হাসপাতালের নবজাতকের পাশে বেগুনি প্রজাপতি! এর অর্থ জানেন কি?

হাসপাতালের নবজাতকের পাশে বেগুনি প্রজাপতি! এর অর্থ জানেন কি?
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

নবজাতকের কান্না, হাসি, নরম ফুট ফুটে দেহ, দৃশ্যটি স্বাভাবিকভাবেই পরিবারের সবাইকে আনন্দে ভরিয়ে দেয়। কিন্তু কখনো কখনো এই আনন্দের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে এক গভীর, নিঃশব্দ শোক। বিশেষ করে কিছু হাসপাতাল এই অনুভূতিকে বোঝাতে নবজাতকের ইনকিউবেটর বা খাটের পাশে ছোট বেগুনি প্রজাপতির স্টিকার ব্যবহার করে। সাধারণ চোখে এটি শুধুমাত্র একটি সামান্য স্টিকার বা স্নেহের চিহ্ন মনে হতে পারে, কিন্তু এর অন্তর্নিহিত অর্থটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। এই প্রতীকটি মূলত নির্দেশ করে,এই শিশুটি বেঁচে আছে, কিন্তু গর্ভাবস্থায় বা জন্মের সময় তার যমজ বা সহোদর এক বা একাধিক শিশু হারিয়েছে। অর্থাৎ জন্মের আনন্দের সঙ্গে লুকিয়ে থাকে অপরিণত বা হারানো জীবনের স্মৃতি।

বেগুনি প্রজাপতি একাধিক স্তরে মানবিক ও সাংকেতিক অর্থ বহন করে থাকে। ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে এক হৃদয়বিদারক অথচ অনুপ্রেরণামূলক ঘটনার মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু হয় ‘পার্পল বাটারফ্লাই’ বা বেগুনি প্রজাপতি প্রকল্পের। মিল স্মিথ এবং লুইস ক্যান দম্পতির ঘরে অকালপক্ব যমজ কন্যা শিশু ক্যালি এবং স্কাইয়ের জন্ম হয়। তবে দুঃখজনকভাবে, স্কাই অ্যানেন্সেফালি নামক এক জটিল জন্মগত ত্রুটি নিয়ে জন্মগ্রহম করেছিল এবং জন্মানোর মাত্র তিন ঘণ্টার মধ্যেই সে মারা যায়। তখন অন্য বোন ক্যালিকে সুস্থ করে তোলার জন্য  এনআইসিইউ-তে (NICU) রাখা হয়েছিল। সেখানেই স্মিথ ও ক্যান এক অদ্ভুত একাকীত্ব অনুভব করেন। হাসপাতালের কর্মীরা ধীরে ধীরে স্কাইয়ের কথা বলা বন্ধ করে দেন এবং আশেপাশের অন্য অভিভাবকরাও জানতেন না যে এই দম্পতি তাদের এক সন্তানকে হারিয়েছেন।এরপর এক সকালে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা স্মিথকে মানসিকভাবে বেশ বিপর্যস্ত করে তোলে। সেখানে থাকা অন্য এক মা, যিনি নিজেও যমজ সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন, স্মিথকে উদ্দেশ্য করে বলেন যে তিনি খুবই ভাগ্যবান যে তাকে যমজ সন্তানের দেখাশোনা করতে হচ্ছে না। এই মন্তব্যটি ছিল স্মিথের জন্য অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক। এই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে, কোনো মা-বাবাকে যেন ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে না হয়। স্মিথ এই শোক ও সচেতনতার প্রতীক হিসেবে বেগুনি প্রজাপতিকে বেছে নেন। তার মতে প্রজাপতিটি সেই শিশুদের প্রতীক যারা অকালে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে বা উড়ে গেছে। আর বেগুনি রঙটি হলো এমন একটি রঙ যা ছেলে বা মেয়ে উভয় শিশুর ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা যায়। বর্তমানে অনেক হাসপাতালের ইনকিউবেটরে এই বেগুনি প্রজাপতি চিহ্নটি ব্যবহার করা হয়। এটি অন্য পরিবার এবং কর্মীদের মনে করিয়ে দেয় যে, এই শিশুটি তার এক বা একাধিক ভাই-বোনকে হারিয়েছে, যাতে সবাই তাদের সাথে কথা বলার সময় আরও সংবেদনশীল থাকেন।


কেন হাসপাতালগুলো এটি ব্যবহার করে?

হাসপাতালে নতুন পরিবার বা দর্শনার্থীরা সাধারণভাবে অনেকসময়ই জিজ্ঞেস করতে পারেন,“আরেকটা বাচ্চা কোথায়?” বা “তোমরা যমজ হলে তো দারুণ হত!” কিন্তু এ ধরনের সাধারণ কথাই শোকাহত বাবা-মায়ের জন্য গভীর আঘাত হয়ে দাঁড়াতে পারে। বেগুনি প্রজাপতির উপস্থিতি এই ক্ষতির তথ্য নীরবভাবে জানিয়ে দেয়, যাতে হাসপাতালের সবাই সংবেদনশীলভাবে যোগাযোগ করতে পারে। তাছাড়া ডাক্তার, নার্স এবং অন্যান্য কর্মীরা এই প্রতীক দেখে বোঝেন যে পরিবারটি সন্তান হারানোর বেদনা সহ নতুন শিশুর যত্নে নিয়োজিত। এতে তারা কথাবার্তা, চিকিৎসা নির্দেশনা এবং মানসিক সহায়তা আরও যত্নসহকারে দেন। কখনো কখনো কিছু পরিবারের জন্য বারবার একই শোকের গল্প বলা কিছুটা কঠিন হয়ে পড়ে। বেগুনি প্রজাপতিটি সেক্ষেত্রে একটি সমাধান হয়ে নিরবে কাজ করে। 

এটি পরিবারে কেমন প্রভাব ফেলে?

পরিবার এবং নবজাতকের সংস্পর্শে থাকা কর্মীরা প্রায়শই লক্ষ্য করেন যে, বেগুনি প্রজাপতির উপস্থিতি মানসিকভাবে একটি সান্ত্বনার প্রতীক হিসেবেও কাজ করে। বাবা-মায়ের জন্য এটি নিঃশব্দে “আমরা আপনার শোক বুঝছি” বার্তা দেয়। এটি একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করে যেখানে পরিবারের সদস্যরা শিশুর যত্নে মনোনিবেশ করতে পারে, বারবার কষ্টের স্মৃতি পুনরায় না মুখে আনলেও।

বিশ্বব্যাপী এই উদ্যোগের উদ্ভব:

Purple Butterfly Project উদ্যোগটি মূলত উন্নত দেশের হাসপাতালগুলোতে শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডার মতো দেশগুলিতে নবজাতক ইউনিটে মানসিক সহায়তা এবং সংবেদনশীলতার অংশ হিসেবে এটি গ্রহণযোগ্য। ধীরে ধীরে এটি ছড়িয়ে পড়ে অন্যান্য দেশে, যদিও এখনও অনেক হাসপাতাল এটি ব্যবহার করে না। এই উদ্যোগ মূলত একটি মানবিক ও আবেগগত নির্দেশিকা।

বেগুনি প্রজাপতি মূলত হাসপাতালের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের একটি চিহ্ন। আধুনিক চিকিৎসা শারীরিক যত্নের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য, শোক এবং পরিবারিক আবেগকেও সমান গুরুত্ব দেয়। নবজাতক ইউনিটে কর্মরত নার্সদের জন্য এটি একটি মৌন স্মরণ। 

বাংলাদেশে বেগুনি প্রজাপতি ব্যবহার:

বাংলাদেশে এখনও এটি খুব প্রচলিত নয়। তবে মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি, মাতৃত্বকালীন যত্ন ও পরিবারিক সহায়তার গুরুত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক হাসপাতাল এতে আগ্রহী হতে পারে। বিশেষ করে NICU (নবজাতক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট) এবং মাতৃত্বকালীন ওয়ার্ডগুলোতে এটি একটি মানবিক উদ্যোগ হিসেবে পরিচিত হতে পারে।

নবজাতকের পাশে বেগুনি প্রজাপতি কেবল একটি স্টিকার বা প্রতীক নয়। এটি একটি নীরব বার্তা, যা বোঝায়, জন্মের আনন্দের সঙ্গে হারানোর বেদনা ও সংবেদনও আছে।শিশুর জন্মই এক জীবনের বড় ঘটনা, কিন্তু কখনো কখনো সেই জন্মের সঙ্গে যুক্ত থাকে হারানো একাধিক প্রাণের গল্প। বেগুনি প্রজাপতি সেই গল্পকে শান্তভাবে, নিঃশব্দে স্বীকার

সম্পর্কিত নিউজ