মাইগ্রেন কি সত্যিই মানসিক রোগ? সাইকোসোমাটিক তত্ত্ব ও আধুনিক বিজ্ঞানের আলোয় নতুন বিশ্লেষণ!

মাইগ্রেন কি সত্যিই মানসিক রোগ? সাইকোসোমাটিক তত্ত্ব ও আধুনিক বিজ্ঞানের আলোয় নতুন বিশ্লেষণ!
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

মাইগ্রেন বা মাথাব্যথা কি সারাজীবনই বয়ে বেড়াতে হবে!- এই প্রশ্নটি আজ শুধু আর রোগীর নয়, আধুনিক সমাজেরও। একই সঙ্গে আরও একটি শক্ত দাবি ঘুরে বেড়াচ্ছে, মাইগ্রেন নাকি মূলত সাইকোসোমাটিক, অর্থাৎ মনোদৈহিক সমস্যা, তাই ওষুধ নয়, মেডিটেশনই এর প্রকৃত সমাধান! কারও কারও বক্তব্যে শোনা যায়, বহু বছর ধরে হাজারো মানুষ মেডিটেশনভিত্তিক কোর্সে অংশ নিয়ে মাইগ্রেনকে চিরতরে বিদায় জানিয়েছেন!এই দুই বিপরীত অবস্থানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষের বিভ্রান্ত হওয়াই স্বাভাবিক।

প্রশ্ন হলো, মাইগ্রেন আসলে কী ধরনের রোগ? এর উৎসটা কি শুধুই মানসিক? মেডিটেশন কতটা কার্যকর? আর চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এসব দাবির অবস্থান কোথায়?

মাইগ্রেন হলো একটি জটিল স্নায়বিক বাস্তবতা!

মাইগ্রেনকে সাধারণ মাথাব্যথার সঙ্গে এক করে দেখা হলে সমস্যার শুরু সেখান থেকেই। মাইগ্রেন একটি ক্রনিক নিউরোলজিক্যাল কন্ডিশন, যেখানে মস্তিষ্কের স্নায়ু, রাসায়নিক বার্তাবাহক এবং রক্তনালির কার্যক্রম অস্বাভাবিকভাবে সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। মাইগ্রেনের ব্যথা সাধারণত থরথর করে ওঠে, অনেক সময় এক পাশ থেকে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে তীব্র হতে শুরু করে। এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে আলো ও শব্দে অসহ্যতা, বমিভাব বা বমি, মাথা ঘোরা, দৃষ্টিতে ঝিলমিল বা আভা, শারীরিক দুর্বলতা ও মানসিক অবসাদ। এটি কেবল ব্যথার সমস্যা নয়, এটি মানুষের কাজের ক্ষমতা, সামাজিক জীবন ও মানসিক সুস্থতাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

এক গবেষণায় মাইগ্রেনকে বিশ্বের ষষ্ঠতম অক্ষম রোগ হিসেবে বলা হয়েছে। এটি জেনেটিক হতে পারে এবং প্রায় সব বয়সের মানুষকেই প্রভাবিত করতে পারে। মাইগ্রেনের সময়কাল ব্যক্তিদের মধ্যে পরিবর্তিত হয়। বেশিরভাগ আক্রমণ কমপক্ষে ৪ ঘন্টা পর্যন্ত স্থায়ী হয়। যদি মাইগ্রেনের আক্রমণ তিন দিনের বেশি স্থায়ী হয়, সেক্ষেত্রে হাসপাতালের সেটিংয়ে চিকিৎসা করানো উত্তম।

মাইগ্রেনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর বংশগত প্রবণতা। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, পরিবারের একাধিক সদস্য এই সমস্যায় ভোগেন। এটি ইঙ্গিত দেয়, মাইগ্রেনের পেছনে নির্দিষ্ট জৈবিক সংবেদনশীলতা কাজ করে থাকে। মস্তিষ্কের কিছু স্নায়ু মাইগ্রেন রোগীদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত উত্তেজিত হয়ে পড়ে। ফলে সামান্য আলো, শব্দ, গন্ধ বা হরমোনের পরিবর্তনও ব্যথার ট্রিগার হিসেবে কাজ করতে পারে। এই বাস্তবতা মাইগ্রেনকে শুধুই মানসিক রোগ বলে চিহ্নিত করার ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয় ।

সাইকোসোমাটিক ধারণা:

সাইকোসোমাটিক বা মনোদৈহিক রোগের ধারণা ভুল নয়। মানবদেহে মন ও শরীর আলাদা কোনো সত্তা নয়। একটির প্রভাব অন্যটির ওপর পড়ে। দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, উদ্বেগ, অনিদ্রা বা দমিত আবেগ অনেক শারীরিক সমস্যাকে বাড়িয়ে তুলতে পারে। মাইগ্রেনের ক্ষেত্রেও মানসিক চাপ একটি প্রবল ট্রিগার, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু সমস্যা হয় তখনই, যখন ট্রিগারকে মূল কারণ বলে ধরে নেওয়া হয়। মাইগ্রেনকে কেবল সাইকোসোমাটিক বলা মানে হলো এর স্নায়ুবৈজ্ঞানিক, হরমোনাল ও জেনেটিক উপাদানগুলোকে উপেক্ষা করা। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এই একমাত্রিক ব্যাখ্যাকে সমর্থন করে না।

মেডিটেশন কী করে, কী করে না:

মেডিটেশন মানসিক প্রশান্তি আনে, এটি বহু গবেষণায় স্বীকৃত। নিয়মিত মেডিটেশন করলে শরীরের স্ট্রেস-হরমোনের নিঃসরণ কমে, হৃদস্পন্দন স্বাভাবিক হয় এবং স্নায়ুতন্ত্র অপেক্ষাকৃত শান্ত অবস্থায় থাকে। এই কারণেই মেডিটেশন মাইগ্রেনের ক্ষেত্রে কিছু ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। যেমন- ব্যথার ঘনত্ব কমতে পারে, ব্যথার তীব্রতা নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে বা  স্ট্রেস-জনিত ট্রিগার হ্রাস পেতে পারে। কিন্তু এখানেই সীমারেখা স্পষ্ট করা জরুরি। মেডিটেশন মাইগ্রেনের মূল রোগপ্রক্রিয়াকে সরিয়ে দেয়, এমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। এটি একটি সহায়ক পদ্ধতি মাত্র, একমাত্র চিকিৎসা নয়।

“ওষুধ নয়, মেডিটেশনই যথেষ্ট”-এই বক্তব্যের ঝুঁকি!

এই ধরনের বক্তব্য যতটা আকর্ষণীয়, ততটাই ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ এতে দুই ধরনের বিপদ তৈরি হয়।

প্রথমত, অনেক রোগী প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে দেরি করেন। মাইগ্রেন যদি দীর্ঘদিন ঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণে না থাকে, তবে এটি ক্রনিক মাইগ্রেন-এ রূপ নিতে পারে, যেখানে মাথাব্যথা প্রায় প্রতিদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়ায়। 

দ্বিতীয়ত, মাইগ্রেনের সঙ্গে অনেক সময় অন্যান্য স্নায়বিক সমস্যার উপসর্গ মিলতে পারে। শুধুমাত্র মেডিটেশনের ওপর নির্ভর করলে এসব জটিলতা অচিহ্নিত থেকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার জায়গা ও সীমাবদ্ধতা:

কেউ যদি বলেন  মেডিটেশন করে মাইগ্রেন থেকে মুক্তি পেয়েছে, তবে এই বক্তব্য তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হিসেবে সম্মানযোগ্য। কিন্তু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আর সার্বজনিক চিকিৎসা নির্দেশনা এক বিষয় নয়। একজনের ক্ষেত্রে যা কাজ করেছে, তা আরেকজনের ক্ষেত্রে একইভাবে কাজে দেবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। চিকিৎসাবিজ্ঞানে কোনো পদ্ধতি গ্রহণযোগ্য হয় তখনই, যখন তা বহু মানুষের ক্ষেত্রে, দীর্ঘ সময় ধরে, একই ধরনের ফল দেখাতে সক্ষম হয়।

বর্তমানে নানা নামে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ বা কোর্স চালু রয়েছে, যেখানে মানসিক শক্তি, ধ্যান বা ‘কোয়ান্টাম’ ধারণার মাধ্যমে রোগ সারানোর দাবি করা হয়। বিজ্ঞানে কোনো পদ্ধতি গ্রহণযোগ্য হতে হলে সেটিকে ব্যক্তিগত দাবি নয়, বরং যাচাইযোগ্য তথ্যের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। নচেৎ সেটি অনুপ্রেরণামূলক অভিজ্ঞতা হিসেবে থাকতে পারে, কিন্তু চিকিৎসা হিসেবে নয়।

আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা মাইগ্রেনকে একমাত্রিকভাবে দেখে না। বরং এটি গুরুত্ব দেয় সমন্বিত ব্যবস্থাপনায়।যেমন-

⇨ প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ
⇨ নিয়মিত ও পর্যাপ্ত ঘুম।
⇨ ট্রিগার শনাক্ত ও এড়িয়ে চলা।
⇨ খাদ্যাভ্যাস ও পানি গ্রহণের ভারসাম্য।
⇨মানসিক চাপ কমানোর কৌশল।
⇨ প্রয়োজনে মেডিটেশন বা রিল্যাক্সেশন থেরাপি।

এই সমন্বিত পদ্ধতিই দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত ও নিরাপদ।

মাইগ্রেন কোনো দুর্বল মন বা কাল্পনিম রোগ নয়, আবার এটি শুধুই ওষুধের বিষয়ও নয়। এটি এমন একটি জটিল স্নায়বিক অবস্থা, যেখানে শরীর ও মন দু’টিই ভূমিকা রাখে। মেডিটেশন একটি মূল্যবান সহায়ক অভ্যাস, যা মাইগ্রেন ব্যবস্থাপনায় উপকার দিতে পারে।স্বাস্থ্য নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, সচেতনতা ও বাস্তব তথ্য। 

সম্পর্কিত নিউজ