{{ news.section.title }}
অকাল বার্ধক্য রুখুন! ফ্রি র্যাডিক্যাল ও অক্সিডেটিভ চাপ কমানোর উপায়
- Author,
- Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
-
মানুষের বয়স বাড়ার সাথে সাথে কেন চামড়া কুঁচকে যায় বা শরীরের কর্মক্ষমতা কমে যায়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে ১৯৫০-এর দশকে ডেনহ্যাম হারম্যান এক যুগান্তকারী তত্ত্ব প্রস্তাব করেন। তাঁর মতে, আমাদের শরীরের কোষগুলো প্রতিদিন মুক্ত র্যাডিক্যাল নামক কিছু অতি-প্রতিক্রিয়াশীল অণুর দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বছরের পর বছর এই ক্ষতির পরিমাণ বাড়তে থাকাই হলো বার্ধক্যের অন্যতম একটি কারণ।
আমাদের শরীর প্রতিদিন নিঃশব্দে অসংখ্য রাসায়নিক বিক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যায়। শ্বাস নেওয়া, খাবার হজম, শক্তি তৈরি, কোষের বৃদ্ধি সবকিছুতেই অক্সিজেন জড়িত। কিন্তু এই অক্সিজেন ব্যবহারের প্রক্রিয়াতেই তৈরি হয় কিছু অস্থির অণু, যাদের বলা হয় ফ্রি র্যাডিক্যাল। এরা নিজেরা অস্থির, তাই শরীরের কোষ থেকে ইলেকট্রন ছিনিয়ে নিয়ে স্থিতিশীল হতে চায়। এর ফলেই কোষের গঠন, প্রোটিন, এমনকি ডিএনএ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিজ্ঞানীরা এই অবস্থাকে বলেন অক্সিডেটিভ স্ট্রেস। এই অক্সিডেটিভ স্ট্রেস দীর্ঘমেয়াদে ত্বকের বার্ধক্য ত্বরান্বিত করা থেকে শুরু করে হৃদ্রোগ, ডায়াবেটিস, স্নায়বিক সমস্যা, প্রদাহজনিত জটিলতা নানা স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে আশার কথা হলো, শরীর নিজেই এই ক্ষতির বিরুদ্ধে লড়ার ব্যবস্থা রাখে, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে। আমাদের কাজ হলো সেই প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা শক্তিকে শক্তিশালী করা।
ফ্রি র্যাডিক্যাল পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়, কারণ এগুলো শরীরের স্বাভাবিক কাজেরই উপজাত। কিন্তু সঠিক অভ্যাসে এর প্রভাব অনেকটাই কমানো যায়।
রঙিন খাবার:
প্রকৃতির সবচেয়ে শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট লুকিয়ে আছে রঙিন খাবারে। গাঢ় সবুজ, লাল, বেগুনি, কমলা এই রঙগুলোর ভেতর থাকে ফ্ল্যাভোনয়েড, ক্যারোটিনয়েড, ভিটামিন সি, ভিটামিন ই, পলিফেনল, যারা ফ্রি র্যাডিক্যালকে নিষ্ক্রিয় করতে সহায়তা করে। পালং শাক, লাল শাক, ব্রকলি, গাজর, টমেটো, বিট, কাঁচা মরিচ, আমলকি, পেয়ারা, কমলা, আঙুর, ডালিম ইত্যাদি নিয়মিত খাদ্যতালিকায় থাকলে শরীরের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ভান্ডারটি অনেকটা সমৃদ্ধ হয়।
পর্যাপ্ত পানি:
পানি শরীরের ভেতরে জমে থাকা বিপাকীয় বর্জ্য বের করে দিতে সাহায্য করে। যখন শরীর পর্যাপ্ত পানির অভাব অনুভব করে, তখন কোষের ভেতরে অক্সিডেটিভ চাপ বেড়ে যেতে পারে। সারাদিন অল্প অল্প করে পানি পান করলে,তা কোষের স্বাভাবিক কার্যক্রম অনেকটা সচল রাখে, রক্ত সঞ্চালন ঠিক রাখে এবং শরীরের ক্ষতিকর উপজাত দ্রুত বের হতে সাহায্য করে।
ঘুম:
শরীরের মেরামত প্রক্রিয়ার মূল সময় হলো পর্যাপ্ত ও গভীর ঘুম। এই সময়েই কোষ নিজেকে ঠিক করে, ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামত করে এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এনজাইমগুলো সক্রিয়ভাবে কাজ করে। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে তা অক্সিডেটিভ স্ট্রেস বাড়ায় এবং এটি বহু গবেষণায়ই প্রমাণিত। তাই নিয়মিত সময়মতো ঘুম ফ্রি র্যাডিক্যাল কমানোর একটি শক্তিশালী উপায়।
নিয়মিত ও পরিমিত ব্যায়াম:
হালকা থেকে মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম শরীরের নিজস্ব অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উৎপাদন বাড়ায়। হাঁটা, হালকা দৌড়, যোগব্যায়াম, সাইক্লিং ইত্যাদি শরীরের কোষে অক্সিজেন সরবরাহ উন্নত করে এবং কোষকে শক্তিশালী করে। তবে অতিরিক্ত ও হঠাৎ তীব্র ব্যায়াম উল্টো অক্সিডেটিভ স্ট্রেস বাড়াতে পারে।
প্রক্রিয়াজাত খাবার ও ভাজাপোড়া কমানো:
অতিরিক্ত তেল, ট্রান্সফ্যাট, প্যাকেটজাত খাবার, অতিরিক্ত চিনি ইত্যাদি খাবার শরীরের প্রদাহ বাড়ায় এবং ফ্রি র্যাডিক্যাল তৈরির হার বাড়িয়ে দেয়। স্বাভাবিক, কম প্রক্রিয়াজাত, তাজা খাবার আমাদের শরীরের জন্য বেশি নিরাপদ।
মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ:
দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ শরীরে কর্টিসল হরমোন বাড়ায়, যা অক্সিডেটিভ স্ট্রেস বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত। ধ্যান, গভীর শ্বাস-প্রশ্বাস, প্রকৃতির মাঝে সময় কাটানো, প্রিয় কাজ করা ইত্যাদি মানসিক চাপ কমিয়ে শরীরের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
ধূমপান ও দূষণ এড়িয়ে চলা:
ধোঁয়া, বায়ুদূষণ, ধূমপান ফ্রি র্যাডিক্যালের বড় উৎস। এগুলো ফুসফুস থেকে শুরু করে রক্তের কোষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত করে। যতটা সম্ভব পরিষ্কার পরিবেশে থাকা এবং ধূমপান এড়িয়ে চলা অক্সিডেটিভ ক্ষতি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ।
গ্রিন টি, হলুদ, রসুনের মতো প্রাকৃতিক উপাদান:
গ্রিন টির ক্যাটেচিন, হলুদের কারকিউমিন, রসুনের সালফার যৌগে শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বৈশিষ্ট্য আছে। নিয়মিত খাবারে এগুলো যুক্ত করলে শরীরের প্রতিরক্ষা ক্ষমতা বেড়ে যায়।
সূর্যালোক ও ত্বকের সুরক্ষা:
অতিরিক্ত রোদ ত্বকে ফ্রি র্যাডিক্যাল তৈরি বাড়িয়ে দেয়। তাই প্রয়োজন ছাড়া রোদে দীর্ঘ সময় থাকা এড়িয়ে চলা এবং ত্বক ঢেকে রাখা উপকারী।
ফ্রি র্যাডিক্যাল আমাদের শরীরের অবিচ্ছেদ্য অংশ, কিন্তু নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে সেটিই আমাদের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই ক্ষতির বিরুদ্ধে লড়াই কোনো ওষুধ দিয়ে নয়, বরং প্রতিদিনের সচেতন জীবনযাপনের মাধ্যমে সম্ভব।