নকল মাংস থেকে গরুর ঢেকুর, শৈবাল হয়ে উঠছে জলবায়ুর নতুন অস্ত্র!

নকল মাংস থেকে গরুর ঢেকুর, শৈবাল হয়ে উঠছে জলবায়ুর নতুন অস্ত্র!
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নেই, এটি পরিনত হয়েছে বর্তমানের বাস্তবতায়। অনিয়মিত বৃষ্টি, তীব্র তাপপ্রবাহ, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি - এসব কিছুর পেছনে মূল চালিকাশক্তি একটাই, অতিরিক্ত গ্রিনহাউস গ্যাস। এই গ্যাসের বড় অংশ আসে শিল্পকারখানা, জ্বালানি পোড়ানো আর আশ্চর্যজনকভাবে, খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা থেকে। বিশেষ করে পশুপালন খাত থেকে নির্গত মিথেন গ্যাস জলবায়ু সংকটকে আরও তীব্র করে তুলছে। এই জটিল পরিস্থিতির মাঝেই বিজ্ঞানীরা নতুন করে তাকাচ্ছেন এক অতি সাধারণ কিন্তু শক্তিশালী জীবের দিকে আর তা হলো, শৈবাল।

চোখে দেখা সবুজ বা বাদামি এই ক্ষুদ্র জীবটিই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। কারণ শৈবাল শুধু পরিবেশবান্ধব নয়, এটি খাদ্য, কৃষি ও শিল্প সব ক্ষেত্রেই জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় বাস্তবসম্মত সমাধান দিতে পারে।

শৈবাল কী এবং কেন এটি এত গুরুত্বপূর্ণ?

শৈবাল হলো এক ধরনের জলজ উদ্ভিদজাত জীব, যা সূর্যালোক ব্যবহার করে কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করে এবং অক্সিজেন উৎপন্ন করে। এই প্রক্রিয়াটিই পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের ভারসাম্য রক্ষায় হাজার হাজার বছর ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। শৈবালের একটি বৈশিষ্ট্য হলো, এটি খুব দ্রুত বেড়ে ওঠে এবং অল্প জায়গায় বিপুল পরিমাণ কার্বন ধরে রাখতে পারে। স্থলভাগের অনেক উদ্ভিদের তুলনায় শৈবাল কয়েক গুণ বেশি দক্ষতার সঙ্গে কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করতে সক্ষম। এখানেই জলবায়ু সমাধানে এর সম্ভাবনার সূত্রপাত।

পরিবেশবান্ধব খাদ্যের নতুন দিগন্ত!

বিশ্বজুড়ে গরু, ভেড়া ও অন্যান্য গবাদিপশু পালনের জন্য বিপুল পরিমাণ জমি, পানি ও খাদ্যশস্য ব্যবহার হয়। শুধু তাই নয়, এই প্রাণীগুলো হজম প্রক্রিয়ায় মিথেন গ্যাস নির্গত করে, যা কার্বন ডাই অক্সাইডের চেয়েও বেশি ক্ষতিকর গ্রিনহাউস গ্যাস। এই সমস্যার একটি বিকল্প হিসেবে উঠে এসেছে নকল মাংস বা উদ্ভিদভিত্তিক প্রোটিন। এখানেও শৈবালের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। শৈবাল প্রাকৃতিকভাবে প্রোটিন, অ্যামিনো অ্যাসিড ও স্বাস্থ্যকর ফ্যাট সমৃদ্ধ। ফলে এটি মাংসের বিকল্প খাদ্য তৈরিতে কার্যকর কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা যায়। শৈবালভিত্তিক খাদ্য উৎপাদনে জমির প্রয়োজন কম হয়,পানিও লাগে তুলনামূলকভাবে অল্প, এবং পরিবেশের ওপর চাপও অনেক কমে। এর মাধ্যমে খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন এনে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

গরু ও অন্যান্য রোমন্থক প্রাণীর হজম প্রক্রিয়ায় মিথেন গ্যাস উৎপন্ন হয়, যা মূলত ঢেকুরের মাধ্যমে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। বৈজ্ঞানিকভাবে এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলেও এর সম্মিলিত প্রভাব জলবায়ুর জন্য মারাত্মক। এই সমস্যার সমাধানে বিজ্ঞানীরা পশুখাদ্যের দিকে নজর দিয়েছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, নির্দিষ্ট ধরনের শৈবাল পশুখাদ্যে মেশালে গরুর হজম প্রক্রিয়ায় মিথেন উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। শৈবালের কিছু যৌগ গরুর পাকস্থলীতে মিথেন উৎপাদনকারী জীবাণুর কার্যক্রমকে বাধা দেয়। ফলে পরিবেশের ওপর অনেক কম ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তার করেই, একই পরিমাণ দুধ বা মাংস উৎপাদন করা সম্ভব হয়।

জলবায়ু পরিবর্তনের মূল সমস্যা হলো অতিরিক্ত কার্বন ডাই অক্সাইড। শৈবাল এই সমস্যার বিরুদ্ধে সরাসরি কাজ করে। এটি দ্রুত বেড়ে ওঠার সময় বিপুল পরিমাণ কার্বন শোষণ করে নিজের দেহে আটকে রাখে। এই শোষিত কার্বন যদি খাদ্য, জ্বালানি বা অন্যান্য পণ্যে রূপান্তর করা যায়, তাহলে বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়। এটিকে বলা যায় প্রাকৃতিক কার্বন ক্যাপচার পদ্ধতি, যা প্রযুক্তিনির্ভর সমাধানের তুলনায় অনেক কম ব্যয়বহুল ও পরিবেশবান্ধব।

জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো জলবায়ু সংকটের অন্যতম বড় কারণ। শৈবাল থেকে জৈব জ্বালানি উৎপাদনের ধারণা এই নির্ভরতা কমাতে পারে।শৈবালের দেহে প্রাকৃতিক তেলজাত উপাদান থাকে, যা প্রক্রিয়াজাত করে জ্বালানি তৈরি করা সম্ভব। এই জ্বালানি পোড়ালে যে কার্বন নির্গত হয়, তা শৈবাল বেড়ে ওঠার সময় বায়ুমণ্ডল থেকেই শোষিত হয়েছিল। ফলে সামগ্রিকভাবে কার্বনের ভারসাম্য অনেকটাই বজায় থাকে।

শৈবাল শুধু খাদ্য বা জ্বালানি নয়, কৃষিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম।শৈবালভিত্তিক জৈব সার মাটির উর্বরতা বাড়ায় এবং রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা কমায়। রাসায়নিক সার উৎপাদন ও ব্যবহারের ফলে যে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হয়, শৈবাল সার সেই চাপ কমাতে পারে। এছাড়া শৈবাল মাটিতে পানিধারণ ক্ষমতা বাড়ায়, যা জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট খরা মোকাবেলায় সহায়ক।

সমুদ্রের বিশাল অংশ জুড়ে শৈবাল ইতিমধ্যেই প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠে। এই সামুদ্রিক শৈবাল কার্বন শোষণ করে সমুদ্রের অম্লতা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। উপকূলীয় এলাকায় শৈবাল চাষ করলে এটি ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ক্ষতি কমাতেও ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে এটি উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জন্য বিকল্প আয়ের উৎস হিসেবেও কাজ করতে পারে, যা জলবায়ু অভিযোজনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

চ্যালেঞ্জ ও বাস্তবতা:

যদিও শৈবালকে ঘিরে আশার আলো অনেক, তবুও কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বড় পরিসরে শৈবাল উৎপাদনের জন্য প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও বিনিয়োগ দরকার। এছাড়া খাদ্য হিসেবে এর গ্রহণযোগ্যতা, স্বাদ ও সংস্কৃতিগত অভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আরেকটি বিষয় হলো, শৈবাল কোনো একক সমাধান নয়। এটি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার একটি অংশমাত্র। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমানো, বন সংরক্ষণ ও টেকসই জীবনধারা গড়ে তোলার সঙ্গে সঙ্গে শৈবালভিত্তিক সমাধানগুলো কার্যকর হবে।

বিশ্ব যখন জলবায়ু সংকটের বাস্তবতা মেনে নিতে শুরু করেছে,ঠিক তখন সমাধানও খোঁজা হচ্ছে প্রকৃতির ভেতরেই। শৈবাল তারই, অসাধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি উদাহরণ। নকল মাংসের প্রোটিন জোগানো থেকে শুরু করে গরুর ঢেকুরে মিথেন কমানো, কার্বন শোষণ থেকে জ্বালানি উৎপাদন, শৈবাল একসঙ্গে বহু সমস্যার সমাধানে ভূমিকা রাখতে পারে। এটি দেখিয়ে দেয়, প্রযুক্তি ও প্রকৃতির সমন্বয়েই জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে কার্যকর লড়াই সম্ভব।

শৈবাল দেখতে ক্ষুদ্র ও সাধারণ হলেও এর প্রভাব হতে পারে বৈশ্বিক। জলবায়ু পরিবর্তনের মতো জটিল সমস্যার সমাধান কোনো একক পথে আসে না। কিন্তু শৈবাল সেই সমাধানগুলোর মধ্যে একটি শক্তিশালী, বাস্তব ও বৈজ্ঞানিক ভিত্তিসম্পন্ন পথ দেখাচ্ছে।

সম্পর্কিত নিউজ