{{ news.section.title }}
অকালে চুল পাকার কারণ ও প্রতিকার: সাদা চুল কি আবার কালো করা সম্ভব?
- Author,
- Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
-
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হুট করে একটি রুপালি চুলের ঝিলিক দেখে চমকে ওঠেননি এমন মানুষ আধুনিক জীবনের জন্য বিরল। এক সময় চুল পাকা ছিল বার্ধক্যের লক্ষণ, কিন্তু আজ বিশ বা ত্রিশের কোঠায় পা দেওয়া তরুণ-তরুণীদের মধ্যেও এই প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে তো বাড়ছেই। চুল আমাদের ব্যক্তিত্বের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, তাই অকালে এই শুভ্রতা সৌন্দর্যে ভাটা ফেলে না, বরং অনেকের মধ্যে তৈরি করে প্রবল মানসিক চাপ ও আত্মবিশ্বাসহীনতা
বিজ্ঞানীদের মতে, আমাদের চুলের গোড়ায় থাকা মেলানোসাইট কোষ যখন পর্যাপ্ত মেলানিন রঞ্জক পদার্থ তৈরি করতে পারে না,ঠিক তখনই চুল তার স্বাভাবিক রঙ হারিয়ে ধূসর বা সাদা হয়ে যায়। কিন্তু কেন সময়ের আগেই এই কোষগুলো ক্লান্ত হয়ে পড়ছে?
গবেষকরা বলছেন, এর পেছনে কেবল বংশগতি বা জিন দায়ী নয়। বরং আধুনিক জীবনের মাত্রাতিরিক্ত মানসিক চাপ , বায়ুদূষণ এবং খাদ্যাভ্যাসে ভিটামিন B12, তামা ও আয়রনের তীব্র অভাব এই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করছে। চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, অকালে চুল পাকা শরীরের ভেতরকার পুষ্টিহীনতা বা জীবনযাত্রার অসামঞ্জস্যের একটি সতর্কবার্তা। সঠিক সময়ে খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন, স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট এবং প্রাকৃতিক যত্নের মাধ্যমে এই অকালপক্কতার গতি অনেকটাই ধীর করে আনা সম্ভব।
চুলের স্বাভাবিক রঙ ও মেলানিন:
আমাদের চুলের মূল রঙ নির্ধারণ করে মেলানিন নামক পিগমেন্ট, যা চুলের রূপ, স্বাভাবিক রঙ এবং সূক্ষ্মতা ঠিক রাখে। মেলানিনের দুটি প্রধান ধরন রয়েছে:
১। ইউমেলানিন (Eumelanin): কালো ও বাদামী রঙের জন্য।
২। ফিয়োমেলানিন (Pheomelanin): লাল ও হলুদ টোনের জন্য।
চুল যখন ধীরে ধীরে ধূসর বা সাদা হতে শুরু করে, তখন এটি মেলানিনের উৎপাদন হ্রাসের ফল। মেলানিন উৎপাদনের এই কমতি জিনগত, পরিবেশগত এবং জীবনধারাগত কারণগুলোতে ভিত্তি করে।
কম বয়সে চুল পেকে যাওয়ার কারণ?
১. জেনেটিক প্রভাব: বংশগত উপাদান চুল পেকে যাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে। যদি পরিবারের বড় সদস্যরা কম বয়সে ধূসর চুলে ভরা থাকেন, আপনি ও সেই সম্ভাবনার শিকার হবেন। এটি এন্ডোজেনাস জিন এবং মেলানিন সেলগুলোর কার্যকারিতার সঙ্গে যুক্ত, যা প্রাকৃতিকভাবে সময়ের আগে কম হতে পারে।
২. অক্সিডেটিভ স্ট্রেস: আমাদের দেহে সবসময় কিছু পরিমাণ ফ্রি র্যাডিক্যালস তৈরি হয়। এগুলো মূলত প্রাকৃতিক বিপাক বা পরিবেশের কারণে উৎপন্ন হয়। কিন্তু অতিরিক্ত স্ট্রেস, দূষণ, UV রশ্মি, বা অনিয়মিত জীবনধারা ফ্রি র্যাডিক্যালের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।
চুলের রঙের জন্য দায়ী মেলানোসাইট কোষগুলো এই স্ট্রেসে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে, মেলানিন উৎপাদন কমে যায় এবং চুল ধীরে ধীরে ফিকে হতে শুরু করে।
৩. পুষ্টিহীনতা : চুলের স্বাভাবিক রঙ এবং স্বাস্থ্য ধরে রাখার জন্য কিছু পুষ্টি অত্যন্ত জরুরি।যেমন:
☞ ভিটামিন B12: এর অভাবে প্রাথমিকভাবে চুল ধূসর হতে পারে।
☞ আয়রন: রক্তে লৌহের অভাব চুলকে পুষ্টি দিতে ব্যর্থ হয়।
☞ জিঙ্ক ও তামা: চুলের কালি এবং স্বাস্থ্য ধরে রাখতে সহায়তা করে।
☞ প্রোটিন ও এমিনো অ্যাসিড: চুলের মূল গঠন প্রোটিনের ওপর নির্ভরশীল।পুষ্টিহীনতা শুধু চুল ফিকে করার জন্য নয়, চুলের ভঙ্গুরতা, রূপ পরিবর্তন এবং অকাল ছেঁড়া বা পাতলা চুলের জন্যও দায়ী।
৪. হরমোনাল পরিবর্তন: থাইরয়েডের সমস্যার সঙ্গে কম বয়সে চুল পেকে যাওয়ার একটি শক্তিশালী সম্পর্ক আছে। হাইপোথাইরয়েড বা হাইপারথাইরয়েড চুলের রঙ ও ঘনত্ব পরিবর্তন করতে পারে। অ্যান্ড্রোজেন হরমোন অনিয়মিত হলে চুলের ফোলিকল ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
৫. জীবনধারা ও অভ্যাস: ধূমপান ফ্রি র্যাডিক্যাল তৈরি করে, যা মেলানিনের ক্ষয় বাড়ায়। অ্যালকোহল ও অপর্যাপ্ত ঘুম চুলের স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করে। অতিরিক্ত মানসিক চাপ: কর্টিসল হরমোন বেশি নিঃসৃত হলে চুলের রঙ হ্রাস পায়।
নিয়ন্ত্রণ:
যদিও জেনেটিক কারণ সম্পূর্ণরূপে নিয়ন্ত্রণের বাইরে,কিন্তু অন্যান্য কারণগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে চুলের রঙ ধরে রাখা সম্ভব।
১. সুষম পুষ্টি: ডায়েটে যোগ করুন:সবুজ শাক, বীজ, বাদাম, ডিম, মাছ, দুধ ও দই। ভিটামিন B12, আয়রন, জিঙ্ক ও তামার পর্যাপ্ত যোগান। চিকিৎসকের পরামর্শে কম ভিটামিন থাকলে B12 বা জিঙ্ক সাপ্লিমেন্ট নেওয়া যেতে পারে।
২. স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট: ধ্যান ও যোগা, মনকে শান্ত করে এবং কর্টিসল হরমোন নিয়ন্ত্রণে রাখে। সৃজনশীল কাজ মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। পর্যাপ্ত ঘুম, রাতের ৭-৮ ঘণ্টা ঘুম চুলের স্বাস্থ্য ধরে রাখে।
৩. প্রাকৃতিক হেয়ার কেয়ার: নারকেল তেল, আয়ুর্বেদিক তেল বা আমলকি তেল চুলের পুষ্টি বৃদ্ধি করে। সপ্তাহে ১–২ বার হালকা প্রাকৃতিক রঙ যেমন হেনা বা ক্যাসিয়া ব্যবহার করলে চুলের প্রাকৃতিক রঙ জীবন্ত থাকে।
৪. ধূমপান ও পরিবেশের নিয়ন্ত্রণ: ধূমপান বন্ধ করলে ফ্রি র্যাডিক্যালসের ক্ষয় কমে। আবার সরাসরি সূর্য আলোর সময় হ্যাট বা স্কার্ফ ব্যবহার করা উচিত
৫. মেডিকেল চেকআপ: হঠাৎ কম বয়সে চুল ফিকে হলে থাইরয়েড ও হরমোন পরীক্ষা করানো উচিত। প্রয়োজন হলে কগনিটিভ সাপোর্ট ও ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে নিন।
চুল পেকে যাওয়া ধীর করার কৌশল:
⇨ প্রাকৃতিক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট: বেরি, গ্রিন টি, বাদাম ও সবুজ শাক ফ্রি র্যাডিক্যালস কমায়।
⇨ হালকা ব্যায়াম ও হাঁটা: রক্ত সঞ্চালন বাড়ায়, শিকড়ে পুষ্টি পৌঁছায়।
⇨ হেয়ার ম্যাসাজ: নারকেল বা আয়ুর্বেদিক তেল দিয়ে স্ক্যাল্প ম্যাসাজ মেলানোসাইটকে সক্রিয় রাখে।
⇨ মানসিক প্রশান্তি: ধ্যান, প্রকৃতির মাঝে সময় কাটানো, হবি বা সামাজিক কাজ মানসিক চাপ হ্রাস করে, যা চুলের রঙ ধরে রাখে।
চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, অকালে চুল পাকালেই জীবন থেকে তারুণ্য হারিয়ে যায় না। এটি শরীরের ভেতরকার পুষ্টিহীনতা বা জীবনযাত্রার অসামঞ্জস্যের একটি সতর্কবার্তা।