ভিড়ের মাঝেও নিজেকে একা লাগছে? বদলে ফেলুন এই অভ্যাসগুলো

ভিড়ের মাঝেও নিজেকে একা লাগছে? বদলে ফেলুন এই অভ্যাসগুলো
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

মানুষের ভিড়ে ঠাসা রাজপথ কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের হাজারো ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট! এসবের বাইরে থেকে জীবনটা রঙিন মনে হলেও মনের গভীরে অনেক সময় এক অদ্ভুত শূন্যতা কাজ করে। এই অনুভূতিই হলো একাকিত্ব। মনোবিজ্ঞানীরা একে একটি অদৃশ্য ড্রাগন হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা বাইরে থেকে দেখা যায় না, কিন্তু ভেতরের আনন্দ আর প্রাণশক্তিকে ধীরে ধীরে গ্রাস করে ফেলে। বর্তমান সময়ে একাকিত্ব কেবল একটি সাময়িক আবেগ নয়, এটি একটি বৈশ্বিক মানসিক স্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে।

একাকিত্ব আমাদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। বিজ্ঞান বলছে, দীর্ঘস্থায়ী একাকিত্বের প্রভাব শরীরের ওপর ধূমপানের চেয়েও ক্ষতিকর হতে পারে। যখন আমরা একাকী বোধ করি, তখন আমাদের শরীরে স্ট্রেস হরমোন কর্টিসলের মাত্রা বেড়ে যায়। আর দীর্ঘ সময় একাকিত্বের অনুভুতি ডিপ্রেশন, উদ্বেগ, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, এবং ইমিউন সিস্টেমের দুর্বলতা পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে।

প্রভাব:
⇨ মানসিক প্রভাব: একাকিত্ব নিজেকে অমূল্য মনে করানো, হীনমন্যতা, চিন্তা বা উদ্বেগ বাড়াতে পারে।

⇨ শারীরিক প্রভাব: একাকিত্বের কারণে স্ট্রেস হরমোন কর্টিসল বেশি নিঃসৃত হয়, যা ঘুম, হজম ও হৃদযন্ত্রকে প্রভাবিত করে।

⇨ সৃজনশীল প্রভাব: যদিও একাকিত্ব নেতিবাচক মনে হতে পারে, কিন্তু এর রয়েছে কিছু ইতিবাচক দিকও। কিছু মানুষ এটিকে সৃজনশীলতার চাবিকাঠি হিসেবে ব্যবহার করে। যেমন- লেখা, চিত্রকলা বা নতুন প্রকল্প।

কেন জন্মায়?
একাকিত্ব মূলত তিনটি কারণে জন্মায়:

⇨ সামাজিক বিচ্ছিন্নতা: পরিবার, বন্ধু বা সম্প্রদায়ের সাথে কম সংযোগ থাকলে।

⇨ নিজের সঙ্গে সংযোগের অভাব: কখনও কখনও আমরা নিজেকে বোঝার জন্য পর্যাপ্ত সময় দিই না, ফলে একাকিত্ব অনুভব হয়।

⇨ পরিবর্তন বা স্থানান্তর: নতুন শহর, নতুন কাজ, বা সম্পর্কের পরিবর্তন মানুষকে একাকী মনে করায়।

একাকিত্ব মোকাবেলার কৌশল:
১. নিজের অনুভূতিকে স্বীকৃতি দিন। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, একাকিত্বকে চাপ বা অপরাধবোধের সঙ্গে মেলানো ভুল। প্রথমেই এটি স্বাভাবিক মানবিক অনুভূতি হিসেবে গ্রহণ করুন। দৈনন্দিন জার্নালে আপনার অনুভূতি লিখলে মন শান্ত হয় এবং সমস্যার উৎস চিনতে সাহায্য করে।

২. সামাজিক সংযোগ বৃদ্ধি করুন। একাকিত্ব কমানোর সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হল সক্রিয় সংযোগ তৈরি। যেমন:

⇨ পরিবার, বন্ধু বা সহকর্মীর সঙ্গে ফোন বা ভিডিও কল করুন।

⇨ কমিউনিটি বা হবি ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত হোন।

⇨ স্বেচ্ছাসেবী বা চ্যারিটি প্রজেক্টে অংশ নিন। অন্যকে সাহায্য করা একাকিত্ব কমাতে প্রমাণিত কার্যকর। গবেষণা দেখায়, সামাজিক সংযোগ বৃদ্ধি করলে মস্তিষ্কে ডোপামিন এবং অক্সিটোসিন হরমোনের নিঃসরণ বাড়ে, যা সুখ ও শান্তি বয়ে আনতে সাহায্য করে।

৩. নিজেকে ব্যস্ত রাখুন। একাকিত্ব তাড়ানোর আরেকটি বৈজ্ঞানিকভাবে সমর্থিত কৌশল হল মনকে সক্রিয় রাখা।যেমন:

⇨ সৃজনশীলতার বিকাশ করা। লেখা, ছবি আঁকা বা হস্তশিল্প।

⇨ শারীরিক ব্যায়াম করা।যোগা, হাঁটা, জিম। কারণ, শারীরিক সক্রিয়তা কর্টিসল হ্রাস করে এবং সেরোটোনিন বৃদ্ধি করে।

⇨ মাইন্ডফুলনেস বা ধ্যান করা। নিয়মিত ধ্যান একাকিত্বজনিত চিন্তা কমায় এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে।

৪. নেতিবাচক চিন্তাকে চ্যালেঞ্জ করুন। একাকিত্ব প্রায়ই নেতিবাচক চিন্তার জন্ম দেয়। সেগুলোকে লিখে রাখুন। যেমন ধরুন,আপনি অনুভব করছেন, আপনি একা! এটাই লিকজে রাখুন। আর এর বিপরীতভাবে আবার  লিখুন- "আমি নতুন সংযোগ তৈরি করতে পারি" বা  "আমার মূল্য আছে এবং মানুষ আমাকে পছন্দ করে।”
গবেষণায় দেখা গেছে, এই কগনিটিভ রিফ্রেমিং মস্তিষ্ককে নেতিবাচক চক্র থেকে বের করে

ইতিবাচক আচরণের দিমে উৎসাহিত করে।

৫. প্রয়োজনে পেশাদারের সহায়তা নিন। গভীর একাকিত্ব বা ডিপ্রেশন থাকলে সাইকোলজিস্ট বা থেরাপিস্টের সাহায্য নিন। কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি (CBT) এবং কাউন্সেলিং প্রমাণিতভাবে একাকিত্ব হ্রাস  করে।

৬. ছোট ছোট জয়গুলোকে উদযাপন করুন।একাকিত্বের ড্রাগনকে ছোট ছোট পদক্ষেপে জয় করা যায়। যেমন- দিনের মধ্যে একটি নতুন সংযোগ তৈরি করা, প্রতিদিন নিজের জন্য ২০-৩০ মিনিট সৃজনশীল সময় রাখা, প্রতিটি ছোট জয় মস্তিষ্কে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া বাড়ায় এবং দীর্ঘমেয়াদে একাকিত্ব কমায়।

বিশেষ পরামর্শ:
☞ প্রাকৃতিক পরিবেশে সময় কাটান। উদ্যান বা পার্কে ঘোরাঘুরি একাকিত্ব হ্রাসে বৈজ্ঞানিকভাবে কার্যকর। হালকা সূর্যালোক ভিটামিন ডি সরবরাহ করে এবং মানসিক চাপ হ্রাস করে।

☞ পোষা প্রাণীর সঙ্গ। গবেষণা দেখায়, কুকুর বা বিড়ালের মতো পোষা প্রাণীর সঙ্গ একাকিত্ব কমাতে এবং হৃদস্পন্দন স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে।

☞ মাইন্ডফুল ইন্ট্রাকশন করুন। অন্যদের সঙ্গে আন্তরিক ও গভীর আলাপ একাকিত্ব হ্রাস করে। শুধু সামাজিক উপস্থিতি নয়, গুণগত মানের সংযোগ বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

একাকিত্বের ড্রাগনকে সরাসরি মারা যায় না, কিন্তু স্বীকৃতি, সক্রিয় সংযোগ, সৃজনশীলতা, শারীরিক ও মানসিক ব্যায়াম, নেতিবাচক চিন্তার চ্যালেঞ্জ, এবং প্রয়োজন হলে পেশাদার সাহায্য ইত্যাদি  কৌশল একত্রে এটিকে মোকাবেলা করতে সাহায্য করে। যে কেউ ধৈর্য এবং নিয়মিত অভ্যাস রাখে, সে একাকিত্বকে এক প্রকার মানসিক শক্তিতে রূপান্তরিত করতে পারে। 


সম্পর্কিত নিউজ