{{ news.section.title }}
লেজি আই ধরা পড়ার সেরা সময় এখনই, আট বছরের আগেই চিকিৎসা জরুরি
- Author,
- Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
-
বাইরে থেকে দেখতে একদম সুস্থ, নেই কোনো লালচে ভাব বা প্রদাহ। তবুও আপনার আদরের শিশুটি কি খুব কাছ থেকে টিভি দেখছে কিংবা দূরের লেখা পড়তে গিয়ে এক চোখ কুঁচকে তাকাচ্ছে? অনেক সময় আমরা একে স্রেফ দুষ্টুমি বা সাধারণ চশমার সমস্যা ভেবে ভুল করি। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, এটি হতে পারে অ্যাম্বলিওপিয়া (Amblyopia) বা অলস চোখের লক্ষণ।
আমরা যা দেখি, তার একটি বড় অংশই আসলে মস্তিষ্কের কাজ। আমাদের চোখ শুধু ছবি পাঠায় আর মস্তিষ্ক তা ব্যাখ্যা করে। শিশুর জীবনের প্রথম কয়েক বছর, বিশেষ করে জন্ম থেকে ৭–৮ বছর পর্যন্ত মস্তিষ্ক শেখে কীভাবে দুই চোখের তথ্য মিলিয়ে পরিষ্কার ছবি বানাতে হয়। যদি কোনো কারণে একটি চোখ থেকে আসা ছবি বারবার ঝাপসা, অস্পষ্ট বা দ্বৈত হয়, মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে সেই চোখের তথ্য উপেক্ষা করতে শুরু করে দেয়। এভাবেই সেই চোখ কার্যত অলস হয়ে পড়ে, যাকেই বলা হয় অ্যাম্বলিওপিয়া বা লেজি আই।
কোন কারণে হয় অ্যাম্বলিওপিয়া?
অ্যাম্বলিওপিয়ার পেছনে সাধারণত তিন ধরনের কারণ দেখা যায়।
১. চোখ বাঁকা হওয়া (স্ট্রাবিজমাস): এক চোখ সোজা, অন্যটি ভেতরে বা বাইরে সরে থাকে। দুই চোখের ছবি মিলে না, তাই মস্তিষ্ক একটি চোখের ছবি বাদ দিতে শেখে।
২. দৃষ্টিশক্তির অসমতা (রিফ্র্যাকটিভ এরর): এক চোখে বেশি পাওয়ার, অন্য চোখে কম। ফলে একটি চোখ সবসময় ঝাপসা দেখে এবং মস্তিষ্ক সেটিকে গুরুত্ব দেয় না।
৩. চোখে বাধা (ডিপ্রাইভেশন): জন্মগত ছানি, কর্নিয়ার সমস্যা বা পাতা ঝুলে থাকা, যে কারণে চোখে স্পষ্ট ছবি ঢুকতে পারে না। এই তিন অবস্থার যেকোনো একটি থাকলে অ্যাম্বলিওপিয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
লক্ষণে:
অ্যাম্বলিওপিয়া ধরা কঠিন, কারণ শিশুরা বুঝতেই পারে না যে তারা ঠিকমতো দেখতে পাচ্ছে না। তবু কিছু আচরণ সতর্ক সংকেত হতে পারে।যেমন:
⇨ খুব কাছে গিয়ে টিভি দেখা।
⇨ বই পড়ার সময় মাথা কাত করা।
⇨ একটি চোখ কুঁচকে দেখা।
⇨ বল ধরতে বা দূরত্ব মাপতে সমস্যা।
⇨ পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যাওয়া।
⇨ চোখ বাঁকা দেখা যাওয়া।
অনেক সময় নিয়মিত চোখ পরীক্ষা না করলে বিষয়টি ধরা পড়ে না।
কেন শিশু বয়সেই ধরা সবচেয়ে জরুরি?
নেত্ররোগ বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, অ্যাম্বলিওপিয়া কোনো দৃশ্যমান রোগ নয়। এটি দৃষ্টি বিকাশের একটি ত্রুটি। যেহেতু শিশু নিজে থেকে তার দৃষ্টির এই পার্থক্যটা বুঝতে পারে না, তাই অভিভাবকদের সচেতনতাই এখানে একমাত্র রক্ষাকবচ। আট-নয় বছর পার হওয়ার আগেই যদি এই লেজি আই শনাক্ত করা যায়, তবে সামান্য কিছু থেরাপি বা প্যাচিংয়ের মাধ্যমেই শিশুর দৃষ্টি ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব। তাই শৈশবে শনাক্তকরণই এখানের সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
চিকিৎসা :
অ্যাম্বলিওপিয়া বা লেজি আই চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো মস্তিষ্ক এবং চোখের মধ্যকার দুর্বল সংযোগটি মেরামত করা। সংক্ষেপে এর চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো হলো:
⇨ প্যাচিং (Patching): ভালো চোখটি দিনে কয়েক ঘণ্টা ঢেকে রাখা হয়, যাতে মস্তিষ্ক অলস চোখটি ব্যবহার করতে বাধ্য হয়। এটিই সবচেয়ে জনপ্রিয় ও কার্যকর পদ্ধতি।
⇨ চশমার ব্যবহার: যদি পাওয়ারের সমস্যার কারণে দৃষ্টি ঝাপসা হয়, তবে চশমা দিয়ে আগে দৃষ্টির স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়।
⇨ অ্যাট্রোপিন ড্রপ: শিশুর ভালো চোখে বিশেষ ড্রপ দিয়ে দৃষ্টি সাময়িকভাবে ঝাপসা করে দেওয়া হয়, যাতে সে অন্য চোখটি ব্যবহার করে। এটি প্যাচিংয়ের বিকল্প হিসেবে কাজ করে।
⇨ ভিশন থেরাপি: চোখের মাংসপেশি সবল করতে এবং ফোকাস ঠিক করতে বিশেষ কিছু ব্যায়াম বা পাজল গেম করানো হয়।
⇨ সার্জারি: যদি চোখের মণি বাঁকা থাকে বা জন্মগত ছানি থাকে, তবে দ্রুত অস্ত্রোপচার করে দৃষ্টির পথ পরিষ্কার করা হয়।
মনে রাখা জরুরি যে, এই চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো কেবল শৈশবেই, সাধারণত ৭-৯ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভালো কাজ করে।
বড়দের কি লেজি আই হয় না?
অ্যাম্বলিওপিয়া নতুন করে বড়দের হয় না, তবে ছোটবেলায় ধরা না পড়লে বড় হয়ে সেটি থেকেই যায়। তখন চোখ স্বাভাবিক থাকলেও দৃষ্টি স্থায়ীভাবে দুর্বলই থাকে। এ কারণে অনেক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ এক চোখে ভালো দেখতে পান না, কিন্তু অনেকেই কারণটি জানেন না।
অনেক দেশে শিশুর ৩–৫ বছর বয়সের মধ্যে নিয়মিত চোখ পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করার পরামর্শ দেওয়া হয়। কারণ এই সময়েই অ্যাম্বলিওপিয়া সবচেয়ে ভালোভাবে ধরা ও ঠিক করা যায়।
দুই চোখ সুস্থ থাকলেই দৃষ্টি সুস্থ হবে, এ ধারণা সবসময় সত্য নয়। কখনো কখনো সমস্যাটা চোখে না, দেখার ভেতরে লুকিয়ে থাকে।