়াংগং হয়ে উঠছে আগামীর মহাকাশ বিজ্ঞানের নতুন কেন্দ্রবিন্দু।

সম্প্রতি তিয়াংগং স্টেশনের সাথে যুক্ত Shenzhou-20 নভোচারীদের পৃথিবীতে ফেরানোর অভিযানে বিলম্ব দেখা গেছে। তাদের ফেরার যানের কাঁচামাল,  Shenzhou-20 রিটার্ন ক্যাপসুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল সম্ভবত কক্ষপথের ছোট ধাঁধাঁ ধ্বংসাবশেষের (space debris) সঙ্গে সংঘর্ষে। এই কারণে তাদের প্রত্যাবর্তনের সময়সূচি পিছিয়ে দিতে হয়েছে এবং নিরাপত্তা যাচাই করা হয়েছে। এ অবস্থায় চীন তাদের প্রথমবারের মতো ব্যাকআপ লঞ্চ শুরু করেছে, যেখানে Shenzhou-22 বলে একটি আনক্রিওড যান দাড় করানো হয়েছে যাতে রিস্ক কম থাকে এবং নিরাপদে ফিরে আসা যায়।

এই ঘটনাটি ঐক্যবদ্ধভাবে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়-

☞ মহাকাশ অভিযানে ঝুঁকি সবসময় থাকে। যদিও পরিকল্পনা নিখুঁত, তবুও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটতে পারে।

☞ ব্যাকআপ সিস্টেমের গুরুত্ব। নিরাপত্তা পরিকল্পনায় বিকল্প পথ থাকা মানেই মানবজীবনকে রক্ষা করার শক্তিশালী উপায়।

☞ মানবিক অভিযানে ধৈর্য রাখা জরুরি। ইমার্জেন্সি পরিস্থিতিতে দ্রুত, একই সাথে সংগঠিত প্রতিক্রিয়া কৌশল অপরিহার্য।

গবেষণা ও প্রযুক্তিতে তীব্র অগ্রগতি:
২০২৫ সালে তিয়াংগং স্টেশনে প্রায় ১,১৭৯ কেজির বেশি বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম ও উপকরণ পাঠানো হয়েছে এবং ১৫০ টেরাবাইটেরও বেশি বৈজ্ঞানিক ডেটা পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছে, যা গবেষণা ও প্রযুক্তি উন্নয়নে বিশাল ভূমিকা রাখছে। এ ডেটার সঙ্গে কাজ করে বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন প্রযুক্তিগত ও বৈজ্ঞানিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করছেন।  যেমন: মাইক্রোগ্র্যাভিটি পরিস্থিতিতে উপাদানগুলো কেমন আচরণ করে এবং কীভাবে দীর্ঘ সময় মহাকাশে থাকা মানুষের শরীর ও মন কাজ করে। এই গবেষণার ফলাফল ভবিষ্যতের মানব মহাকাশ অভিযানের পরিকল্পনাকে নির্ধারণে সাহায্য করবে।

এআই সহায়তায় আধুনিক মহাকাশচালনা!
তিয়াংগং এ Wukong AI নামে একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) সিস্টেম চালু করা হয়েছে, যা নভোচারীদের কাজ, রুটিন পদ্ধতি ও যন্ত্রাংশ পরিচালনাতে সহায়তা করছে। এই AI মডেল মহাকাশ বন্দরে বিভিন্ন ধরণের তথ্য, অ্যালগরিদম ও মহাকাশ সম্পর্কিত ডেটা ব্যবহার করে দ্রুত ও নির্ভুল সমাধান দেয়। মানুষ ও মেশিন একসাথে কাজ করলে মহাকাশ গবেষণা আরও উন্নত ও নিরাপদ হতে পারে।

আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণের এক নতুন অধ্যায়!
চীন তিয়াংগং স্পেস স্টেশনে আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণের সুযোগও তৈরি করছে। পাকিস্তানসহ কিছু উন্নয়নশীল দেশের মহাকাশচারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার মাধ্যমে তাদেরকে স্টেশনে পাঠানোর পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলা হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক মহাকাশ গবেষণা সহযোগিতার নতুন দিগন্ত খুলতে পারে।

পরিকল্পনা সঠিক হলেও বিকল্প ব্যবস্থা থাকতে হবে। প্রযুক্তি ও মানবিক সহানুভূতি একত্রে কাজ করলে সম্ভাবনা বাড়ে। বৈজ্ঞানিক গবেষণা মানবজাতির ভবিষ্যতের দিকে একটি স্থির পদক্ষেপ। চীনের এই মহাকাশ অভিযান আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয়, মানব গবেষণা তখনই সফল হয়, যখন আমরা ঝুঁকি বুঝি, সমাধান করি এবং একসাথে আরও উচ্চ স্বপ্ন দেখি।


সম্পর্কিত নিউজ