{{ news.section.title }}
জঙ্গলের ফলে আম-কলার স্বাদ! পওপও এর পুষ্টিগুণ ও রহস্য
- Author,
- Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
-
আম, কাঁঠাল বা কলার কথা উঠলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে রৌদ্রোজ্জ্বল কোনো উষ্ণমণ্ডলীয় দেশের ছবি। কিন্তু হিমশীতল উত্তর আমেরিকার ঘন অরণ্যে জন্মায় এমনই এক ফল, যা স্বাদে-গন্ধে অবিকল কোনো ট্রপিক্যাল ফলের মতোই। ফলটির নাম পওপও (Pawpaw)।শুনতে অদ্ভুত লাগলেও সত্য, এই ফলেটির মধ্যেই মিশে আছে আমের সুগন্ধ, কলার মোলায়েম টেক্সচার আর কাস্টার্ডের মতো এক রাজকীয় মিষ্টতা। বিজ্ঞানের ভাষায় যার নাম Asimina triloba।
পওপওকে প্রথমবার যারা খান, তারা প্রায় সবাই বিস্মিত হন। ফলটির ভেতরে হলুদাভ, নরম, কাস্টার্ডের মতো শাঁস। মুখে দিলে মোলায়েম মিষ্টি, গন্ধে মনে হয় যেন আম, আর স্বাদে কলার ছোঁয়া, আবার কোথাও কোথাও ভ্যানিলার মতো মৃদু সুবাসও। অথচ গাছটি জন্মায় এমন অঞ্চলে, যেখানে শীত পড়ে, বরফ পড়ে, আর ট্রপিক্যাল ফলের বেড়ে ওঠা কল্পনাও করা যায় না।
পওপও কোনো বাগানের উদ্ভাবন নয়। এটি বহু আগে থেকেই আমেরিকার পূর্বাঞ্চলের বনভূমিতে স্বাভাবিকভাবেই জন্মায়। নদীর তীর, ছায়াময় বন, আর্দ্র মাটি এসব জায়গা এর প্রিয় আবাস। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে স্থানীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রধান খাদ্যের উৎস ছিল এই পওপও। পরে ইউরোপীয় বসতিস্থাপনকারীরাও এটি চিনেছেন এবং খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করেছেন। এমনকি আমেরিকার প্রতিষ্ঠাতা জনকরাও এই ফলের বেশ ভক্ত ছিলেন। ঐতিহাসিক বর্ণনায় পাওয়া যায়, দীর্ঘ ভ্রমণে বনের ভেতর পওপও ফল ছিল সহজ শক্তির একটি অসাধারণ উৎস। কারণ এটি পুষ্টিকর, মিষ্টি এবং সহজপাচ্যও।
ফলের গঠন ও বৈশিষ্ট্য:
পওপও দেখতে কিছুটা লম্বাটে রকমের, কাঁচা অবস্থায় সবুজ, পাকা হলে হয়ে যায় হলদেটে। ভেতরে বড় বড় কালো বীজ থাকে, চারপাশে থাকে নরম শাঁস। এই শাঁস এতটাই নরম যে ছুরি না ব্যবহার করেও হাতে ভেঙেও খাওয়া যায়। তবে এর একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো এটি খুব দ্রুত পাকে এবং দ্রুতই আবার নষ্ট হয়ে যায়। পাকার পর কয়েক দিনের বেশি ভালো থাকে না। এই স্বল্প সংরক্ষণক্ষমতাই পওপওকে বাজারে তেমন জনপ্রিয় হতে দেয়নি।
কেন সুপারমার্কেটে দেখা যায় না?
পওপওর সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা এর সংরক্ষণ ও পরিবহন সমস্যা। পাকা ফল অত্যন্ত নরম, সহজে চাপ লেগে নষ্ট হয়। ফ্রিজেও বেশিদিন ভালো থাকে না। একারণে দূরদূরান্তে পাঠানোও বেশ কঠিন। তাই পওপও শুধুমাত্র স্থানীয়ভাবে খাওয়া হয় অর্থাৎ যেখানে গাছ আছে, সেখানেই ফল খাওয়া হয়। বড় বাণিজ্যিক চাষ বা রপ্তানির সুযোগ এই ফলের ক্ষেত্রে সীমিত।
পওপও পুষ্টিগুমে বেশ সমৃদ্ধ একটি ফল । এতে উপস্থিত রয়েছে ভিটামিন সি, ম্যাগনেসিয়াম, পটাশিয়াম, কিছু পরিমাণ আয়রন এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান। শাঁস নরম হওয়ায় এটি সহজে হজম হয়। শক্তির উৎস হিসেবেও এটি অনেক কার্যকর।
অনেকেই পওপও দিয়ে স্মুদি, আইসক্রিম, পুডিং বা বেকড খাবার তৈরি করেন, কারণ এর কাস্টার্ডের মতো টেক্সচার রান্নায় সহজে মিশে যায়।
গাছের অভিযোজন ক্ষমতা:
পওপও গাছ মাঝারি উচ্চতার, ছায়া সহনশীল এবং ঠান্ডা আবহাওয়ায় টিকে থাকতে সক্ষম। বসন্তে এর গাঢ় বেগুনি ফুল ফোটে, এটি দেখতে যেমন অদ্ভুত, তেমনি আকর্ষণীয়। ফল ধরতে সময় নেয়, কিন্তু একবার স্থির হলে বছরের পর বছর ফল দেয়।
এই গাছ কীটনাশক ছাড়াই সহজে টিকে থাকতে পারে। প্রাকৃতিক পরিবেশে এটি নিজেই মানিয়ে নেয়।
পওপওর উত্তর আমেরিকার একমাত্র দেশি ফল, যার স্বাদ সম্পূর্ণ ট্রপিক্যাল। সাধারণত যে স্বাদের ফল আমরা উষ্ণ অঞ্চলে পাই, সেই স্বাদ এখানে শীতপ্রধান অঞ্চলে পাওয়া যায়। এই কারণে অনেকেই পওপওকে বলেন“উত্তর আমেরিকার গোপন ট্রপিক্যাল ফল” বলে থাকেন।
বাজারের আলো ঝলমলে ফলের ভিড়ে পওপও থাকেনা। কিন্তু বনের ছায়ায়, স্থানীয় মানুষের স্মৃতিতে, আর প্রকৃতিপ্রেমীদের আগ্রহে এটি আজও বেঁচে আছে, তবে ফল হিসেবে নয়, বরং একটি ভূখণ্ডের স্বাদ ও সংস্কৃতির অংশ হয়ে।