{{ news.section.title }}
দক্ষিণ কোরিয়ার 'হ্যাগওন' সংস্কৃতির ভয়ংকর অন্ধকার দিক উন্মোচন!
- Author,
- Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
-
কাঁচের জানালার ওপাশে সারি সারি বহুতল ভবন আর নিওন আলোর ঝিলিক! দক্ষিণ কোরিয়া মানেই আমাদের চোখে এক উন্নত প্রযুক্তি আর কে-পপ সংস্কৃতির দেশ! কিন্তু এই চোখ ধাঁধানো সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে দেশটির এক কঠোর এবং প্রায় অমানবিক শিক্ষাব্যবস্থা। দক্ষিণ কোরিয়ার সামাজিক কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে হ্যাগওন বা বিশেষ প্রাইভেট টিউশন সংস্কৃতি, যা দেশটির কিশোর-কিশোরীদের জীবনকে পরিণত করেছে এক অন্তহীন রাতজাগা দৌড়ে।
বিশ্বের শিক্ষাসূচকে দক্ষিণ কোরিয়া শীর্ষস্থানে থাকলেও, এই সাফল্যের দাম দিতে হচ্ছে চড়া মূল্যে। দেশটিতে স্কুল শেষ হওয়ার পর শিক্ষার্থীরা বাসায় না ফিরে রাত ১০টা বা ১১টা পর্যন্ত হ্যাগওনগুলোতে হাড়ভাঙা পড়াশোনা করে। হ্যাগওন হলো দক্ষিণ কোরিয়ার প্রাইভেট টিউশন স্কুল। তাদের প্রত্যেকের লক্ষ্য একটাই,‘সুনুং’ (Suneung) নামক একটি মাত্র আট ঘণ্টার মহাযুদ্ধ বা কলেজ ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া। এটি তাদের ভবিষ্যৎ সামাজিক মর্যাদা নির্ধারণ করে দেয়।
দেশে শিক্ষার্থীরা প্রাতিষ্ঠানিক স্কুলের পর দুপুর, বিকেল এবং প্রায় রাত পর্যন্ত হ্যাগওনে থাকে। এই রাতজাগা অধ্যয়ন সংস্কৃতির মূল লক্ষ্য হলো একক পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি। দক্ষিণ কোরিয়ার শিক্ষার্থীদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয় সুনুং বা কলেজ ভর্তি পরীক্ষা। পরীক্ষা একটি একক দিনে অনুষ্ঠিত হয়।
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই সংস্কৃতি যেমন কোরিয়াকে একটি শিক্ষিত ও দক্ষ জাতি হিসেবে বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত করেছে, ঠিক তেমনি জন্ম দিয়েছে চরম মানসিক অবসাদ, ঘুমের অভাব এবং এক ভয়াবহ সামাজিক প্রতিযোগিতার। শিক্ষার এই গতি একদিকে তো দেশটিকে প্রযুক্তির শীর্ষে নিয়ে গেছে, কিন্তু অন্যদিকে তরুণ প্রজন্মের মাঝে তৈরি করছে এক গভীরতম একাকীত্ব। সাফল্যের এই কোরিয়ান মডেল কি সত্যিই অনুকরণের যোগ্য, নাকি এর আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে একটি পুরো প্রজন্মের স্বাভাবিক শৈশব,তা নিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে চলছে বেশ বিতর্ক।
হ্যাগওন কালচারের প্রভাব শিক্ষার সাথে সাথে মানসিক ও সামাজিক দিকে গভীর এক প্রভাব ফেলে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা সময় ব্যবস্থাপনায় দক্ষ হয় এবং প্রতিযোগিতামূলক দক্ষতা অর্জন করলেও দীর্ঘ সময় অধ্যয়ন, রাতজাগা এবং সামাজিক চাপ মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। গবেষণায় দেখা গেছে, দক্ষিণ কোরিয়ার শিক্ষার্থীদের ঘুমের গড় সময় প্রায় ৫–৬ ঘণ্টা। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই পরিমাণ ঘুম তাদের বিকাশ, মনোযোগ এবং মানসিক স্থিতির জন্য পর্যাপ্ত নয়।
হ্যাগওন কালচার শিক্ষার্থীর পরিবারকেও প্রভাবিত করে। মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারগুলি তাদের সন্তানকে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রাখার জন্য অর্থ ব্যয় করে ঠিকই কিন্তু প্রাইভেট টিউশন ফি একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক বোঝা। ফলে, শিক্ষার অর্থনৈতিক বোঝা এবং সামাজিক প্রতিযোগিতা মিলেমিশে একটি চাপপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি করে।
এই সংস্কৃতি একদিকে দক্ষ, উচ্চশিক্ষিত প্রজন্ম তৈরি করে, অন্যদিকে মানসিক চাপ ও স্বাস্থ্য সমস্যার ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। সরকার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন সময় পদক্ষেপ নিয়েছে। যেমন - রাতের হ্যাগওন বন্ধ, ঘুমের সময় নিশ্চিত করা, মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি। তবে সামাজিক চাপ, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার গুরুত্ব এবং অভিভাবকদের প্রত্যাশা এখনও রাতজাগা অধ্যয়নের প্রবণতা কমাতে বাধা সৃষ্টি করে।
দক্ষিণ কোরিয়ার হ্যাগওন কালচার একটি জাতিগত মানসিকতা ও সামাজিক সংস্কৃতি। রাতজাগা অধ্যয়ন এবং প্রাইভেট টিউশনের উপর নির্ভরতা দেশের শিক্ষার্থীদের জীবনে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে।