কোষ্ঠকাঠিন্যে ভুগছেন? জানুন এর কারণ, লক্ষণ এবং দ্রুত মুক্তির সহজ কৌশল

কোষ্ঠকাঠিন্যে ভুগছেন? জানুন এর কারণ, লক্ষণ এবং দ্রুত মুক্তির সহজ কৌশল
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

বর্তমান সময়ে অনিয়মিত জীবনযাপন এবং খাদ্যাভ্যাসের কারণে যে সমস্যাটি ঘরে ঘরে দেখা দিচ্ছে, তা হলো কোষ্ঠকাঠিন্য বা কনস্টিপেশন। সাধারণ এই সমস্যাটি অনেক সময় অবহেলার কারণে দীর্ঘমেয়াদী কোলোন ক্যান্সার, পাইলস বা ফিশারের মতো জটিল রোগের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। কিন্তু কেন হয় এই কোষ্ঠকাঠিন্য আর জীবনযাত্রায় সামান্য কী পরিবর্তন আনলে এর থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব তা কি আমরা জানি?

চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, খাবারে পর্যাপ্ত আঁশ বা ফাইবার (Fiber) না থাকা এবং প্রয়োজনের তুলনায় কম জল পান করাই এই সমস্যার প্রধান কারণ। যখন বৃহদান্ত্র বর্জ্য থেকে অতিরিক্ত জল শুষে নেয়, তখনই তা শক্ত হয়ে যায় এবং নির্গমনে জটিলতা তৈরি করে। শুধু বড়রাই নয়, বর্তমানে ফাস্টফুড এবং প্রসেসড ফুডের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতার কারণে শিশুরাও এই সমস্যার শিকার হচ্ছে।

​বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, শুধু ওষুধের ওপর নির্ভর না করে খাদ্যাতালিকায় সবুজ শাকসবজি, ইসবগুলের ভুসি এবং প্রোবায়োটিক সমৃদ্ধ খাবার রাখা জরুরি। কোষ্ঠকাঠিন্য কেবল শারীরিক অস্বস্তি নয়, এটি আপনার মানসিক মেজাজ এবং কর্মক্ষমতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। শরীরকে ভেতর থেকে সচল রাখতে এবং হজম প্রক্রিয়া স্বাভাবিক রাখতে সঠিক খাদ্যাভ্যাসের কোনো বিকল্প নেই।

​কোষ্ঠকাঠিন্য কোনো সাধারণ শারীরিক সমস্যা নয়, বরং এটি অনেক জটিল রোগের প্রবেশদ্বার। মানব অন্ত্রের ক্রিয়াশীলতা অটোনমিক নার্ভ সিস্টেমের নিয়ন্ত্রণে চলে। যখন পুষ্টি, পানি ও ব্যায়ামের ভারসাম্য থাকে, তখন পেরিস্টালসিস বা অন্ত্রের ধাক্কাধাক্কি স্বাভাবিক হয়। কিন্তু খাদ্য তালিকা ভারসাম্যহীন হলে অন্ত্রের পেশি কম সক্রিয় হয়, যা কোষ্ঠকাঠিন্যের একটি অন্যতম কারণ।

কেন হয় এই সমস্যা?

​চিকিৎসকদের মতে, আমাদের দৈনন্দিন কিছু অভ্যাসই এই সমস্যার প্রধান উৎস।

☞ ​আঁশযুক্ত খাবারের অভাব: শাকসবজি ও ফলমূল কম খাওয়া।

☞ ​পানি স্বল্পতা: পর্যাপ্ত পানি পান না করা কোষ্ঠকাঠিন্যের অন্যতম প্রধান কারণ।

☞ ​শারীরিক পরিশ্রমের অভাব: দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা বা কায়িক পরিশ্রম না করা।

☞ ​অতিরিক্ত চা-কফি: যারা অতিরিক্ত চা বা কফি পান করেন এবং চর্বিযুক্ত খাবার বেশি খান, তাদের ঝুঁকি বেশি।

☞ ​অন্যান্য রোগ: ডায়াবেটিস, মস্তিষ্কে টিউমার বা অন্ত্রের ক্যানসারের ফলেও এটি হতে পারে।

☞ ​ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া: পেট ব্যথা বা ডায়রিয়া বন্ধের ওষুধের প্রভাবেও কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে।

লক্ষণসমূহ:

⇨ সপ্তাহে দুইবারের কম পায়খানা হওয়া।

⇨ ​মল শুষ্ক ও কঠিন হওয়া এবং ত্যাগের সময় প্রচণ্ড ব্যথা।

⇨ ​অধিক সময় ধরে চেষ্টার পরও মলত্যাগের অসম্পূর্ণ অনুভূতি।

⇨ ​তলপেটে ও মলদ্বারের আশেপাশে অস্বস্তি বা ব্যথা।

⇨ ​ক্রমান্বয়ে আলস্য বৃদ্ধি পাওয়া এবং মেজাজ খিটখিটে হওয়া।

​অবহেলার পরিণতি:

​কোষ্ঠকাঠিন্য দীর্ঘস্থায়ী হলে শরীর ও মনে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।যেমন:

১. শারীরিক ক্লান্তি: রক্তাল্পতা, অনিদ্রা, মাথা ঘোরা এবং মনোযোগ হ্রাস।

২. চর্মরোগ: মুখে ঘা, মেচেতা এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে চুলকানি।

৩. জটিল রোগ: দীর্ঘদিনের কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে পাইলস, অ্যানাল ফিশার এবং রেকটাল প্রোল্যাপস (মলাধার বাইরে চলে আসা) হতে পারে। এমনকি খাদ্যনালিতে আলসার বা ছিদ্র হওয়ার মতো ভয়াবহ ঝুঁকিও থাকে।

​প্রতিকার এবং ঘরোয়া সমাধান:

​ডাক্তারদের মতে, কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করার থেকে, এটি যাতে না হয়, সেভাবে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ।

বাংলাদেশে ইসবগুলের ভুসি এক গ্লাস পানিতে ভিজিয়ে খালি পেটে সেবন করা একটি জনপ্রিয় ও কার্যকর পদ্ধতি। তাছাড়া ​ফলের রস, যেমন- বেলের শরবত (৩০-৩৫ গ্রাম শাঁস পানিতে মিশিয়ে দিনে ২ বার) অন্তত ৫-১০ দিন পান করলে বেশ ভালো উপকার পাওয়া যায়। এছাড়া মিষ্টি পাকা বরই ছেঁকে অল্প পানি মিশিয়ে খেলেও উপশম হয়।

প্রতিদিনের ছোট অভ্যাসের পরিবর্তন:

⇨ সকালের খালি পেটে পানি পান করা।

⇨ খাবারের সাথে পর্যাপ্ত শাকসবজি ও ফল যোগ করা।

⇨ নিয়মিত হালকা ব্যায়াম ও হাঁটাচলা।

⇨ অতিরিক্ত চিনি, ফাস্ট ফুড ও প্রসেসড খাবার এড়ানো।

⇨ চাপ ও মানসিক চাপও কোষ্ঠকাঠিন্যকে ত্বরান্বিত করে। স্ট্রেস হরমোন ক্রমাগত স্রাবের ফলে অন্ত্রের কার্যক্রম ধীর হয়ে যায়। তাই মানসিক চাপ কমানোও সমাধানের একটি।

​সতর্কতা: মল নরম করার জন্য অনেকেই জোলাপ বা ল্যাক্সেটিভ, যেমন: Actilac ব্যবহার করেন। তবে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ছাড়া এগুলোর দীর্ঘস্থায়ী ব্যবহার মলত্যাগের স্বাভাবিক অভ্যাস নষ্ট করে দিতে পারে।

কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনা জরুরি। বেশি করে পানি পান করুন, আঁশযুক্ত খাবার খান এবং নিয়মিত হাঁটার অভ্যাস করুন। যদি সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়াই উত্তম।

কোষ্ঠকাঠিন্য একটি সাধারণ কিন্তু গুরুত্বপূর্ন সমস্যা। এটিকে অবহেলা করলে শুধু অস্বস্তি নয়, দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। 


সম্পর্কিত নিউজ