প্রকৃতির সবচেয়ে বড় বিড়াল: সিংহ-বাঘের সংকর সন্তান ও সংরক্ষণের চ্যালেঞ্জ!

প্রকৃতির সবচেয়ে বড় বিড়াল: সিংহ-বাঘের সংকর সন্তান ও সংরক্ষণের চ্যালেঞ্জ!
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

আমাদের রয়েছে এক বিশাল জীব বৈচিত্র্য, রয়েছে বিভিন্ন রকমের প্রানী। তাদের মধ্যে সিংহ ও বাঘ দুটি শক্তিশালী, রাজকীয় এবং ভিন্ন আবাসভিত্তিক প্রাণী। তারা স্বাভাবিক পরিবেশে একে অপরের সঙ্গে মেশে না। কিন্তু মানুষের তত্ত্বাবধানে, বিশেষ পরিস্থিতিতে এই দুই প্রজাতির সংকর সন্তানের জন্ম হয়। এই বিরল প্রাণীর নাম লাইগার। আর ঠিক তার বিপরীত সংকর রূপটির নাম টাইগন। চেহারায় বিস্ময়কর, আকারে অবিশ্বাস্য এবং অস্তিত্বেই প্রশ্নজাগানো!

লাইগার জন্ম নেয় পুরুষ সিংহ ও মেয়ে বাঘের মিলনে। অন্যদিকে টাইগন জন্মায় পুরুষ বাঘ ও মেয়ে সিংহ থেকে। নাম শুনতে কাছাকাছি হলেও, এই দুই সংকর প্রাণীর গঠন, আকার ও শারীরবৃত্তীয় বৈশিষ্ট্যে রয়েছে বড় পার্থক্য। লাইগার সাধারণত আকারে সিংহ বা বাঘ, দু’টির চেয়েই অনেক বড় হয়। বিপরীতে, টাইগন বেশিরভাগ সময় বাবা-মায়ের আকারের কাছাকাছিই থাকে বা কখনো কখনো ছোটও হতে পারে। এই পার্থক্যের পেছনে রয়েছে জিনগত নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার সূক্ষ্ম প্রভাব।

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিড়াল কেন লাইগার?

লাইগারকে অনেকেই বলেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিড়ালজাতীয় প্রাণী। পূর্ণবয়স্ক একটি লাইগারের দৈর্ঘ্য ও ওজন সিংহ ও বাঘ উভয়কেই ছাড়িয়ে যেতে পারে। এর দেহে বাঘের ডোরা ও সিংহের গড়ন দেখা যায়। অনেক লাইগারের ক্ষেত্রে মুখাবয়বে সিংহের মতো ভাব, আবার শরীরে বাঘের মতো দাগ স্পষ্ট। এই বিশাল আকৃতির পেছনে রয়েছে জিনগত বৃদ্ধি-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ব্যতিক্রমী আচরণ। সাধারণত বাঘ ও সিংহ উভয়ের শরীরেই বৃদ্ধি সীমিত রাখার জন্য কিছু জিন কাজ করে। কিন্তু সংকর অবস্থায় এই নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া সব সময় সঠিকভাবে কাজ করে না। ফলে লাইগারের দেহ স্বাভাবিক সীমার চেয়েও বড় হয়ে ওঠে।

প্রাকৃতিক পরিবেশে কেন লাইগার নেই?

লাইগার প্রাকৃতিক পরিবেশের কোনো প্রাণী নয়। বনে সিংহ ও বাঘের আবাসভূমি আলাদা। সিংহ মূলত দলবদ্ধভাবে খোলা তৃণভূমিতে বাস করে, আর বাঘ একাকী জীবনযাপন করে ঘন অরণ্যে। এই ভৌগোলিক ও আচরণগত পার্থক্যের কারণে তাদের মিলন প্রাকৃতিকভাবে সম্ভব নয়। লাইগারের জন্ম সাধারণত ঘটে মানুষের তত্ত্বাবধানে। যেমন- চিড়িয়াখানা বা সংরক্ষণকেন্দ্রে, যেখানে দুই প্রজাতিকে একই জায়গায় রাখা হয়। এই বাস্তবতা থেকেই লাইগার নিয়ে নৈতিক প্রশ্ন উঠে আসে, এটি কি প্রকৃত সংরক্ষণ, নাকি কেবল মানুষের কৌতূহলের ফল!

টাইগন কেন তুলনামূলক ছোট?

টাইগনের ক্ষেত্রে জিনগত চিত্র কিছুটা ভিন্ন। মেয়ে সিংহের দেহে থাকা বৃদ্ধি-নিয়ন্ত্রণকারী জিন টাইগনের আকারকে সীমিত করে রাখে। ফলে টাইগন সাধারণত বিশালাকৃতির হয় না। চেহারায় তারা বাঘের ডোরা ও সিংহের কিছু বৈশিষ্ট্য বহন করলেও, লাইগারের মতো অতিরিক্ত বড় হয় না। এই তুলনা থেকেই বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন যে সংকর প্রাণীর গঠন শুধু বাবা-মায়ের প্রজাতির ওপর নয়, বরং কোনটি মা আর কোনটি বাবা, তার ওপরও গভীরভাবে নির্ভর করে।

লাইগারের আচরণ অনেক সময় সিংহ ও বাঘ এ দু’টির মিশ্রণ। কিছু লাইগার দলবদ্ধ থাকতে স্বচ্ছন্দ বোধ করে, আবার অনেকেই একাকী থাকতে পছন্দ করে। সাঁতার কাটার ক্ষেত্রে তারা বাঘের মতো স্বচ্ছন্দ। আবার গর্জনের মধ্যে সিংহের প্রভাবও দেখা যায়। তবে এই আচরণগুলো পর্যবেক্ষণ করা হয় নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে। প্রাকৃতিক বনে লাইগারের কোনো স্বতন্ত্র আচরণগত ইতিহাস নেই।

লাইগারের বিশাল দেহ যেমন দর্শনীয়, তেমনি তা স্বাস্থ্যগত চ্যালেঞ্জও তৈরি করে। অতিরিক্ত আকারের কারণে অনেক লাইগারের ক্ষেত্রে জয়েন্ট, হাড় ও হৃদযন্ত্রের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। কখনো কখনো স্নায়বিক বা হরমোনজনিত সমস্যার কথাও আলোচনায় এসেছে। এই কারণেই আধুনিক প্রাণীবিজ্ঞান লাইগারকে কোনো উন্নত প্রজাতি হিসেবে দেখে না, বরং একে জিনগত ব্যতিক্রমের উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করে।

পৃথিবীতে লাইগারের সংখ্যা এত কম কেন? 

পৃথিবীতে লাইগারের সংখ্যা খুবই সীমিত। আনুমানিক কয়েক ডজন থেকে শতাধিকের মধ্যে হতে পারে। এই সংখ্যা নির্দিষ্ট নয়, কারণ লাইগার কোনো স্বীকৃত বন্য প্রজাতি নয় এবং এদের প্রজননও নিয়মিত নয়। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, লাইগারদের বেশিরভাগই প্রজননে সক্ষম হয় না। ফলে তারা নিজেরা বংশবিস্তার করতে পারে না, যা তাদের সংখ্যাকে স্বাভাবিকভাবেই সীমিত রাখে।

লাইগারের মতো বিরল প্রাণী দেখতে বিশ্বের দূর দেশে যেতে হবে, এমন ধারণা অনেকেরই। তবে বাংলাদেশেও একসময় একটি লাইগারের উপস্থিতির খবর আলোচনায় আসে। তথ্য অনুযায়ী, খুলনার বনবিলাস চিড়িয়াখানায় একটি লাইগার সংরক্ষিত আছে বলে জানা যায়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বর্ণনায়, এই লাইগারটিকে পাচারের সময় উদ্ধার করা হয়েছিল এবং পরে সংরক্ষণে আনা হয়। এই ধরনের ঘটনা শুধু কৌতূহল তৈরি করে না, অবৈধ বন্যপ্রাণী পাচার ও সংরক্ষণের বাস্তবতাও সামনে নিয়ে আসে। লাইগারের অস্তিত্ব অনেক সময়ই মানুষের বেআইনি আগ্রহের ফল, এটি এক কঠিন সত্য।

লাইগার নিয়ে সবচেয়ে বড় বিতর্ক এখানেই যে এটি সংরক্ষণ নাকি প্রদর্শনী! যেহেতু এটি প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্টি হয় না এবং বন্য পরিবেশে টিকে থাকার সুযোগ নেই, তাই অনেক বিশেষজ্ঞ প্রশ্ন তোলেন, লাইগার তৈরি করা কি আদৌ সংরক্ষণ? সংরক্ষণ মানে সাধারণত কোনো বিপন্ন প্রজাতিকে তার প্রাকৃতিক পরিবেশে টিকিয়ে রাখা। কিন্তু লাইগার সেই সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে না। তাই আধুনিক সংরক্ষণ দর্শনে লাইগারকে দেখার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনের কথা বলা হয়।

প্রকৃতির নিয়ম ভাঙলে ফলাফল হয় ব্যতিক্রমী, কিন্তু সব সময় তা ইতিবাচক  হয় না। এটি জীববিজ্ঞানের এক জীবন্ত পাঠ, যেখানে জিন, বৃদ্ধি, আচরণ ও নৈতিকতা, সব একসঙ্গে এসে দাঁড়ায়। এই প্রাণী দেখলে বিস্ময় জাগে, কিন্তু সেই বিস্ময়ের সঙ্গে প্রশ্নও আসে, আমরা কি প্রকৃতিকে বুঝছি, নাকি কেবল নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছি?

লাইগার নিঃসন্দেহে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিড়ালজাতীয় প্রাণী হিসেবে পরিচিত। পুরুষ সিংহ ও মেয়ে বাঘের মিলনে জন্ম নেওয়া এই সংকর প্রাণী যেমন চমকপ্রদ, তেমনি জটিল। লাইগারের অস্তিত্ব কোনো রূপকথা নয়, আবার এটি প্রকৃতির স্বাভাবিক গল্পও নয়। এটি মানুষের হস্তক্ষেপে তৈরি এক বাস্তবতা, যা আমাদের কৌতূহল মেটালেও একই সঙ্গে দায়িত্ব ও নৈতিকতার প্রশ্নও সামনে নিয়ে আসে। 

সম্পর্কিত নিউজ