সাধারণ চা নয়, এবার ট্রাই করুন মালয়েশিয়ান তেহ-তারিক!

সাধারণ চা নয়, এবার ট্রাই করুন মালয়েশিয়ান তেহ-তারিক!
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

কোথাও চা মানে সকাল শুরু করার অভ্যাস, কোথাও আবার সামাজিকতার কেন্দ্রবিন্দু। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এমন একটি চা আছে, যা কেবল স্বাদের জন্য নয়, তৈরির কৌশলের জন্যও বিস্ময় জাগায় সকলের মনেই। কাপ থেকে কাপে চায়ের দীর্ঘ এক ধারা বাতাসে ভাসছে, আর নিমিষেই তৈরি হচ্ছে ঘন ফেনা! এই শৈল্পিক দৃশ্যটিই হলো মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের ঐতিহ্যবাহী ‘তেহ তারিক’ (Teh Tarik)।

এই চা বানানোর সময় যে নাটকীয়ভাবে এক কাপ থেকে আরেক কাপে ঢেলে টানা হয়, সেটিই একে আলাদা করে দেয়। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় নিছক কসরত, কিন্তু এর পেছনে রয়েছে বেশ কিছু রহস্য!

মালয় ভাষায় তেহ তারিক-এর  আক্ষরিক অর্থ হলো ‘টানা চা’। এই চায়ের জন্ম মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর অঞ্চলে, যেখানে বিভিন্ন সংস্কৃতির মিলনে খাবার ও পানীয়ের নিজস্ব পরিচয় তৈরি হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তেহ তারিক হয়ে উঠেছে একটি সাংস্কৃতিক প্রতীক। রাস্তার ধারের দোকান থেকে শুরু করে আধুনিক ক্যাফে পর্যন্ত সব জায়গাতেই এই চা তৈরি ও পরিবেশনের দৃশ্য মানুষকে থমকে দাঁড়াতে বাধ্য করে।

তেহ তারিকের মূল উপাদান খুব বেশি জটিল নয়। সাধারণ কালো চা, গাঢ় দুধ এবং চিনি মিলেই তৈরি হয় পানীয় টির ভিত্তি। কিন্তু এই সাধারণ উপাদানই অনন্য হয়ে ওঠে প্রস্তুত প্রণালীর কারণে। এখানেই আসে চা টানা’র কৌশল, যা শুধু চোখের আনন্দই দেয় না, স্বাদের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথমে কালো চা বেশ গাঢ় করে ফুটিয়ে নেওয়া হয়। এই গাঢ়ত্বই তেহ তারিকের প্রাণ। কারণ টানার সময় দুধ ও বাতাস মেশার পরও চায়ের স্বাদ যাতে ফিকে না হয়ে যায়, সেটি নিশ্চিত করতেই চা একটু বেশি শক্ত করে তৈরি করা হয়। এরপর আলাদা পাত্রে গাঢ় দুধ ও চিনি মিশিয়ে নেওয়া হয়। চা ছেঁকে সেই মিশ্রণের সঙ্গে যোগ করার পর শুরু হয় টানার পর্ব।

এই পর্যায়ে চা দেখতে সাধারণ দুধচায়ের মতোই থাকে। আসল রূপান্তর শুরু হয় টানার মুহূর্তে।

চা টানার কৌশলটি বাইরে থেকে যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে এটি ততটাই নিয়ন্ত্রণ ও অভ্যাসের বিষয়। একটি পাত্রে থাকা চা আরেকটি পাত্রে ওপর থেকে ঢালা হয়। প্রথমে অল্প উচ্চতা থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে দূরত্ব বাড়ানো হয়। এই সময় চা পাতলা ধারার মতো নেমে আসে, মাঝখানে বাতাসের সঙ্গে মিশে যায়। এই বাতাসই তেহ তারিকের ফেনা তৈরি করে। কয়েকবার এমন করলে চায়ের রং হালকা ক্যারামেলের মতো হয় এবং উপরে ফেনা জমে ওঠে।তেহ তারিকের স্বাদে একটি বিশেষ ভারসাম্য থাকে, না খুব তেতো, না অতিরিক্ত মিষ্টি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চা-কে এভাবে উপর থেকে নিচে টেনে নামানোর মূল উদ্দেশ্য হলো এর তাপমাত্রা দ্রুত কমানো এবং উপাদানের সঠিক মিশ্রণ নিশ্চিত করা। যখন চা-কে এক পাত্র থেকে অন্য পাত্রে দীর্ঘ ধারায় ঢালা হয়, তখন এতে প্রচুর পরিমাণে অক্সিজেন মিশে যায়। বাতাসের এই সংস্পর্শ চায়ের স্বাদকে আরও গভীর করে এবং কনডেন্সড মিল্কের সাথে মিশে তৈরি করে এক অনন্য মখমলে টেক্সচার। ​বিজ্ঞানীদের মতে, এই ‘টানা’ প্রক্রিয়ার ফলে চায়ের কণাগুলো বাতাসের চাপে ভেঙে যায়, যা পানীয়টির সুগন্ধ বাড়িয়ে দেয় কয়েকগুণ। কেবল স্বাদই নয়, তেহ তারিক প্রস্তুত করার এই ভঙ্গিটি এখন একটি স্বীকৃত শিল্পকলা, যা পর্যটকদের কাছে অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।

তাপমাত্রার বিষয়টি এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত গরম চা অনেক সময় জিহ্বায় ঝাঁঝালো লাগে, আবার খুব ঠান্ডা হলে স্বাদ ঠিকভাবে প্রকাশ পায় না। টানার সময় চায়ের উচ্চতা ও ধারার মাধ্যমে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। অভিজ্ঞ চা প্রস্তুতকারীরা শুধু চোখে ও হাতে অনুভব করেই বুঝে নেন, কতটা দূরত্বে টানলে চা সবচেয়ে উপযুক্ত হবে।

এই চা টানার দৃশ্য ধীরে ধীরে এক ধরনের পারফরম্যান্সে পরিণত হয়েছে। অনেক জায়গায় তেহ তারিক বানানো মানে দর্শকদের সামনে দক্ষতা প্রদর্শন। এক কাপ থেকে আরেক কাপে চা ঢালার সময় যদি এক ফোঁটাও বাইরে না পড়ে, সেটিকে দক্ষতার নিদর্শন হিসেবে দেখা হয়। কোথাও কোথাও তো তেহ তারিক টানার প্রতিযোগিতাও হয়, যেখানে উচ্চতা, ধারাবাহিকতা ও ফেনার মান বিচার করা হয়। তেহ তারিকের রেসিপি বললে শুধু উপকরণের তালিকা দিলেই বিষয়টি সম্পূর্ণ হয় না। কারণ এখানে পরিমাপের চেয়ে অভ্যাস ও অনুভূতির ভূমিকাই বেশি প্রাধান্য পায়।

আধুনিক সময়ে তেহ তারিক নতুন রূপও নিচ্ছে। কোথাও কম চিনি, কোথাও ভিন্ন ধরনের দুধ ব্যবহার করে স্বাস্থ্যবান্ধব সংস্করণ তৈরি হচ্ছে। আবার কোথাও ঠান্ডা তেহ তারিক পরিবেশন করা হচ্ছে, যেখানে টানার কৌশল বজায় রেখেই পরিবেশনে ভিন্নতা আনা হচ্ছে। তবে মূল দর্শন একই রয়ে গেছে। আর তা হলো, চায়ের সঙ্গে বাতাসের মেলবন্ধন।


সম্পর্কিত নিউজ