ভাঙার আগেই কি জানা সম্ভব, একটি গ্লাস কত টুকরো হবে?

ভাঙার আগেই কি জানা সম্ভব, একটি গ্লাস কত টুকরো হবে?
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

রান্নাঘরে বা ডাইনিং টেবিলে হাত ফসকে একটি কাঁচের গ্লাস পড়ে ভেঙে যাওয়া আমাদের নিত্যদিনের অতি সাধারণ একটি দৃশ্য। গ্লাসটি যখন মেঝেতে পড়ে ঝনঝন শব্দে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়, তখন আমাদের মাথায় কেবল আফসোস আর মেঝে পরিষ্কারের চিন্তাই ঘুুুরতে থাকে। কিন্তু আপনি কি কখনো ভেবে দেখেছেন, এই বিশৃঙ্খলভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কাঁচের টুকরোগুলোর মধ্যেও এক ধরণের গাণিতিক শৃঙ্খলা লুকিয়ে থাকতে পারে!

প্রথম দর্শনে কাঁচ ভাঙা সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খল মনে হলেও বিজ্ঞান বলছে, এই বিশৃঙ্খলার মধ্যেও রয়েছে নিয়ন্ত্রিত প্যাটার্ন। কাঁচ একটি ভঙ্গুর পদার্থ। এতে চাপ পড়লে তা বিকৃত না হয়ে সরাসরি ফাটল ধরে ভেঙে যায়। এই ফাটলগুলো কীভাবে ছড়াবে এবং কোথায় গিয়ে থামবে, তা  কয়েকটি নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল।

একটি কাঁচের গ্লাস ভাঙার সময় প্রধানত চারটি বিষয় ভূমিকা রাখে।

১। গ্লাসের আকৃতি ও পুরুত্ব,

২। কাঁচের ভেতরের অণুগুলোর বিন্যাস,

৩। কোথায় ও কীভাবে আঘাত লেগেছে এবং

৪। আঘাতের শক্তি কতটা।

এই উপাদানগুলো মিলেই নির্ধারণ হয় গ্লাসটি কয়টি টুকরোতে ভাগ হবে এবং সেই টুকরোগুলোর আকার কেমন হবে।

​কাঁচ যখন ভেঙে যায়, তখন এর ভেতর দিয়ে চাপের একটি তরঙ্গ বা শক ওয়েভ প্রবাহিত হয়। এই তরঙ্গটি কাঁচের দুর্বল বিন্দুগুলোকে (Stress points) খুঁজে বের করে এবং সেখান থেকেই ফাটল তৈরি করে। বিজ্ঞানের ভাষায় এই প্রক্রিয়াটিকে ফ্র্যাকচার মেকানিক্স বলা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, কাঁচ ভাঙার সময় ফাটলগুলো প্রায়ই নির্দিষ্ট কোণ বজায় রাখে। এগুলো ইচ্ছামতো ছড়িয়ে না পড়ে, ভৌত নিয়ম মেনে এগোয়।

​গবেষকরা দেখেছেন যে কাঁচের টুকরোগুলোর আকার একটি নির্দিষ্ট গাণিতিক বিন্যাস বা পাওয়ার ল ডিস্ট্রিবিউশন মেনে চলে। অর্থাৎ, একটি বড় টুকরো ভাঙলে কতগুলো মাঝারি এবং কতগুলো ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র টুকরো তৈরি হবে, তা পরিসংখ্যানের মাধ্যমে আগেভাগেই কিছুটা অনুমাযোগ্য। ​এছাড়াও, এই ভাঙনের ধরণটি অনেকটা ফ্র্যাকটাল জ্যামিতি'র মতো, যার অর্থ হলো, বড় টুকরোটির ভাঙনের নকশা এবং ছোট টুকরোটির ভাঙনের নকশার মধ্যে সাদৃশ্য থাকে।

পরিসংখ্যান বলছে, আঘাতের শক্তি যত বেশি হবে, টুকরোর সংখ্যা তত বাড়বে। কিন্তু সেই বৃদ্ধি সরলরেখায় হয় না। একটি গাণিতিক বক্ররেখা অনুসরণ করে, অর্থাৎ দ্বিগুণ শক্তি মানেই দ্বিগুণ টুকরো  নয়।

গ্লাসে যে শক্তি প্রয়োগ করা হয়, সেই শক্তি বিভিন্ন টুকরোর মধ্যে ভাগ হয়ে যায়,যা পদার্থবিজ্ঞানের শক্তি সংরক্ষণ সূত্র অনুসরণ করে। প্রতিটি নতুন ফাটল তৈরি করতে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ শক্তি প্রয়োজন হয়। তাই শক্তি সীমিত হলে ফাটলের সংখ্যাও সীমিত থাকে। এই কারণেই একই গ্লাস হালকা ধাক্কায় দুই-তিন টুকরো হলেও, শক্ত আঘাতে সেটি অসংখ্য ছোট টুকরোতে পরিণত হয়।

​কাঁচ ভাঙার এই গাণিতিক সূত্র কেবল গ্লাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনা। এই একই সূত্র ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা বড় বড় ভূমিকম্পের তীব্রতা, টেকটোনিক প্লেটের ভাঙন, এমনকি মহাকাশে গ্রহাণুর সংঘর্ষের ফলে তৈরি হওয়া ধ্বংসাবশেষের পরিমাণ ও গতিপথ বিশ্লেষণ করতে সক্ষম হোন।

কাঁচের গ্লাস ভাঙলে কত টুকরো হবে, সে প্রশ্নের উত্তর হয়তো নির্দিষ্ট সংখ্যা দিয়ে বলা যায় না। কিন্তু এটুকু নিশ্চিতভাবে বলা যায়, এই ভাঙন কোনো অজানা বিশৃঙ্খলা নয়। এর পেছনে রয়েছে গণিতের সূত্র, পরিসংখ্যানের নিয়ম এবং পদার্থবিজ্ঞানের শক্ত ভিত্তি।


সম্পর্কিত নিউজ