{{ news.section.title }}
ক্লান্তি কাটাতে মুলার ডিটক্স, শরীর পরিষ্কার করুন ভেতর থেকে!
- Author,
- Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
-
শীত এলেই আমাদের খাবারের তালিকায় ভারী পদ, তেল-মশলার ব্যবহার আর তুলনামূলক কম পানি পানের প্রবণতা বেড়ে যায়। ঠান্ডা আবহাওয়ায় ক্ষুধা বাড়ে, কিন্তু অনেকসময় শরীরের স্বাভাবিক বিপাকক্রিয়া ধীর হয়ে পড়ে। ফলে গ্যাস্ট্রিক, কোষ্ঠকাঠিন্য, অস্বস্তি, ত্বকের নিস্তেজ ভাব কিংবা অলসতা দেখা দেয়। এই সময় শরীরকে আলাদা করে বিশ্রাম ও ভেতর থেকে পরিষ্কার রাখার প্রয়োজন পড়ে। এখানেই আলোচনায় আসে শীতের একটি অবহেলিত কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর সবজি,মুলা।
মুলা সাধারণত তরকারি বা সালাদের উপাদান হিসেবেই বেশি পরিচিত। কিন্তু পুষ্টিবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি একটি শীতকালীন প্রাকৃতিক ডিটক্স খাদ্য। সহজলভ্য, সাশ্রয়ী এবং রান্না করা বা কাঁচা দুইভাবেই খাওয়ার উপযোগী এই সবজির ভেতরে লুকিয়ে আছে শরীর পরিষ্কার রাখার শক্তিশালী এক ক্ষমতা।
ডিটক্স বলতে অনেকে জটিল ডায়েট বা দামি পানীয়ের কথা ভাবেন। বাস্তবে শরীরের নিজস্ব ডিটক্স ব্যবস্থাই সবচেয়ে কার্যকর। লিভার, কিডনি ও অন্ত্র প্রতিদিনই শরীর থেকে বর্জ্য বের করে দেয়। তবে খাবারের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়াকে সহায়তা করা গেলে, শরীর কাজ করতে পারে আরও স্বস্তিতে। মুলা ঠিক এখানেই ভূমিকা রাখে।
মুলার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো,এর উচ্চ জলীয় অংশ। শীতকালে আমরা সাধারণত কম পানি পান করি, ফলে শরীর পানিশূন্যতার দিকে ঝুঁকে পড়ে। মুলার মধ্যে থাকা প্রাকৃতিক পানি শরীরের তরল ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। ফলে কিডনির ওপর চাপ কমে এবং প্রস্রাবের মাধ্যমে বর্জ্য সহজে বেরিয়ে যেতে পারে,যা ডিটক্স প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
একই সঙ্গে মুলা,আঁশে ভরপুর। এই আঁশ হজমতন্ত্রকে সক্রিয় রাখে এবং অন্ত্রের ভেতর জমে থাকা বর্জ্য পরিষ্কার করতে সহায়তা করে। শীতে কোষ্ঠকাঠিন্য একটি সাধারণ সমস্যা। নিয়মিত মুলা খেলে মল নরম থাকে। অন্ত্রের গতি স্বাভাবিক হয় এবং পেট হালকা লাগে। এটি শরীরের ভেতরের পরিষ্কারের প্রথম ধাপ।
মুলা লিভারের জন্যও উপকারী। লিভার হলো শরীরের প্রধান ডিটক্স অঙ্গ। শীতকালে অতিরিক্ত তেল-মশলাযুক্ত খাবার লিভারের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। সেক্ষেত্রে মুলার কিছু প্রাকৃতিক যৌগ লিভারের কার্যকারিতা বজায় রাখতে সাহায্য করে এবং চর্বি বিপাকের প্রক্রিয়াকেও সমর্থন করে। এর ফলে শরীর ভারী লাগা বা অতিরিক্ত অলসতা কমে আসে।
শীতের ডিটক্স খাবার হিসেবে মুলার আরেকটি বড় সুবিধা হলো এটি হজমে সহায়ক। অনেক সময় শীতের খাবার হজম হতে দেরি হয়, পেটে গ্যাস বা অস্বস্তি তৈরি হয়। মুলা পাকস্থলীর রস নিঃসরণে সহায়তা করে এবং খাবার দ্রুত ভাঙতে সাহায্য করে। এতে পেট ফাঁপা বা গ্যাসের সমস্যা তুলনামূলকভাবে কমে।
এখন প্রশ্ন আসে, মুলা দিয়ে ডিটক্স খাবার বলতে ঠিক কী বোঝানো হচ্ছে?
এটি কোনো নির্দিষ্ট একটি পদ নয়, বরং এমন কিছু খাবার যা শরীরকে ভার না দিয়ে হালকা রাখে এবং নিয়মিত খাওয়ার উপযোগী। শীতের সকালে কাঁচা মুলা দিয়ে হালকা সালাদ হতে পারে ডিটক্সের সহজ সূচনা। পাতলা করে কাটা মুলা, সামান্য লেবুর রস ও অল্প লবণের এই সরল মিশ্রণ হজমশক্তি জাগিয়ে তোলে। এটি পেট পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে এবং খাবারের আগে খেলে অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতাও কমাতে পারে।
রান্না করা মুলাও ডিটক্সের ক্ষেত্রে কার্যকর, যদি রান্নার ধরন হয় হালকা। অল্প তেলে মুলা ভাজি বা ঝোল শরীরকে ভারী না করে প্রয়োজনীয় পুষ্টি দেয়। বেশি মশলা বা তেল ব্যবহার না করলে মুলার স্বাভাবিক উপকারিতা বজায় থাকে। শীতে অনেকেই মুলা দিয়ে ভর্তা খেতে পছন্দ করেন, যা সঠিকভাবে তৈরি হলে ডিটক্স খাবার হিসেবে কাজ করে।
মুলার পাতাও অবহেলার নয়। অনেক সময় আমরা কেবল মূল অংশটুকু ব্যবহার করি, কিন্তু অনেকেই জানেন না যে পাতার ভেতরেও রয়েছে প্রচুর পুষ্টি ও আঁশ। মুলার পাতা দিয়ে হালকা ভাজি বা স্যুপ শীতের জন্য আদর্শ ডিটক্স খাবার হতে পারে। এটি শরীরকে উষ্ণ রাখে, আবার হজমেও বেশ সহায়ক।
ডিটক্স মানে শুধু অন্ত্র পরিষ্কার নয়, ত্বকের সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে। শরীরের ভেতরে বর্জ্য জমে থাকলে তার প্রভাব পড়ে ত্বকে। ফলে ব্রণ, নিস্তেজ ভাব বা রুক্ষতা দেখা দিতে পারে। মুলা শরীরের ভেতরের পরিষ্কার প্রক্রিয়াকে সহায়তা করায় ত্বকও ধীরে ধীরে উজ্জ্বল হতে শুরু করে। শীতকালে ত্বক শুষ্ক হয়ে পড়লেও ভেতর থেকে হাইড্রেশন বজায় থাকলে সেই সমস্যা কিছুটা কমে।
শীতের ডিটক্সে মুলার আরেকটি দিক হলো এটি রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাকে সমর্থন করে। ঠান্ডা আবহাওয়ায় সর্দি-কাশি বা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। মুলার ভেতরে থাকা প্রাকৃতিক উপাদান শরীরকে ভেতর থেকে শক্ত রাখতে সাহায্য করে। নিয়মিত খেলে শরীর সহজে দুর্বল হয়ে পড়ে না।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, ডিটক্স মানেই কিন্তু অতিরিক্ত বা একপেশে কিছু নয়। শুধু মুলা খেয়ে দিন পার করাই ডিটক্স নয়। বরং শীতের স্বাভাবিক খাদ্যতালিকায় মুলাকে বুদ্ধিমানের মতো যুক্ত করাই মূল কথা।
শীতকালে যারা ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে চান, তাদের জন্যও মুলা উপযোগী। এতে ক্যালরি কম, কিন্তু আঁশ বেশি। ফলে পেট ভরা অনুভূতি দেয়, অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা কমায়। ডিটক্সের সঙ্গে সঙ্গে এটি একটি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতেও সাহায্য করে।
শীতের ডিটক্স কোনো আলাদা কর্মসূচি নয়, বরং সচেতন খাবার বেছে নেওয়ার অভ্যাস। মুলা সেই অভ্যাসের সহজ, প্রাকৃতিক ও কার্যকর অংশ হতে পারে। এটি শরীরকে ভেতর থেকে পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে, হজম শক্তিশালী করে এবং শীতের ভারী খাবারের চাপ সামাল দিতে সহায়তা করে। দামি ডিটক্স পানীয় বা কঠোর ডায়েটের দিকে না ঝুঁকে, বরং রান্নাঘরের পরিচিত সবজির মধ্যেই যদি সমাধান পাওয়া যায়, সেটিই হবে আমাদের জন্য সবচেয়ে টেকসই পথ।