শীতে ঘুম কেন বাড়ে? জানেন কি লুকানো কারণ?

শীতে ঘুম কেন বাড়ে? জানেন কি লুকানো কারণ?
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

শীতের কুয়াশাচ্ছন্ন সকালে অ্যালার্ম বেজে উঠলেও চোখ খুলতে মন চায় না। কম্বল ছেড়ে উঠতে ইচ্ছে করে না, আর দিনের বেলাতেও অজান্তেই ঝিমুনি এসে ভর পড়ে। অনেকেই নিজেকে দোষ দেন, মনে করেন,"অলস বুঝি হয়ে গেছি।” কিন্তু বাস্তবে, শীতে নিদ্রা বাড়া কোনো ব্যক্তিগত দুর্বলতা নয়, এটি মানুষের শরীর ও মস্তিষ্কের গভীর জৈবিক প্রতিক্রিয়া। মানুষ প্রকৃতি থেকে আলাদা কোনো সত্তা নয়। ঋতুর পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের শরীরের ভেতরেও নীরবে বদল ঘটে। আলো কমে, তাপমাত্রা নামে, দিনের দৈর্ঘ্য ছোট হয়, এই পরিবর্তনগুলো সরাসরি প্রভাব ফেলে ঘুমের ওপর। শীতকালের নিদ্রাভাব আসলে শরীরের একটি বার্তা!

আলো কমলেই কেন ঘুম বাড়ে?

মানুষের ঘুম নিয়ন্ত্রণ করে একটি সূক্ষ্ম জৈবিক ঘড়ি, যাকে বলা হয় সার্কাডিয়ান রিদম। এই ঘড়ি সবচেয়ে বেশি নিয়ন্ত্রিত হয় সূর্যের আলো দিয়ে। গ্রীষ্মকালে দিনের আলো দীর্ঘ হওয়ায় শরীর বেশি সময় সক্রিয় থাকে। কিন্তু শীতে দৃশ্যপট বদলে যায়। শীতকালে সূর্য দেরিতে ওঠে এবং অস্ত যায় তাড়াতাড়ি। এই আলো-অন্ধকারের পরিবর্তন চোখের মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছে যায়। মস্তিষ্ক তখন বেশি পরিমাণে মেলাটোনিন নিঃসরণ শুরু করে,যা ঘুমের জন্য দায়ী। মেলাটোনিন বাড়লেই শরীর মনে করে বিশ্রাম দরকার। এই কারণেই শীতে শুধু রাতে নয়, দিনের বেলাতেও ঘুম ঘুম ভাব থাকে। এটি কোনো আলস্য নয়, বরং আলো-নির্ভর জৈবিক সংকেতের ফল।

ঠান্ডা ও শক্তি সাশ্রয়ের প্রাচীন কৌশল!

শীতের ঠান্ডা আবহাওয়ায় শরীরকে নিজের স্বাভাবিক তাপমাত্রা ধরে রাখতে বাড়তি শক্তি ব্যয় করতে হয়। এই অবস্থায় শরীর স্বাভাবিকভাবেই শক্তি সাশ্রয়ের পথ বেছে নেয়। ঘুম হলো শক্তি সাশ্রয়ের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। ঘুমের সময় শরীরের নড়াচড়া কমে, হৃদস্পন্দন ধীর হয়, শক্তির ব্যবহার ন্যূনতম পর্যায়ে নেমে আসে। এটি মানুষের একটি প্রাচীন অভিযোজন কৌশল। হাজার হাজার বছর আগে, যখন মানুষ প্রকৃতির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল ছিল, তখন শীতকালে খাবারের সংকট হতো। বেশি ঘুমিয়ে শক্তি বাঁচানোই ছিল টিকে থাকার উপায়। আধুনিক সভ্যতায় সেই সংকট না থাকলেও, শরীরের ভেতরের সেই প্রাচীন প্রোগ্রামটি আজও সক্রিয় রয়ে গেছে।

হরমোনের পরিবর্তন!

শীতে নিদ্রা বাড়ার পেছনে শুধু মেলাটোনিন নয়, আরও কিছু হরমোনের ভূমিকা রয়েছে।

⇨ সেরোটোনিনের প্রভাব: সেরোটোনিনকে বলা হয় ভালো লাগার হরমোন। এটি সক্রিয়তা, মনোযোগ ও মানসিক চাঞ্চল্যের সঙ্গে যুক্ত। সূর্যের আলো কমে গেলে অনেকের শরীরে সেরোটোনিনের মাত্রা কিছুটা কমে যায়। এর ফল হিসেবে দেখা দেয় ক্লান্তি, মনোযোগ ধরে রাখতে কষ্ট, উদ্যম কমে যাওয়া, বেশি ঘুমের প্রবণতা ইত্যাদি। এই পরিবর্তন শীতের নিস্তেজ অনুভূতিকে আরও গভীর করে তোলে।

⇨ কর্টিসল ও দৈনিক ছন্দ: কর্টিসল শরীরকে সক্রিয় রাখতে সাহায্য করে। শীতে দিনের আলো কম থাকায় কর্টিসলের স্বাভাবিক ওঠানামায় সামান্য পরিবর্তন আসে, যা সকালের সতেজতা কমিয়ে দেয়। তাই শীতের সকালে উঠতে কষ্ট হয়।

শীতকালীন খাদ্যাভ্যাস ও নিদ্রা!

শীতকালে মানুষের খাবারের ধরন বদলায়। ঠান্ডা আবহাওয়ায় শরীর বেশি ক্যালোরি চায়, তাই ভারী ও গরম খাবারের প্রতি ঝোঁক বাড়ে। ভারী খাবার হজম করতে শরীরকে বেশি শক্তি ব্যয় করতে হয়। খাবারের পর রক্তের প্রবাহ হজমপ্রক্রিয়ার দিকে বেশি চলে গেলে মস্তিষ্কে সাময়িকভাবে ক্লান্তি আসে, যা ঘুম ঘুম ভাব তৈরি করে। এছাড়া শীতে মানুষ তুলনামূলক কম পানি পান করে। এই হালকা পানিশূন্যতাও শরীরকে অবসন্ন করে তুলতে পারে, যার একটি প্রকাশ হলো বাড়তি নিদ্রাভাব।

শারীরিক গতিশীলতা কমে গেলে কী হয়?

শীতের ঠান্ডায় অনেকেই হাঁটাহাঁটি বা ব্যায়াম কমিয়ে দেন। সকালে বিছানা ছাড়তেই কষ্ট, বাইরে বেরোনোর ইচ্ছা আরও কমে যায়। শরীর যখন দিনের বেলায় কম সক্রিয় থাকে, তখন সে স্বাভাবিকভাবেই বেশি বিশ্রাম দাবি করে। ফলে রাতে ঘুম দীর্ঘ হয়, আর দিনের বেলাতেও ঝিমুনি আসে। শারীরিক গতিশীলতা কমে গেলে শরীরের অভ্যন্তরীণ ছন্দ ধীর হয়ে যায়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে নিদ্রায়।

শীত, মন ও নিদ্রার সম্পর্ক!

শীতকাল শুধু শরীর নয়, মনকেও প্রভাবিত করে। দিনের আলো কম, বাইরে যাওয়ার সুযোগও কম, এই সব মিলিয়ে সামাজিক যোগাযোগও অনেক সময় সীমিত হয়ে পড়ে। মন যখন কম উদ্দীপনা পায়, তখন সে বিশ্রামের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এই মানসিক ধীরতা নিদ্রাকে আরও বাড়িয়ে তোলে। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে শীতে মন খারাপ ভাব, আগ্রহহীনতা বা অতিরিক্ত ক্লান্তির অনুভূতি দেখা যায়। এই মানসিক পরিবর্তনও ঘুম বাড়ার একটি কারণ।




শীতের ঘুম কি স্বাভাবিক না সতর্কতার সংকেত? 

শীতে একটু বেশি ঘুম পাওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু সবকিছুরই একটি সীমা আছে। যদি ঘুমের পরও ক্লান্তি না কাটে,  দিনের বেশির ভাগ সময় নিদ্রাভাব থাকে, কাজে মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হয়। তবে সেটিকে আর স্বাভাবিক মৌসুমি পরিবর্তন বলে উড়িয়ে দেওয়া ঠিক নয়। তখন শরীরের অন্য কোনো সমস্যার ইঙ্গিত থাকতে পারে।

শীতের নিদ্রাভাব সামলানোর উপায়:

শীতকে উপেক্ষা না করে তার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াই সবচেয়ে কার্যকর পথ। সকালে যতটা সম্ভব সূর্যের আলোতে সময় কাটানো শরীরকে জাগিয়ে তুলতে সাহায্য করে। নিয়মিত হালকা ব্যায়াম শরীরের ছন্দ সক্রিয় রাখে। পর্যাপ্ত পানি পান ও নির্দিষ্ট ঘুমের সময় মেনে চললে নিদ্রার ভারসাম্য বজায় থাকে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নিজেকে অযথা দোষ না দেওয়া। শীতে ধীর হওয়া মানেই অলস হওয়া নয়।

প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের নীরব সংলাপ:

শীতকালের নিদ্রা আসলে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের শরীরের এক ধরনের সংলাপ। প্রকৃতি যখন ধীর হয়, আলো কমে, তাপমাত্রা নামে, তখন শরীরও বলে, একটু থামতে চায়। এই থামাটাই মূলত পুনরুদ্ধারের সময়। এই সময়েই শরীর নিজেকে ঠিক করে, শক্তি সঞ্চয় করে, পরের ঋতুর জন্য প্রস্তুত হয়।

শীতে নিদ্রা বাড়া কোনো আধুনিক সমস্যা নয়,এটি মানুষের জৈবিক ইতিহাসের অংশ। আলো কমে গেলে মেলাটোনিন বাড়ে, ঠান্ডায় শরীর শক্তি বাঁচাতে চায়, হরমোনের ছন্দ বদলায়। সব মিলিয়ে ঘুমের প্রয়োজন বেড়ে যায়। এই বাস্তবতাকে বোঝা মানে নিজের শরীরকে বোঝা।মানুষ যত আধুনিকই হোক না কেন, শরীর এখনো প্রকৃতির ভাষাতেই কথা বলে। 

সম্পর্কিত নিউজ