ভীষণ মন খারাপ? এই বইটি হতে পারে আপনার বেঁচে থাকার নতুন রসদ!

ভীষণ মন খারাপ? এই বইটি হতে পারে আপনার বেঁচে থাকার নতুন রসদ!
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

জীবন সব সময় বড় সাফল্য, নাটকীয় ঘটনা বা বিশাল কোনো এক অর্জনের মধ্য দিয়েই বদলে যায়, এই ধারণাতেই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয় রস গে–র লেখা "The Book of Delights"। বইটি কোনো আত্মউন্নয়নমূলক উপদেশের তালিকা নয়, আবার দর্শনের ভারী ভাষায় লেখা কোনো প্রবন্ধগ্রন্থও নয়। এটি এক বছরের দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট মুহূর্তকে ধরে রাখার চেষ্টা, যেগুলো আমরা প্রায়ই অনুভব করি, কিন্তু গুরুত্ব দিই না।

"The Book of Delights" মূলত এক ধরনের ব্যক্তিগত দিনলিপি। লেখক এক বছর ধরে প্রতিদিন একটি করে ‘ডিলাইট’ বা আনন্দের মুহূর্ত লিপিবদ্ধ করেছেন। আনন্দ বলতে এখানে কোনো বিশাল সুখ নয় বরং সকালের আলো, হঠাৎ পাওয়া বন্ধুর বার্তা, গাছের পাতায় রোদ পড়ার দৃশ্য, কিংবা নিঃশ্বাস নেওয়ার স্বাভাবিক অনুভূতি। বইটি এই ছোট ছোট অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখায়, যেন পাঠকও নিজের জীবনের দিকে নতুন চোখে তাকাতে শেখে। বইয়ের কাঠামো ধারাবাহিক হলেও কঠিন নয়। বইটিতে প্রতিটি অধ্যায় আলাদা আলাদা অনুভূতির প্রতিনিধিত্ব করে। বইটিতে কোথাও লেখক নিজের শৈশবের স্মৃতিতে ফিরে যান, কোথাও বা বর্তমান সমাজব্যবস্থার বৈপরীত্য নিয়ে ভাবেন, আবার কোথাও নিছক একটি দিনের হালকা আনন্দ নিয়ে থেমে যান। বইটির এই বিচিত্রতা বইটিকে একঘেয়ে হওয়া থেকে বিরত রাখে।

এই বইটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, আসলে আনন্দ বা ‘ডিলাইট’ কী? লেখক আনন্দকে সুখের স্থায়ী অবস্থা হিসেবে দেখেন না। বরং এটি ক্ষণিক, ভঙ্গুর, কখনো অপ্রত্যাশিত। ঠিক এই কারণেই এটি মূল্যবান। কারণ বড় সুখের পেছনে আমরা প্রায়ই দৌড়াই, কিন্তু আমাদের জীবনের ছোট আনন্দগুলো চোখের সামনেই থেকেও অদৃশ্য রয়ে যায়। বইটি পড়তে পড়তে বোঝা যায়, আনন্দ মানে সবরকম সমস্যা দূর হয়ে যাওয়া নয়। বরং সমস্যার মাঝেও কিছু মুহূর্ত আছে, যেগুলো মানুষকে টিকে থাকতে সাহায্য করে। এই দৃষ্টিভঙ্গি আধুনিক জীবনের বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

বইটি সরাসরি মনোবিজ্ঞানের ভাষা ব্যবহার না করলেও এর ভেতরে একটি স্পষ্ট মানসিক স্বাস্থ্য–সংক্রান্ত বার্তা রয়েছে। নিয়মিত ছোট আনন্দ খুঁজে নেওয়ার অভ্যাস মানুষের মনোযোগ বর্তমান মুহূর্তে ধরে রাখে। এতে অতীতের আফসোস বা ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা কিছুটা হলেও হালকা হয়। লেখক নিজেই স্বীকার করেন, সব দিন আনন্দে ভরা নয়। হতাশা, ক্লান্তি, সামাজিক টানাপোড়েন সবই আছে। কিন্তু এই বাস্তবতার মাঝেও যদি মানুষ সচেতনভাবে ভালো কিছু খেয়াল করতে শেখে, তাহলে জীবনের ভার কিছুটা কমে। বইটি সেই সচেতনতার অনুশীলন হিসেবে কাজ করে।

"The Book of Delights" ব্যক্তিগত অনুভূতির গল্প তবে এর ভেতরে সমাজ, পরিচয়, বর্ণবাদ, ইতিহাস  প্রসঙ্গও ধীরে ধীরে উঠে আসে। লেখক নিজের পরিচয়, নিজের জায়গা এবং চারপাশের সমাজকে পর্যবেক্ষণ করেন এবং ভিন্নভাবে ফুটিয়ে তোলেন। 

বইটি পড়ার মাধ্যমে পাঠক বুঝতে পারেন, ছোট সুখের কথা বলা মানে বাস্তবতা থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়, বাস্তবতার ভেতরেই টিকে থাকার কৌশল খোঁজা।

বইটির ভাষা সরল, কিন্তু একেবারে হালকা নয়। লেখক গভীর ভাবনা খুব সহজ বাক্যে প্রকাশ করেন। কোথাও কোথাও কাব্যিক ছোঁয়া আছে, আবার কোথাও একেবারে কথোপকথনের মতো স্বাভাবিক। এই ভারসাম্য বইটিকে সহজপাঠ্য করে তুলেছে।

লেখার মধ্যে আত্মবিশ্বাস আছে, কিন্তু আত্মকেন্দ্রিকতা নেই। লেখক নিজের অভিজ্ঞতা বলেন, তবে সেটিকে পাঠকের ওপর চাপিয়ে দেন না। বরং পাঠককে ভাবার সুযোগ দেন, এই মুহূর্তে আমার জীবনের ‘ডিলাইট’গুলো কী?

আজকাল অনেক বই-ই সুখী থাকার উপায় বলে দেয় বলে দেয়, এই কাজ করুন, ওই অভ্যাস গড়ুন। "The Book of Delights" সেই পথে হাঁটে না। এটি কোনো নির্দেশনা দেয় না, কোনো তালিকা বানায় না। বরং দেখায়, আনন্দ খুঁজে নেওয়ার ক্ষমতা মানুষের ভেতরেই আছে। শুধু তাকানোর অভ্যাসটা বদলাতে হয়।

এই কারণেই বইটি দীর্ঘদিন মনে থাকে। এটি পড়ে শেষ করার পরও পাঠক নিজের দৈনন্দিন জীবনে ছোট ছোট মুহূর্তে থামতে শেখে। সকালে জানালা দিয়ে আসা আলো, রাস্তায় হাঁটার সময় বাতাসের স্পর্শ, এসব হঠাৎ করেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে পাঠকের কাছে।

"The Book of Delights" এমন একটি বই, যা পড়তে পড়তে পাঠক নিজেই নিজের জীবনের দিকে তাকাতে শুরু করেন। এটি বড় স্বপ্ন দেখাতে চায় না, আবার বাস্তবতার কঠোরতা অস্বীকারও করে না। বরং মাঝামাঝি একটি জায়গায় দাঁড়িয়ে বলে, এখানেই জীবন, এখানেই আনন্দ। ছোট ছোট সুখ যে মানুষের ভেতরের শক্তিকে জাগিয়ে তুলতে পারে, এই বইটিই তার প্রমাণ। 

সম্পর্কিত নিউজ