{{ news.section.title }}
লুকানোর প্রবণতা কি মানসিক দুর্বলতা? জানুন মানুষ কেন লুকানোর প্রবণতা রাখে!
- Author,
- Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
-
প্রতিটি মানুষেরই মনের গহীনে রয়েছে এমন একটি কক্ষ আছে, যেখানে বাইরের কারো প্রবেশাধিকার নেই। জীবনে করা ছোটখাটো ভুল থেকে শুরু করে গভীর কোনো ইচ্ছা কিংবা ভয়, অনেক কিছুই আমরা সযত্নে লুকিয়ে রাখি পৃথিবীর চোখ থেকে। কিন্তু কেন এই লুকানোর প্রবণতা? এটি কি কেবল নিজেকে আড়াল করার ইচ্ছা, নাকি এর পেছনে কাজ করে জটিল কোনো বিবর্তনীয় এবং জৈবিক প্রক্রিয়া?
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, কোনো কিছু লুকিয়ে রাখা মানুষের একটি মৌলিক প্রতিরক্ষা কৌশল। মানুষ সাধারণত নিজের দুর্বলতাগুলোকে প্রকাশ করতে ভয় পায়। নিজের দুর্বলতা প্রকাশ হয়ে পড়লে সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়ার ভয় কিংবা প্রিয়জনকে হারানোর আশঙ্কা মানুষকে তথ্য গোপন করতে প্ররোচিত করে। গবেষণায় দেখা গেছে, গোপনীয়তা রক্ষার সময় আমাদের মস্তিষ্কের অ্যান্টেরিয়র সিঙ্গুলেট কর্টেক্স সক্রিয় হয়ে ওঠে, যা মূলত আবেগ ও যুক্তির লড়াই নিয়ন্ত্রণ করে। অর্থাৎ, কিছু গোপন করা মানে কেবল চুপ করে থাকাই নয় , এটি মনের ভেতরে এক বিশাল স্নায়বিক যুদ্ধ।
সামাজিকভাবেও এই গোপনীয়তার গুরুত্ব রয়েছে বেশ। মানুষ সামাজিক প্রাণী। সমাজে গ্রহণযোগ্যতা, সম্মান এবং সম্পর্ক বজায় রাখাই মানুষের প্রাথমিক লক্ষ্য। কিছু বিষয় প্রকাশ করলে সামাজিক সম্পর্ক বিপন্ন হতে পারে বা মর্যাদা হানি হতে পারে। তাই মানুষ লুকায়। এটি যেমন ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে সাহায্য করে, তেমনি অনেক ক্ষেত্রে সম্পর্কের মধ্যে এক ধরনের কৃত্রিম ভারসাম্য তৈরি করে।
সাংস্কৃতিকভাবে কিছু তথ্য বা অনুভূতি লজ্জাজনক বা নির্বন্ধ হিসেবে ধরা হয়। যেমন ধরুন, কিছু দেশের যুবক বা যুবতী যৌন পরিচয়, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা বা ব্যক্তিগত সংকল্প লুকায়, কারণ সমাজে এগুলো এখনও সম্পূর্ণ গ্রহণযোগ্য নয়। লুকানো তখন সংস্কৃতিগত চাপ ও সামাজিক নিয়মেরই একটি ফল।
মানব মস্তিষ্কের মধ্যে অ্যামিগডালা ও প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স লুকানো ও প্রকাশের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অ্যামিগডালা ভীতি ও বিপদ শনাক্ত করে, এবং বিপদ হলে লুকিয়ে রাখার প্রবণতা চালায়। প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স সেই তথ্যকে বিশ্লেষণ করে। অর্থাৎ, লুকানো একটি স্বাভাবিক, জৈবিকভাবে সমর্থিত আচরণ।
লুকানোর আরেকটি প্রভাব হলো সেলফ-প্রেজারভেশন বা আত্মরক্ষা। ইতিহাস থেকে দেখা যায়, মানবসভ্যতায় যেসব তথ্য বা আচরণ প্রকাশ করলে জীবন-ঝুঁকি বেড়ে যেত, মানুষ স্বাভাবিকভাবেই তা লুকাত। আজও মানসিকভাবে মানুষ সেই প্রাচীন প্রতিক্রিয়ার উপর নির্ভর করে নিজের ভাবনা, সম্পদ বা অনুভূতি সীমিত স্থানে রাখা।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন,যদি লুকানো দীর্ঘমেয়াদী এবং ভারী কোনো তথ্য গোপন রাখা মনের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে, যা পরবর্তীতে বিষণ্ণতা বা দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগের কারণ হতে পারে। সময় ও পরিস্থিতি অনুযায়ী সঠিকভাবে লুকানো যেমন ব্যক্তিগত সীমানা রক্ষা করা তেমনিভাবে মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে সহায়ক।
মানুষ লুকায় কারণ এটি আত্মরক্ষার কৌশল, সামাজিক সম্পর্ক রক্ষার উপায়, এবং মস্তিষ্কের জৈবিক প্রক্রিয়ার অংশ। কখনও এটি সহায়ক, কখনও দীর্ঘমেয়াদি চাপ ও উদ্বেগের কারণ।সচেতনভাবে, প্রয়োজন অনুযায়ী লুকানো ও প্রকাশ করা মানুষের মানসিক ও সামাজিক স্বাস্থ্যকে সমর্থন করে। সুতরাং, লুকানো মানে শুধু গোপন রাখা নয়; এটি একটি জটিল তবে সাধারণ ও প্রয়োজনীয় মানসিক কৌশল, যা মানুষকে নিরাপদ, সচেতন এবং সম্পর্ক-সচেতন রাখে।