এক চিমটি গোলমরিচ, বড় উপকার: শীতে কেন দরকার!

এক চিমটি গোলমরিচ, বড় উপকার: শীতে কেন দরকার!
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

গোলমরিচ শুধু স্বাদের অনুষঙ্গ নয়, এটি শরীরের ভেতরের ভারসাম্য রক্ষার এক সহযোদ্ধা। শীত এলেই আমাদের শরীর ও খাদ্যাভ্যাসে এক ধরনের স্বাভাবিক পরিবর্তন লক্ষণীয় হয়। বাতাসে ঠান্ডার ছোঁয়া বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীর নিজেকে উষ্ণ রাখার জন্য অতিরিক্ত শক্তি ব্যয় করতে শুরু করেদেয়। ফলে বিপাকক্রিয়া ধীর হয়, হজমশক্তি কমে যায় এবং রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাও অনেক সময় দুর্বল হয়ে পড়ে। এই মৌসুমে সর্দি-কাশি, গলা ব্যথা, হজমের সমস্যা, শরীর ব্যথা কিংবা ক্লান্তি এসব পরিচিত অভিযোগ। ঠিক এই সময়েই আমাদের রান্নাঘরে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে কিছু উষ্ণ প্রকৃতির খাবার ও মসলা। তাদের মধ্যে গোলমরিচ অন্যতম, যার প্রয়োজনীয়তা শীতকালে শুধু স্বাদের জন্য নয়, বরং শরীরের সামগ্রিক সুস্থতার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দক্ষিণ ভারতের আদি উদ্ভিদ গোলমরিচ বর্তমানে বিশ্বের উষ্ণ ও নিরক্ষীয় অঞ্চলে ব্যাপকভাবে চাষ করা হচ্ছে। এর গোলাকার ও একবীজধারী লালচে ফলটিতে পাইপারিন নামক উপাদানের কারণে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ঝাঁঝালো স্বাদ পাওয়া যায়। প্রাচীনকাল থেকেই ইউরোপীয় ও ভারতীয় রান্নায় মসলা হিসেবে এর ব্যবহার রয়েছে। এছাড়া এতে থাকা বিভিন্ন উদ্বায়ী তেল ও রাসায়নিক উপাদান এর ঔষধি গুণাগুণকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

তবে এর কার্যকারিতা অনেক সময় আমরা সীমিত করে দেখি। কিন্তু বাস্তবে গোলমরিচ একটি শক্তিশালী প্রাকৃতিক উপাদান, যার প্রভাব শরীরের একাধিক জৈবিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত। আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞান ও বহুদিনের লোকজ অভিজ্ঞতা, দু’দিক থেকেই গোলমরিচকে শীতের খাবারের একটি অপরিহার্য অংশ হিসেবে দেখা হয়। শীতকালে আমাদের হজমব্যবস্থা সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ে। ঠান্ডা আবহাওয়ায় পাকস্থলীর কার্যকারিতা কিছুটা ধীর হয়ে যায়। উপরন্তু এই সময়ে মানুষ সাধারণত ভারী খাবার বেশি খায়। যেমন- মাংস, ডিম, ঘি, মাখন বা বেশি ক্যালরিযুক্ত রান্না। এসব খাবার শরীরকে উষ্ণ রাখলেও হজমে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। 

গোলমরিচের প্রধান সক্রিয় উপাদান পাইপারিন এই জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পাইপারিন পাকস্থলীতে হজম এনজাইম ও গ্যাস্ট্রিক রসের নিঃসরণ বাড়াতে সাহায্য করে। ফলে খাবার দ্রুত ভাঙে, পেট ভারী লাগে না এবং গ্যাস বা বদহজমের ঝুঁকি কমে। শুধু হজম নয়, শীতকালে শরীর উষ্ণ রাখার ক্ষেত্রেও গোলমরিচ কার্যকর। গোলমরিচের উষ্ণ প্রকৃতি শরীরের ভেতরের তাপ উৎপাদন প্রক্রিয়াকে সক্রিয় করে। এটি রক্তসঞ্চালন বাড়াতে সহায়তা করে, যার ফলে ঠান্ডায় হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়ার প্রবণতাও কমে। অনেকের ক্ষেত্রে শীতে পেশি শক্ত হয়ে যাওয়া বা শরীর ব্যথার সমস্যা দেখা দেয়। গোলমরিচযুক্ত খাবার রক্তপ্রবাহ উন্নত করে এই জড়তা ও ব্যথা কমাতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।

শীতকাল মানেই সর্দি-কাশির মৌসুম। ঠান্ডা বাতাসে নাক বন্ধ হয়ে আসা, গলা খুসখুস করা কিংবা কফ জমার সমস্যা খুব সাধারণ। গোলমরিচ প্রাকৃতিকভাবে কফ পাতলা করতে সাহায্য করে এবং শ্বাসনালিকে পরিষ্কার রাখে। ফলে শ্বাসপ্রশ্বাস সহজ হয়।সেজন্য বহুদিন ধরেই লোকজ চিকিৎসায় আদা, গোলমরিচ ও মধুর ব্যবহার দেখা যায়। আধুনিক গবেষণাতেও দেখা গেছে, গোলমরিচের অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বৈশিষ্ট্য শ্বাসতন্ত্রের অস্বস্তি কমাতে সহায়তা করে। রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর দিক থেকেও গোলমরিচ শীতকালে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ঠান্ডা আবহাওয়ায় শরীর নানা ধরনের ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের ঝুঁকিতে থাকে। গোলমরিচে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সক্রিয় রাখতে সাহায্য করে। এতে কোষের ক্ষতি কমে এবং শরীর রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করার শক্তি পায়। অল্প পরিমাণ হলেও গোলমরিচে ভিটামিন সি, ভিটামিন কে, আয়রন ও ম্যাঙ্গানিজের মতো পুষ্টি উপাদান রয়েছে, যা শীতকালে শরীরের প্রয়োজন মেটাতে ভূমিকা রাখে।

শীতের খাবারে গোলমরিচের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি শরীরের অন্যান্য পুষ্টি উপাদান শোষণে সহায়তা করে।পাইপারিন অন্ত্রে পুষ্টি শোষণের ক্ষমতা বাড়ায় বলে জানা যায়। বিশেষ করে হলুদে থাকা কারকিউমিনের কার্যকারিতা গোলমরিচের উপস্থিতিতে বাড়ে। তাই শীতকালে হলুদ-গোলমরিচ একসঙ্গে ব্যবহার শুধু স্বাদের জন্য নয়, বরং পুষ্টিগুণ সর্বোচ্চভাবে পাওয়ার জন্যও কার্যকর।

শীতকালে আমরা সাধারণত বাঁধাকপি, ফুলকপি, শালগম, মুলা কিংবা ডালজাতীয় খাবার বেশি খাই। এসব সবজি ও ডাল পুষ্টিকর হলেও অনেক সময় হজমে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। গোলমরিচ এই খাবারগুলোর সঙ্গে ব্যবহার করলে হজম সহজ হয় এবং গ্যাসের সমস্যাও কমে। শীতের স্যুপ, ঝোল বা সবজি রান্নায় সামান্য গোলমরিচ যোগ করলে খাবারের স্বাদ যেমন বাড়ে, তেমনি শরীরের ওপর তার ইতিবাচক প্রভাবও তৈরি হয়।



শীতকালে ওজন বাড়ার একটি প্রবণতাও লক্ষ্য করা যায়। ঠান্ডার কারণে শরীর কম সক্রিয় থাকে, ব্যায়াম কমে যায় এবং খাবারের পরিমাণ বেড়ে যায়। গোলমরিচ বিপাকক্রিয়া সক্রিয় রাখতে সাহায্য করে বলে শরীরের ক্যালরি পোড়ানোর প্রক্রিয়াকে কিছুটা গতিশীল করে। এটি সরাসরি ওজন কমানোর উপাদান নয়, তবে শীতকালে ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।

ত্বকের দিক থেকেও গোলমরিচের ভূমিকা কম নয়। শীতকালে ত্বক শুষ্ক ও রুক্ষ হয়ে ওঠে, অনেকের ক্ষেত্রে ফাটল বা চুলকানির সমস্যা দেখা দেয়। গোলমরিচ রক্তসঞ্চালন বাড়িয়ে ত্বকের কোষে পুষ্টি পৌঁছাতে সাহায্য করে। ফলে ত্বক তুলনামূলকভাবে স্বাস্থ্যকর থাকে। পাশাপাশি এর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বৈশিষ্ট্য ত্বকের ক্ষতি কমাতে সহায়তা করে।

তবে গোলমরিচ যতই উপকারী হোক, এর ব্যবহার নিয়ে সচেতনতাও দরকার। অতিরিক্ত গোলমরিচ খেলে পাকস্থলীতে জ্বালা, অম্বল বা অস্বস্তি হতে পারে। যাদের গ্যাস্ট্রিক, আলসার বা সংবেদনশীল পাকস্থলী রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে গোলমরিচ সীমিত পরিমাণে ব্যবহার করাই ভালো। শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রেও ঝালের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। শীতের খাবারে গোলমরিচের উদ্দেশ্য শরীরকে সহায়তা করা, বাড়তি অস্বস্তি তৈরি করা নয়।

অনেক পরিবারে শীতের সকালে হালকা গরম পানিতে সামান্য গোলমরিচ গুঁড়া মিশিয়ে পান করার অভ্যাস রয়েছে। এটি গলা পরিষ্কার রাখতে এবং শরীর উষ্ণ রাখতে সহায়ক বলে মনে করা হয়। আবার দুধে সামান্য গোলমরিচ যোগ করে পান করলে কাশি প্রশমনে উপকার পাওয়া যায়, এ অভ্যাসও বহু প্রজন্ম ধরে চলে আসছে। এসব অভ্যাসের পেছনে রয়েছে ভিত্তি। কারণ গোলমরিচ শ্বাসনালির অস্বস্তি কমাতে এবং শরীরের তাপমাত্রা বজায় রাখতে সহায়তা করে।

শীতের খাদ্যসংস্কৃতির দিকে তাকালেও গোলমরিচের গুরুত্ব স্পষ্ট হয়। বিভিন্ন অঞ্চলের শীতকালীন রান্নায় গোলমরিচের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। কখনো মসলার অংশ হিসেবে, কখনো হালকা ঝাল যোগ করার উপাদান হিসেবে। এটি খাবারকে শুধু সুস্বাদু করে না, বরং শীতের চাহিদা অনুযায়ী শরীরকে প্রস্তুত রাখতেও সাহায্য করে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, গোলমরিচ শীতের খাবারে একটি নীরব কিন্তু শক্তিশালী উপাদান। এটি হজমশক্তি বাড়ায়, শরীর উষ্ণ রাখে, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা জোরদার করে এবং শীতকালীন নানা অস্বস্তি কমাতে সহায়তা করে। ছোট এই কালো দানাগুলোই শীতের সময় শরীরকে ভেতর থেকে শক্ত, সক্রিয় ও সুরক্ষিত রাখতে নীরবে কাজ

সম্পর্কিত নিউজ