{{ news.section.title }}
লজ্জা পেলেই কান-গাল লাল হয় কেন? জানুন অজানা তথ্য
- Author,
- Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
-
কেউ হঠাৎ সবার সামনে প্রশংসা করলে, অপ্রত্যাশিত প্রশ্নে পড়ে গেলে কিংবা অস্বস্তিকর কোনো পরিস্থিতিতে পড়লেই অনেকেরই কান ও গাল লাল হয়ে ওঠে। আয়নায় তাকালে নিজেই টের পাওয়া যায়,মুখটা কেমন যেন গরম হয়ে এসেছে, কানে রক্ত জমে উঠেছে। বিষয়টি আমরা প্রায়ই লজ্জার সঙ্গে যুক্ত করলেও, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এটি একটি বিশেষ শারীরিক প্রতিক্রিয়া। কিন্তু কখনো ভেবে দেখেছেন কি, শরীরের অন্য কোনো অংশ লাল না হয়ে কেবল মুখ আর কানই কেন রঙের জানান দেয়?
বিজ্ঞানীরা বলছেন, এর মূল কারণ হলো আমাদের শরীরের সিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম।
লজ্জা হলো এক ধরনের সামাজিক আবেগ। এটি ভয় বা রাগের মতো প্রাথমিক আবেগ নয়, বরং সমাজে নিজেকে কীভাবে দেখা হচ্ছে, এই সচেতনতা থেকেই লজ্জার জন্ম হয়। যখন কেউ মনে করেন, অন্যরা তাকে বিচার করছে, হাসতে পারে, ভুল ধরতে পারে বা নেতিবাচকভাবে ভাবতে পারে, তখনই লজ্জার অনুভূতি সক্রিয় হয়। এই মানসিক অবস্থাই শরীরের ভেতরে এক ধরনের সতর্ক সংকেত পাঠায়। এই সংকেতের কেন্দ্রবিন্দু হলো মস্তিষ্কের একটি অংশ, যা আবেগ ও বিপদের প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। যখনই আমরা লজ্জা বা বিব্রতবোধ করি, তখন আমাদের শরীরে অ্যাড্রিনালিন নামক এক বিশেষ হরমোনের নিঃসরণ বেড়ে যায়। এই হরমোনটি হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দেয় এবং শরীরের রক্তনালীগুলোকে প্রসারিত করে।
কিন্তু প্রশ্ন আসে, শরীরের অন্য অংশ নয়, কেন শুধু কান ও গালই লাল হয়?
মজার ব্যাপার হলো, শরীরের অন্য অংশের রক্তনালীগুলো সংকুচিত হলেও গাল ও কানের ত্বকের নিচে থাকা অতি ক্ষুদ্র রক্তনালীগুলো অস্বাভাবিকভাবে প্রসারিত হয়ে যায়। যেহেতু গাল ও কানের চামড়া তুলনামূলক পাতলা, তাই সেখানে অতিরিক্ত রক্তপ্রবাহ শুরু হলেই তা ত্বকের ওপর লাল আভা হিসেবে ফুটে ওঠে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মুখ মানুষের সামাজিক পরিচয়ের কেন্দ্র। আমরা অন্যের আবেগ, প্রতিক্রিয়া ও আত্মবিশ্বাস সবচেয়ে বেশি পড়ি মুখ দেখেই। তাই সামাজিক আবেগের প্রতিক্রিয়াও সবচেয়ে বেশি মুখে ফুটে ওঠে। লজ্জার সময় মুখ লাল হয়ে যাওয়া যেন শরীরের পক্ষ থেকে একটি অবচেতন বার্তাই বটে। আপনি চাইলেও আপনার শরীরের এই লাল হয়ে যাওয়া নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না। কারণ এটি সম্পূর্ণভাবে প্রাকৃতিক এবং অনৈচ্ছিক।
অনেকে ভাবেন, লজ্জা পেলে শুধু মানসিকভাবে অস্বস্তি হয়, শরীর এতে জড়িত নয়।কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি উল্টো। লজ্জা এমন একটি আবেগ, যা শরীরকে সরাসরি প্রভাবিত করে এবং সেই প্রভাব আমরা দেখতেও পাই। এটি দেখায় যে, মানুষের আবেগ কেবল মনের ভেতর সীমাবদ্ধ থাকে না। তা রক্ত, স্নায়ু ও হরমোনের মাধ্যমে পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।
এখানে আরেকটি প্রশ্ন উঠে আসে, সব মানুষের কান ও গাল কি একইভাবে লাল হয়?
উত্তর হলো না। ব্যক্তিভেদে এই প্রতিক্রিয়ার তীব্রতা ভিন্ন হয়। কারও ক্ষেত্রে সামান্য লালচে ভাব দেখা যায়, আবার কারও মুখ পুরোপুরি লাল হয়ে ওঠে। এর পেছনে কয়েকটি কারণ কাজ করে।
প্রথমত, ত্বকের রঙ ও গঠন। যাদের ত্বক তুলনামূলকভাবে ফর্সা, তাদের ক্ষেত্রে রক্তনালির প্রসারণ বেশি চোখে পড়ে। গাঢ় ত্বকের মানুষদের ক্ষেত্রেও একই শারীরিক প্রক্রিয়া ঘটলেও তা সেভাবে দৃশ্যমান না-ও হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, ব্যক্তির সংবেদনশীলতা ও মানসিক গঠন। যারা সামাজিক পরিস্থিতিতে বেশি সচেতন বা সহজে অস্বস্তি বোধ করেন, তাদের লজ্জাজনিত প্রতিক্রিয়া তুলনামূলকভাবে বেশি হয়।
আরেকটি বিষয় হলো অভ্যাস ও অভিজ্ঞতা। যারা নিয়মিত জনসমক্ষে কথা বলেন বা সামাজিক পরিস্থিতিতে বেশ অভ্যস্ত, তাদের মস্তিষ্ক এই ধরনের পরিস্থিতিকে কম হুমকি হিসেবে ধরে নেয়। ফলে তাদের স্নায়ুতন্ত্রের প্রতিক্রিয়াও তুলনামূলকভাবে কম হয়। কিন্তু যাদের অভিজ্ঞতা কম বা স্বভাবতই একটু লাজুক প্রকৃতির, তাদের ক্ষেত্রে এই প্রতিক্রিয়া বেশি তীব্র হতে পারে।
লজ্জায় লাল হয়ে যাওয়া কোনো দুর্বলতা নয়। বরং অনেক গবেষণায় দেখা গেছে, এই প্রতিক্রিয়া সামাজিক সম্পর্কে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যরা অনেক সময় লজ্জায় লাল হওয়াকে আন্তরিকতা, সততা বা মানবিকতার লক্ষণ হিসেবে দেখে। অর্থাৎ এটি সামাজিক বন্ধন তৈরিতে সহায়কও হতে পারে।
তবে আধুনিক সমাজে অনেকেই এই বিষয়টি নিয়ে অস্বস্তিতে ভোগেন। বিশেষ করে যারা জনসমক্ষে কথা বলেন, ক্লাসে প্রশ্নের উত্তর দেন বা অফিস মিটিংয়ে বক্তব্য রাখেন, তারা হঠাৎ লাল হয়ে গেলে বিব্রত বোধ করেন। এতে আত্মবিশ্বাস কমে যেতে পারে, আবার লজ্জার ভয়ে কথা বলতেই অনেকে পিছিয়ে যান।
কিন্তু মনে রাখা ভালো যে, লজ্জা একটি স্বাভাবিক মানবিক অনুভূতি। একে পুরোপুরি দূর করা সম্ভবও নয়, প্রয়োজনীয়ও নয়। বরং এই অনুভূতিকে কীভাবে সামলানো যায়, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। গভীর শ্বাস নেওয়া, নিজের দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়া বা পরিস্থিতিকে খুব গুরুত্ব না দেওয়ার মতো ছোট কিছু কৌশল স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত করতে সাহায্য করে। ফলে রক্তপ্রবাহের অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়াও ধীরে ধীরে কমে আসে।
আমাদের মধ্যে আরেকটি ভুল ধারণা রয়েছে। অনেকে ভাবেন, লজ্জায় কান ও গাল লাল হওয়া হয়তো কোনো শারীরিক সমস্যার লক্ষণ।সাধারণভাবে এটি কোনো রোগ নয়। এটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় একটি প্রতিক্রিয়া মাত্র। তবে যদি খুব অল্প উদ্দীপনাতেই অতিরিক্ত লাল হয়ে যাওয়া, দীর্ঘ সময় লালভাব না কমা বা এর সঙ্গে মাথা ঘোরা, শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ যুক্ত হয়, তখন বিষয়টি আলাদা করে দেখা প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু সাধারণ লজ্জাজনিত লাল হয়ে যাওয়া উদ্বেগের কারণ নয়।
মানুষ কেবল যুক্তি দিয়ে চলা যন্ত্র নয়, বরং অনুভূতি ও শরীরের সূক্ষ্ম সমন্বয়ে গড়া এক জীবন্ত সত্তা। লজ্জায় মুখ লাল হয়ে গেলে সেটিকে দুর্বলতা ভেবে লুকানোর চেষ্টা না করে, একে মানবিকতার স্বাভাবিক চিহ্ন হিসেবেই দেখাই হয়তো সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত দৃষ্টিভঙ্গি।