কোলাজেন সাপ্লিমেন্ট কি আসলেই কাজ করে? সাম্প্রতিক গবেষণার তথ্য!

কোলাজেন সাপ্লিমেন্ট কি আসলেই কাজ করে? সাম্প্রতিক গবেষণার তথ্য!
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

ত্বক টানটান রাখতে, চুল মজবুত করতে, জয়েন্টের ব্যথা কমাতে, এখন স্বাস্থ্যবাজারের সবচেয়ে আলোচিত শব্দগুলোর একটি হলো কোলাজেন । কোলাজেন পাউডার, কোলাজেন ড্রিংক, কোলাজেন ক্যাপসুল, প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এগুলো নিয়মিত খাচ্ছেন এই বিশ্বাস নিয়ে যে, শরীরে সরাসরি কোলাজেন পৌঁছে যাবে এবং বয়সের ছাপ একেবারেই কমে যাবে। কিন্তু এখানে একটি মৌলিক সত্য ব্যাপার রয়েছে, যা অধিকাংশ মানুষই জানেন না।

আপনি যে কোলাজেন খাচ্ছেন, সেটি শরীরে কোলাজেন হিসেবে পৌঁছায় না। শুনতে অবাক লাগলেও এটাই বাস্তব। বিষয়টি বোঝার জন্য আগে জানতে হবে, কোলাজেন আসলে কী এবং শরীরে এটি কীভাবে তৈরি হয় সে বিষয়ে।

কোলাজেন কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ?
কোলাজেন হলো শরীরের সবচেয়ে বেশি পরিমাণে থাকা একটি প্রোটিন। ত্বক, হাড়, পেশি, টেন্ডন, লিগামেন্ট, কার্টিলেজ সবকিছুর কাঠামোগত শক্তির পেছনে কোলাজেন কাজ করে। ত্বক টানটান থাকা, জয়েন্ট নমনীয় থাকা, চুল–নখ শক্ত থাকা, এসবের সঙ্গে কোলাজেনের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের শরীরের নিজস্ব কোলাজেন উৎপাদন কমতে শুরু করে। এ কারণেই আমাদের ত্বক ঢিলে হয়ে যায়, বলিরেখা পড়তে শুরু করে আর জয়েন্টও শক্ত হয়ে যায়।


কোলাজেন খেলে শরীরে কী হয়?
কোলাজেন হলো একটি বড় প্রোটিন অণু। যখন কেউ কোলাজেন পাউডার বা ক্যাপসুল খায়, তখন হজম প্রক্রিয়ায় এটি ভেঙে, ছোট ছোট অ্যামিনো অ্যাসিডে রুপান্তরিত হয়। অর্থাৎ, কোলাজেন আর কোলাজেন থাকে না।প্রোটিনের মৌলিক উপাদানে ভেঙে যায় ।

এই অ্যামিনো অ্যাসিড শরীর বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করে। কখনো পেশি গঠনে, কখনো এনজাইম তৈরিতে, কখনো শক্তি উৎপাদনে। শরীর তার চাহিদা অনুসারে, সিদ্ধান্ত নেয় কোথায় কী লাগবে। অর্থাৎ, আপনি যে কোলাজেন খেলেন, শরীর সেটিকে সরাসরি ত্বক বা জয়েন্টের কোলাজেন হিসেবে কাজ শুরু করে দেয়না।

তাহলে কোলাজেন খাওয়া কি পুরোপুরি অর্থহীন?
না, একেবারে অর্থহীন নয়। কিন্তু যেভাবে মানুষ ভাবে, সেভাবে এটি কাজ করে না। কোলাজেন সাপ্লিমেন্ট খেলে শরীর কিছু নির্দিষ্ট অ্যামিনো অ্যাসিড পায়। যেমন- গ্লাইসিন, প্রোলিন, হাইড্রোক্সিপ্রোলিন ইত্যাদি, যা কোলাজেন তৈরির কাঁচামাল। যদি শরীরে এগুলোর ঘাটতি থাকে, তাহলে এগুলো সাহায্য করতে পারে। কিন্তু শুধু এই কাঁচামাল থাকলেই কোলাজেন তৈরি হয় না। দরকার আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

কোলাজেন তৈরির জন্য কোন উপাদানগুলো অপরিহার্য?
সঠিক পরিবেশ পেলে শরীর নিজে কোলাজেন তৈরি করতে পারে। সেই পরিবেশের প্রধান শর্তগুলো হলো ভিটামিন সি, জিঙ্ক, কপার, পর্যাপ্ত প্রোটিন, সঠিক ঘুম, কম অক্সিডেটিভ স্ট্রেস ইত্যাদি। ভিটামিন সি ছাড়া শরীর কোলাজেন তৈরি করতে পারে না। আর এ কারণেই ভিটামিন সি ঘাটতিতে ত্বক ও মাড়ির সমস্যা হয়। অর্থাৎ, কোলাজেন খাওয়ার চেয়ে শরীরকে কোলাজেন তৈরির উপযোগী করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বাজারের প্রচারণা এবং শারীরবৃত্তীয় বাস্তবতা-
বাজারে কোলাজেনকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যেন এটি সরাসরি ত্বকে গিয়ে বলিরেখা মুছে দেবে। বাস্তবে এটি একটি প্রোটিন উৎস, যার ভূমিকা পরোক্ষ।

খাবার থেকেই কি কোলাজেনের কাঁচামাল পাওয়া সম্ভব?
হ্যাঁ, এবং খুব সহজেই। ডিম, মাছ, মাংস, ডাল, বাদাম, শাকসবজি, লেবুজাতীয় ফল ইত্যাদি খাবারে থাকে অ্যামিনো অ্যাসিড ও ভিটামিন, যা শরীরকে নিজেই কোলাজেন তৈরি করতে সাহায্য করে। বিশেষ করে ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার।যেমন- আমলকি, কমলা, পেয়ারা, লেবু কোলাজেন তৈরির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কোন অভ্যাস কোলাজেন নষ্ট করে?
অনেকে কোলাজেন খাচ্ছেন, কিন্তু একই সঙ্গে এমন কাজ করছেন যা কোলাজেন দ্রুত নষ্ট করে।যেমন: অতিরিক্ত রোদে থাকা, ধূমপান, অতিরিক্ত চিনি খাওয়া, কম ঘুম, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ ইত্যাদি কারণে শরীরে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস বাড়ে, যা কোলাজেন ভেঙে দেয় এবং কোলাজেন তৈরির প্রক্রিয়া ঠিকমতো কাজ করে না।

ত্বকের যত্নে বাইরের কোলাজেন কাজ করে কি?
কোলাজেনযুক্ত ক্রিম ত্বকের গভীরে কোলাজেন পৌঁছে দিতে পারে না, কারণ কোলাজেন অণু খুব বড়। তবে এগুলো ত্বক আর্দ্র রাখতে সাহায্য করতে পারে।


তাহলে করণীয় কী
যদি সত্যিই ত্বক, জয়েন্ট ও চুল ভালো রাখতে চান, তাহলে লক্ষ্য হওয়া উচিত -

☞ শরীরের নিজস্ব কোলাজেন উৎপাদন বাড়ানো। এবং  সেজন্য প্রয়োজন পুষ্টিকর খাবার, ভিটামিন সি, পর্যাপ্ত প্রোটিন, ভালো ঘুম, রোদ থেকে সুরক্ষা এবং মানসিক চাপ কমানো।

কোলাজেন সাপ্লিমেন্ট খাওয়া সম্পূর্ণ ভুল নয়, কিন্তু এটি সমস্যার একদম সরাসরি সমাধানও নয়। কোলাজেন শরীরে সরাসরি যায় না, ভেঙে গিয়ে কাঁচামালে পরিণত হয়। সেই কাঁচামাল দিয়ে কোলাজেন তৈরি করবে কি না, তা নির্ভর করে আপনার জীবনযাপন, পুষ্টি ও শরীরের পরিবেশের ওপর।


সম্পর্কিত নিউজ