স্বপ্নের ভেতর আরেকটি স্বপ্নে গিয়েছেন কখনো? জানুন অবচেতন মনের রহস্যময় খেলা

স্বপ্নের ভেতর আরেকটি স্বপ্নে গিয়েছেন কখনো? জানুন অবচেতন মনের রহস্যময় খেলা
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

ঘুমের ভেতর হঠাৎ মনে হলো, আপনি জেগে উঠেছেন। চারপাশ চেনা, সবকিছু স্বাভাবিক। কিন্তু কিছুক্ষণ পর বুঝতে পারলেন, না, এটাও স্বপ্ন। আবার সেই স্বপ্নের মধ্যেই আরেকটি ঘটনা, আরেকটি দৃশ্য। শেষে সত্যিকারের ঘুম ভাঙার পর মনে হলো, আপনি যেন স্বপ্নের ভেতর আরেকটি স্বপ্নে ঢুকে পড়েছিলেন। এমন অভিজ্ঞতা অনেকেরই হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এটা কি কেবল কল্পনার খেলা, নাকি মানুষের মস্তিষ্কের ভেতরে ঘটতে থাকা এক গভীর প্রক্রিয়া?

আধুনিক নিউরোসায়েন্স বলছে, স্বপ্নের ভেতর স্বপ্ন দেখা কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়। বরং এটি মানুষের মস্তিষ্কের সচেতনতা, স্মৃতি ও কল্পনার জটিল সমন্বয়ের ফল।

স্বপ্ন কীভাবে তৈরি হয়?

মানুষ ঘুমানোর সময় তার মস্তিষ্ক কখনোই পুরোপুরি বন্ধ থাকে না। বরং ঘুমের বিভিন্ন ধাপে মস্তিষ্ক ভিন্ন ভিন্নভাবে সক্রিয় থাকে। বিশেষ করে REM ঘুমে, যখন চোখ দ্রুত নড়ে,সেই সময়েই সবচেয়ে উজ্জ্বল ও বাস্তবসম্মত স্বপ্ন দেখা যায়। এই পর্যায়ে মস্তিষ্কের আবেগ ও কল্পনার অংশ বেশি সক্রিয় থাকে। আর তুলনামূলকভাবে নিষ্ক্রিয় হয় যুক্তিবোধ ও বাস্তবতা যাচাইয়ের অংশ। স্মৃতি, ভয়, ইচ্ছা ও কল্পনা একসঙ্গে মিশে যায়। ফলে স্বপ্ন বাস্তবের মতো মনে হয়।

স্বপ্নের ভেতর স্বপ্ন কীভাবে সম্ভব?

স্বপ্নের ভেতর আরেকটি স্বপ্ন দেখা মূলত এক ধরনের স্তরভিত্তিক সচেতনতা। সহজভাবে বলা যায়, মস্তিষ্ক তখন এমন একটি অবস্থা তৈরি করে যেখানে আপনি স্বপ্ন দেখছেন, সেই স্বপ্নের ভেতর আবার জেগে ওঠার মতো অনুভূতি হচ্ছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আপনি তখনো ঘুমিয়ে আছেন, একে অনেক গবেষক বলেন False Awakening অর্থাৎ ভুয়া জাগরণ। মানুষ মনে করে সে ঘুম থেকে উঠেছে, কিন্তু বাস্তবে সে এখনো স্বপ্নের ভেতরই আছে। এই ভুয়া জাগরণের মধ্যেই আবার নতুন একটি স্বপ্ন শুরু হতে পারে। তখন পুরো ঘটনাটি মানুষের মনে স্বপ্নের ভেতর স্বপ্ন হিসেবে ধরা পড়ে।

মস্তিষ্ক কেন এমন জটিল দৃশ্য তৈরি করে?

এখানে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ কাজ করে-

১. ঘুমের সময় মস্তিষ্ক দিনের অভিজ্ঞতা, চিন্তা ও আবেগকে সাজায়-গোছায়। এই প্রক্রিয়ায় বাস্তব জীবনের জেগে ওঠা বা ঘুম ভাঙার অভিজ্ঞতাও স্মৃতির অংশ হয়ে যায়। তাই স্বপ্নের ভেতর মস্তিষ্ক সেই অভিজ্ঞতাকে অনুকরণ করে। একে মস্তিষ্কের স্মৃতি পুনর্গঠন প্রক্রিয়া বলে।

২. যাদের মাথায় একসঙ্গে অনেক চিন্তা চলে, যারা গভীরভাবে ভাবেন বা উদ্বেগে ভোগেন, তাদের ক্ষেত্রে এমন স্বপ্ন বেশি দেখা যায়। কারণ তাদের মস্তিষ্ক পুরোপুরি বিশ্রামে যেতে পারে না।

৩. যখন ঘুম গভীর না হয়ে বারবার হালকা ও গভীর পর্যায়ের মধ্যে যাতায়াত করে, তখন এই ধরনের স্বপ্ন বেশি হয়। এতে মস্তিষ্ক বাস্তব ও স্বপ্নের সীমা ঠিকভাবে আলাদা করতে পারে না।

লুসিড ড্রিমিংয়ের সঙ্গে এর কি সম্পর্ক আছে?

অনেক সময় স্বপ্নের ভেতর স্বপ্ন দেখার অভিজ্ঞতা Lucid Dreaming-এর কাছাকাছি চলে যায়। লুসিড ড্রিমিং মানে স্বপ্ন দেখার সময় মানুষ বুঝতে পারে যে সে স্বপ্ন দেখছে। তবে পার্থক্য হলো লুসিড ড্রিমিংয়ে মানুষ কিছুটা নিয়ন্ত্রণ পায়, স্বপ্নের ভেতর স্বপ্নে সাধারণত নিয়ন্ত্রণ থাকে না বরং বিভ্রান্তি ও বাস্তবতার ধোঁয়াশা বেশি হয়ে থাকে। তবু গবেষকরা মনে করেন, এই দুই অভিজ্ঞতার পেছনে মস্তিষ্কের একই ধরনের স্নায়বিক কার্যকলাপ কাজ করতে পারে।

ইতিহাসজুড়ে স্বপ্নের ভেতর স্বপ্ন দেখাকে নানা সংস্কৃতিতে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কোথাও একে আত্মিক যাত্রা বলা হয়েছে, কোথাও বা ভবিষ্যৎ ইঙ্গিত, আবার কোথাও বাস্তবতা নিয়ে গভীর প্রশ্নের প্রতীক।

কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান এখানে পরিষ্কারভাবে জানায় যে এটি মূলত মস্তিষ্কের নিউরাল নেটওয়ার্কের খেলা, যেখানে স্মৃতি, কল্পনা ও সচেতনতার স্তর একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়। এর মানে এই নয় যে অভিজ্ঞতাটি তুচ্ছ। বরং এটি মানুষের মস্তিষ্ক কতটা জটিল ও শক্তিশালী, তারই একটি প্রমাণ।

স্বপ্নের ভেতর স্বপ্ন কি বিপজ্জনক?

সাধারণভাবে নয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এটি ক্ষতিকর কিছু নয় এবং কোনো মানসিক রোগের সরাসরি লক্ষণও নয়। তবে কিছু ক্ষেত্রে সতর্ক হওয়া জরুরি। যেমন-

⇨ যদি নিয়মিত এমন স্বপ্ন হয়।

⇨ যদি ঘুম ভাঙার পর দীর্ঘ সময় বিভ্রান্ত লাগে।

⇨  বাস্তব আর স্বপ্ন আলাদা করতে সমস্যা হলে।

⇨ যদি এর সঙ্গে তীব্র ভয় বা আতঙ্ক যুক্ত থাকে।

তাহলে ঘুমের মান ও মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে নজর দেওয়া দরকার।

কেন এই স্বপ্নগুলো এত বাস্তব মনে হয়?

এই ধরনের স্বপ্ন এত তীব্রভাবে মনে থাকার কারণ, মস্তিষ্ক তখন আবেগের অংশকে বেশি সক্রিয় রাখে। বাস্তবতা যাচাইয়ের অংশ কম সক্রিয় থাকে। দৃশ্য, শব্দ ও অনুভূতি প্রায় বাস্তবের মতো তৈরি হয়। ফলে ঘুম ভাঙার পরও সেই অভিজ্ঞতা মনে গেঁথে থাকে।


সম্পর্কিত নিউজ