কোনটি বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সাম্রাজ্য? অমীমাংসিত ইতিহাসের সন্ধানে

কোনটি বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সাম্রাজ্য? অমীমাংসিত ইতিহাসের সন্ধানে
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

ইতিহাসে বহু সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন ঘটেছে। কিন্তু যখন প্রশ্ন আসে 'সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সাম্রাজ্য' নিয়ে, তখন অবধারিতভাবেই যে নামটি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে তা হলো রোমান সাম্রাজ্যের। তবে আপনি কি জানেন, রোমান সাম্রাজ্যের টিকে থাকার সময়সীমা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে রয়েছে চমকপ্রদ ভিন্নমত!

প্রথমে ‘সাম্রাজ্য’ শব্দটির অর্থ বোঝা জরুরি। সাম্রাজ্য বলতে সাধারণভাবে বোঝায় এমন একটি রাজনৈতিক শক্তি, যা একাধিক অঞ্চল বা জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্রীয় শাসনের অধীনে নিয়ে আসে এবং দীর্ঘ সময় ধরে সেই কর্তৃত্ব বজায় রাখে। কেবল রাজ্য বা সভ্যতা হওয়াই যথেষ্ট নয়। সাম্রাজ্যের বৈশিষ্ট্য হলো বিস্তার, প্রশাসনিক কাঠামো এবং রাজনৈতিক আধিপত্য। এই সংজ্ঞা ধরে বিচার করলে ইতিহাসে বহু শক্তিশালী সাম্রাজ্যের নাম উঠে আসে। যেমন- আকেমেনীয় পারস্য, মৌর্য সাম্রাজ্য, হান চীন, উসমানীয় সাম্রাজ্য, মুঘল সাম্রাজ্য, ব্রিটিশ সাম্রাজ্য। প্রত্যেকেই নিজ নিজ সময়ে বিশাল ভূখণ্ড শাসন করেছে। কিন্তু দীর্ঘস্থায়িত্বের প্রশ্নে সবাইকে ছাড়িয়ে যায় যে নামটি, সেটি হলো রোমান সাম্রাজ্য।

​সাধারণভাবে অনেকেই জানেন, পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটে ৪৭৬ খ্রিষ্টাব্দে। এখানেই সাধারণ পাঠ্যবইয়ের ইতিহাস শেষ হয়ে যায় বলে অনেকের ধারণা। অর্থাৎ মনে করা হয় রোমান সাম্রাজ্য টিকেছিল প্রায় ৫০০ বছর। কিন্তু ইতিহাসের আসল বিতর্ক শুরু হয় এখানেই।

রোমান সাম্রাজ্য কি সত্যিই ৪৭৬ সালে শেষ হয়ে গিয়েছিল?

ইতিহাসবিদদের বড় একটি অংশ বলেন,৪৭৬ সালে রোমান সাম্রাজ্য শেষ হয়নি। কারণ পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য, যা পরবর্তীতে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য নামে পরিচিত, সেটি নিজেকে শেষ পর্যন্ত ‘রোমান’ হিসেবেই দেখেছে। তাদের প্রশাসনিক ভাষা, আইনব্যবস্থা, সম্রাটের উপাধি সবকিছুই রোমান ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা বহন করছিল। এই পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য টিকে ছিল ১৪৫৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত, যখন অটোমান তুর্কিদের হাতে কনস্টান্টিনোপল পতন ঘটে। অর্থাৎ খ্রিষ্টপূর্ব ২৭ থেকে খ্রিষ্টাব্দ ১৪৫৩ মোট প্রায় ১৪৮০ বছর। ইতিহাসে এত দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকা আর কোনো সাম্রাজ্যের উদাহরণ নেই। আর এ কারণেই গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস রোমান সাম্রাজ্যকেই বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সাম্রাজ্যের স্বীকৃতি দেয়।

যদিও শাসনের ধরন, ভাষা ও সংস্কৃতিতে সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন এসেছে, তবু রাষ্ট্রীয় পরিচয় ও ক্ষমতার ধারাবাহিকতা অটুট ছিল। একজন বাইজেন্টাইন নাগরিক নিজেকে গ্রিক বা আলাদা জাতি হিসেবে নয়, বরং রোমান হিসেবেই পরিচয় দিতেন, এটি ইতিহাসে নথিভুক্ত।

তবে এই দাবির বিপক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ যুক্তিও রয়েছে। কেউ কেউ বলেন, পূর্ব রোমান বা বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য এতটাই ভিন্ন হয়ে গিয়েছিল যে তাকে আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে ধরা উচিত। তাদের ভাষা লাতিন থেকে গ্রিকে রূপান্তরিত হয়, সংস্কৃতি বদলে যায়, প্রশাসনিক কাঠামোও রূপান্তরিত হয়। তাই পুরো সময়কালকে একটানা রোমান সাম্রাজ্য বলা ইতিহাসের সরলীকরণ মনে করেন অনেকই।

এই যুক্তির পাল্টা হিসেবে ইতিহাসবিদরা বলেন, সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন সব সাম্রাজ্যেই আসে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যও কয়েক শতকে একরকম ছিল না, কিন্তু তাকে আমরা একই সাম্রাজ্য হিসেবেই দেখি। পরিবর্তন মানেই ভাঙন না,বরং ধারাবাহিকতা থাকাই মূল বিষয়।

আধুনিক অনেক গবেষক ভারতের পান্ড্য রাজবংশের (Pandyan Dynasty) কথাও ভুলে যান না। দক্ষিণ ভারতের এই রাজবংশ খ্রিস্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতাব্দী থেকে ১৬১৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রায় ২,০০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কোনো না কোনো রূপে টিকে ছিল বলে বহু প্রমাণ পাওয়া যায়। যদিও রোমান সাম্রাজ্যের মতো তাদের ভৌগোলিক বিস্তার বা কেন্দ্রীয় শাসন সবসময় এক ছিল না, তবুও দীর্ঘস্থায়ীত্বের বিচারে তারাও কিন্তু এক বড় বিস্ময়!

এখানে আরেকটি নাম বেশ আলোচনায় আসে,প্রাচীন মিশর। অনেকেই বলেন, প্রাচীন মিশর ছিল বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সভ্যতা,যা স্থায়ী ছিল প্রায় তিন হাজার বছর ধরে। এটি সত্য হলেও এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যও আছে। প্রাচীন মিশর দীর্ঘস্থায়ী হলেও সেটিকে অনেক ইতিহাসবিদ সাম্রাজ্য নয়, বরং একটি ধারাবাহিক সভ্যতা হিসেবে দেখেন। কারণ,এটি  সব সময় মিশর বিস্তৃত ভূখণ্ডে সাম্রাজ্যিক শাসন বজায় রাখেনি।

অন্যদিকে চীনের ক্ষেত্রেও প্রায় একই প্রশ্ন ওঠে। চীনা সভ্যতা হাজার হাজার বছর ধরে টিকে আছে। কিন্তু সাম্রাজ্য হিসেবে একটানা শাসনের ধারাবাহিকতায় ছিল না। বিভিন্ন রাজবংশ এসেছে ও গেছে। যেমন, হান, তাং, সঙ, মিং, ছিং। প্রতিটি রাজবংশ আলাদা রাষ্ট্রীয় কাঠামো গড়ে তুলেছে। ফলে একে একটানা সাম্রাজ্য বলা কঠিনই বটে।

উসমানীয় সাম্রাজ্যও দীর্ঘস্থায়ী ছিল, প্রায় ৬০০ বছরের বেশি সময় ধরে। কিন্তু সময়ের হিসাবে এটি রোমান সাম্রাজ্যের ধারেকাছেও আসে না। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত হলেও এর প্রকৃত সাম্রাজ্যিক সময়কাল তুলনামূলকভাবে অনেক কম।

রোমান সাম্রাজ্যের দীর্ঘস্থায়িত্বের পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ কাজ করেছে।

প্রথমত,এর প্রশাসনিক দক্ষতা। রোমানরা আইন, কর ব্যবস্থা ও স্থানীয় শাসনের এমন কাঠামো তৈরি করেছিল, যা বিশাল ভূখণ্ড শাসন করেও কার্যকর ছিল।

দ্বিতীয়ত,তাদের অভিযোজন ক্ষমতা। তারা নতুন সংস্কৃতি ও জনগোষ্ঠীকে পুরোপুরি ধ্বংস না করে নিজেদের ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করত।

তৃতীয়ত, সামরিক সংগঠন। রোমান সেনাবাহিনী ছিল অত্যন্ত শৃঙ্খলাবদ্ধ ও কৌশলগতভাবে উন্নত। সময়ের সঙ্গে তারা তাদের সামরিক কৌশল বদলেছে, নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে।

চতুর্থত, সাংস্কৃতিক ঐক্য। আইন, নাগরিকত্ব ও রোমান পরিচয়- এই ধারণাগুলো সাম্রাজ্যকে ভেতর থেকে একসূত্রে বেঁধে রেখেছিল।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রোমান সাম্রাজ্য নিজেকে একটি ধারণা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিল। রোম শুধু একটি শহর নয়, এটি ছিল একটি আদর্শ। এই আদর্শই পশ্চিম রোমের পতনের পরও পূর্ব রোমকে টিকিয়ে রেখেছিল আরও প্রায় এক হাজার বছর।

সুতরাং যদি আমরা সাম্রাজ্যের ধারাবাহিকতা ও রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বিচার করি, তবে ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সাম্রাজ্য ছিল রোমান সাম্রাজ্য। প্রায় দেড় হাজার বছর ধরে ভিন্ন রূপে হলেও এটি টিকে ছিল, যা মানব ইতিহাসে এক অনন্য ঘটনা।

তবে কেউ যদি সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতার ভিত্তিতে বিচার করেন, তবে প্রাচীন মিশর বা চীনকে সামনে আনবেন। কেউ যদি সাম্রাজ্যিক বিস্তার ও রাজনৈতিক ক্ষমতার হিসাব করেন, তবে রোমান সাম্রাজ্যই শীর্ষে থাকবে।

মানব সভ্যতার ইতিহাস কেবল উত্থান ও পতনের গল্প নয়, এটি অভিযোজন, পরিবর্তন ও টিকে থাকার গল্পও। আর সেই টিকে থাকার সবচেয়ে দীর্ঘ ও প্রভাবশালী উদাহরণ হিসেবে রোমান সাম্রাজ্য আজও ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে আছে। সবশেষে বলা যায়, “বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সাম্রাজ্য কোনটি”-এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমরা আসলে একটি সাম্রাজ্যের নয়, বরং মানব ইতিহাসের স্থায়িত্ব ও রূপান্তরের গল্পই নতুন করে আবিষ্কার করি।


সম্পর্কিত নিউজ