কম কাজেও বেশি ফল পাওয়া সম্ভব? ‘রেস্ট’ বইটি পড়লেই বুঝবেন!

কম কাজেও বেশি ফল পাওয়া সম্ভব? ‘রেস্ট’ বইটি পড়লেই বুঝবেন!
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

ব্যস্ততা এখন আর শুধু বাস্তবতা নয়, অনেকের কাছে এটি গর্বের বিষয়ও। যত বেশি কাজ, যত কম ঘুম, তত বেশি সফল। এই ধারণাই যেন আধুনিক কর্মজীবনের অঘোষিত নীতি হয়ে উঠেছে । ঠিক এসময়ে সকলের এই বিশ্বাসকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে একটি বই, “Rest: Why You Get More Done When You Work Less”।

এটি কোনো অনুপ্রেরণামূলক স্লোগানের বই নয়, বরং তথ্য, পর্যবেক্ষণ ও মানবিক বাস্তবতার সমন্বয়ে লেখা এমন এক বিশ্লেষণ, যা কাজ ও বিশ্রামের সম্পর্ক নিয়ে আমাদের চেনা ধারণাগুলোকে নড়বড়ে করে দেয়। এই বইটি মূলত একটি প্রশ্ন দিয়ে পাঠককে ভাবতে বাধ্য করে যে আমরা কি সত্যিই বেশি কাজ করছি, নাকি শুধু বেশি সময় ব্যয় করছি? আর এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে লেখক আমাদের নিয়ে যান ইতিহাস, মনোবিজ্ঞান, সৃজনশীল মানুষের জীবনকথা এবং আধুনিক কর্মসংস্কৃতির একদম গভীরে।

বইটির মূল ভাবনা:

বইটির সবচেয়ে শক্তিশালী বার্তা হলো, বিশ্রাম আর কাজ একে অপরের শত্রু নয়। বরং বিশ্রামই কাজকে অর্থবহ ও ফলপ্রসূ করে তোলতে সাহায্য করে। লেখক দেখিয়েছেন, মানুষ যখন বিশ্রামকে অলসতা ভেবে এড়িয়ে চলে, তখন সে নিজের কর্মক্ষমতাকেই ধ্বংস করে। 

বইটিতে বারবার একটি বিষয় স্পষ্ট করা হয়েছে, মানুষ যন্ত্র নয়। মানুষের মস্তিষ্ক ও শরীরের একটি স্বাভাবিক ছন্দ আছে। সেই ছন্দ ভেঙে টানা কাজ করালে উৎপাদনশীলতা বাড়ে না, বরং ধীরে ধীরে কমে যায়। এই কথাটি বইটি শুধু যুক্তি দিয়েই নয়,বাস্তব উদাহরণ দিয়েও বোঝাতে চেয়েছে।


এই বইয়ের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, এটি বিশ্রামের ধারণাকে নতুন কোনো ফ্যাশন হিসেবে উপস্থাপন করেনি। বরং দেখিয়েছে, ইতিহাসের বহু সফল চিন্তাবিদ, বিজ্ঞানী ও সৃজনশীল মানুষ কীভাবে নিয়মিত বিশ্রামকে তাদের কাজের অংশ বানিয়েছিলেন। লেখক দেখান, অনেক গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার বা চিন্তার জন্ম হয়েছে কাজের টেবিলে বসে নয়, বরং হাঁটতে হাঁটতে, অবসর সময়ে বা সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো কাজে মগ্ন থাকার সময়। অর্থাৎ বিশ্রাম তখনই কার্যকর, যখন এটি মস্তিষ্ককে ভিন্নভাবে সক্রিয় করে।

“রেস্ট” বইটি বর্তমান কর্মসংস্কৃতির একটি নীরব কিন্তু তীক্ষ্ণ সমালোচনা। লেখক দেখিয়েছেন, দীর্ঘ সময় কাজ করলেও প্রকৃত ফল অনেক সময় খুব সীমিত হয়। কারণ ক্লান্ত মস্তিষ্ক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, নতুন চিন্তা তৈরি করতে পারে না। ফলে সময় বাড়লেও কাজের মান বাড়ে না।


মস্তিষ্ক কীভাবে বিশ্রামে কাজ করে?

বইটির অন্যতম শক্তিশালী দিক হলো এটি বিশ্রামের সময় মস্তিষ্কে কী ঘটে, সেটিকে সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করেছে। বিশ্রাম মানে মস্তিষ্ক বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়। বরং তখনই মস্তিষ্ক তথ্য সাজায়, সমস্যার ভিন্ন সমাধান খোঁজে এবং শেখা বিষয়গুলোকে স্থায়ী করে। এই অংশে লেখক দেখিয়েছেন, কেন অনেক সময় একটি সমস্যার সমাধান আমরা জোর করে খুঁজে পাই না, কিন্তু কিছুক্ষণ দূরে গেলে হঠাৎ মাথায় চলে আসে। এটি মস্তিষ্কের একটি  স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।


বইটি বিশ্রামকে শুধু ঘুমের মধ্যে সীমাবদ্ধ করেনি। এখানে ঘুম, কাজের ফাঁকে বিরতি, অবসর সময়, এমনকি সৃজনশীল অবকাশসবকিছুকেই বিশ্রামের অংশ হিসেবে দেখা হয়েছে।বিশেষভাবে ঘুম নিয়ে বইটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়। তা হলো ঘুম কমিয়ে কাজ বাড়ানো মানে ধার করা শক্তি দিয়ে কাজ করা। এই ধার একসময় সুদে-আসলে ফেরত দিতে হয়, মানসিক ক্লান্তি ও ভুলের মাধ্যমে।

“রেস্ট” বইটি কখনোই কাজ কম করার অলস আহ্বান জানায় না। বরং এটি বলে, অপ্রয়োজনীয় কাজ কমাও, মনোযোগের সঙ্গে প্রয়োজনীয় কাজ করো। এই দৃষ্টিভঙ্গি আধুনিক ব্যস্ততার সংস্কৃতি’র ঠিক বিপরীত। লেখক দেখিয়েছেন, যাঁরা সীমিত সময় কাজ করেন, তাঁদের অনেক সময় ফোকাস বেশি থাকে। কারণ তাঁরা জানেন যে শক্তি সীমিত, তাই সেটি বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ব্যবহার করতে হবে।

বইটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে বিশ্রামের সম্পর্ক। অতিরিক্ত কাজ যে শুধু শারীরিক ক্লান্তি নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে মানসিক অবসাদ, বিরক্তি ও আগ্রহহীনতা তৈরি করে, এ বিষয়টি বইটি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। লেখকের মতে, দীর্ঘদিন ভালোভাবে কাজ করতে চাইলে বিশ্রাম কোনো বিকল্প নয়, এটি একটি শর্ত।

 এই বইটি যাদের জন্য-

এই বইটি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক যাঁরা দীর্ঘ সময় কাজ করেও সন্তুষ্ট ফল পাচ্ছেন না। সবসময় ক্লান্ত, কিন্তু আবার কাজ থামাতে ভয় পান। যাঁরা সৃজনশীল বা চিন্তাভিত্তিক কাজে যুক্ত।তাছাড়া যাঁরা কাজ ও জীবনের ভারসাম্য নিয়ে ভাবছেন। তবে এটি কিন্তু কোনো তাত্ক্ষণিক সমাধানের বই নয়। বরং ধীরে ধীরে নিজের কাজের ধরন ও মানসিকতা পর্যালোচনা করার একটি আয়না মাত্র।

“রেস্ট” বইটির ভাষা বেশ সহজ, কিন্তু ভাবনা একটু গভীর। এটি গবেষণার ভারে ভারী নয়, আবার হালকা মোটিভেশনাল কথাতেও সীমাবদ্ধ নয়। তথ্য, গল্প ও বিশ্লেষণের মধ্যে একটি স্বচ্ছ ভারসাম্য রাখা হয়েছে, যা বইটিকে পড়তে সাবলীল করে তোলে।
 

সম্পর্কিত নিউজ