মস্তিষ্ক কেটে নিরাময়! লোবোটোমি কীভাবে মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ চিকিৎসা বিপর্যয়ে পরিণত হলো?

মস্তিষ্ক কেটে নিরাময়! লোবোটোমি কীভাবে মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ চিকিৎসা বিপর্যয়ে পরিণত হলো?
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

একটা সময় ছিল, যখন আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান নিজেকে অজেয় মনে করত! মনে করা হতো মানুষের মন, আচরণ ও আবেগও অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ঠিক করে দেওয়া সম্ভব। সেই আত্মবিশ্বাস থেকেই জন্ম নিয়েছিল একটি ভয়ংকর ধারণা, যার নাম লোবোটোমি। বহু দশক ধরে এটিকে মানসিক রোগের যুগান্তকারী সমাধান হিসেবে প্রচার করা হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হয়ে ওঠে তথাকথিত এই চিকিৎসা আসলে মানুষের ব্যক্তিত্ব, স্মৃতি ও মানবিক সত্তাকে ধ্বংস করার এক নিষ্ঠুর প্রক্রিয়া ছিল। আজ ইতিহাসের পাতায় লোবোটোমি আর চিকিৎসার প্রতীক নয়, বরং এটি চিকিৎসাবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তাগুলোর একটি। যেখানে ভুল ধারণা, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং মানবিকতার অভাব একত্র হয়ে ভয়াবহ ট্র্যাজেডির জন্ম দিয়েছিল।

মানসিক রোগ চিকিৎসার এক অন্ধকার অধ্যায়!

বিশ শতকের প্রথমার্ধে মানসিক রোগ নিয়ে সমাজের ধারণা ছিল সীমিত এবং ভীতিকর। বিষণ্নতা, উদ্বেগ, স্কিজোফ্রেনিয়া বা ট্রমায় আক্রান্ত মানুষদের অনেক সময় সমাজ থেকে আলাদা করে রাখা হতো। চিকিৎসার বিকল্প ছিল অপ্রতুল, ওষুধ ছিল প্রায় অনুপস্থিত, আর মানসিক হাসপাতালগুলো অনেক ক্ষেত্রে বন্দিশালার মতো আচরণ করত। এই প্রেক্ষাপটেই চিকিৎসাবিজ্ঞানের একাংশ বিশ্বাস করতে শুরু করে, মানসিক রোগের মূল কারণ মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশের অস্বাভাবিক কার্যকলাপ। যদি সেই অংশটিকে কেটে বা নষ্ট করে দেওয়া যায়, তাহলে রোগী শান্ত হবে, নিয়ন্ত্রণে আসবে, ‘স্বাভাবিক’ হয়ে উঠবে। এই চিন্তাধারাই লোবোটোমির ভিত্তি তৈরি করে।

লোবোটোমি কী এবং কেন এটি করা হতো?

লোবোটোমি মূলত একটি অস্ত্রোপচার, যেখানে মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল লোব-এর সঙ্গে অন্যান্য অংশের সংযোগ ইচ্ছাকৃতভাবে কেটে বা ধ্বংস করে দেওয়া হতো। ফ্রন্টাল লোব মানুষের ব্যক্তিত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, আবেগ, সামাজিক আচরণ এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এই অস্ত্রোপচারের লক্ষ্য ছিল তীব্র বিষণ্নতা কমানো, উদ্বেগ ও আতঙ্ক দমন করা এবং মানসিক অস্থিরতা কমানো, এমনকি সমাজের চোখে অবাধ্য আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা। আজকের দৃষ্টিতে এই লক্ষ্যগুলো অবৈজ্ঞানিক ও নৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য মনে হলেও, তখন অনেক চিকিৎসক একে মানবিক সমাধান বলেই বিশ্বাস করতেন।

লোবোটোমির মুখ ও আতঙ্ক:

লোবোটোমির ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত নাম ওয়াল্টার ফ্রিম্যান। তিনি একজন নিউরোলজিস্ট ছিলেন, কিন্তু সার্জনের আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই তিনি এই অস্ত্রোপচার জনপ্রিয় করে তোলেন। ফ্রিম্যানের সবচেয়ে কুখ্যাত অবদান ছিল ট্রান্সঅরবিটাল লোবোটোমি,একটি পদ্ধতি যা ভয়াবহতার দিক থেকে চিকিৎসা ইতিহাসে আলাদা জায়গা করে নিয়েছে। এই পদ্ধতিতে রোগীর চোখের কোটরের ওপর দিয়ে বরফ ভাঙার যন্ত্রের মতো দেখতে একটি লম্বা সুচ ঢুকিয়ে মস্তিষ্কের ভেতরে ফ্রন্টাল লোবের সংযোগ ছিন্ন করা হতো। সবচেয়ে আতঙ্কজনক বিষয় ছিল, অনেক সময় এই অস্ত্রোপচার সম্পূর্ণ অচেতন না করেই করা হতো। এই ক্ষেত্রে দ্রুততা ছিল ফ্রিম্যানের গর্ব। কয়েক মিনিটের মধ্যেই চিকিৎসা শেষ হয়ে যেত। তিনি একে এমনভাবে উপস্থাপন করতেন যেন এটি দাঁত তোলার মতোই সাধারণ কোনো প্রক্রিয়া।

সংখ্যার আড়ালে মানবিক বিপর্যয়:

হাজার হাজার মানুষ এই লোবোটোমির শিকার হয়েছেন। কাগজে-কলমে অনেককে সফল চিকিৎসা হিসেবে দেখানো হয়েছিল, কারণ অস্ত্রোপচারের পর তারা শান্ত হয়ে যেতেন, আর চিৎকার করতেন না, বিদ্রোহ করতেন না। কিন্তু বাস্তব চিত্র ছিল ভয়াবহ! অনেক রোগীর ক্ষেত্রে ব্যক্তিত্ব সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছিল। অনেকের আবেগ প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। স্মৃতিশক্তি দুর্বল বা বিলুপ্ত হয়ে পড়েছিল কারো কারো। সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে গিয়েছিল অনেকের। তারা বেঁচে থাকতেন, কিন্তু নিজের মতো করে আর বাঁচতে পারতেন না। পরিবারের সদস্যরা বলতেন শরীরটি ফিরে পেয়েছেন, কিন্তু মানুষটি আর নেই!

‘শান্ত’ মানেই কি সুস্থ?

লোবোটোমির সবচেয়ে বড় বিভ্রান্তি ছিল শান্ত হওয়াকে সুস্থতার সমান ধরে নেওয়া। অস্ত্রোপচারের পর অনেক রোগী আর রাগ করতেন না, কান্নাকাটি করতেন না, প্রশ্ন তুলতেন না। চিকিৎসাব্যবস্থা এটিকে সাফল্য হিসেবে দেখেছিল। কিন্তু আসলে এটি ছিল মানুষের আবেগ ও আত্মসত্তাকে নিস্তব্ধ করে দেওয়ার ফল। আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞান বলছে, ফ্রন্টাল লোব ধ্বংস করা মানে মানুষের নৈতিক বিচারক্ষমতা, সামাজিক বোধ, আত্মপরিচয় সবকিছুর ওপর সরাসরি আঘাত হানা।

নারী ও সমাজের দুর্বলদের ওপর প্রয়োগ:

লোবোটোমির আরেকটি অন্ধকার দিক ছিল এর বাছাইহীন ব্যবহার। শুধু গুরুতর মানসিক রোগ নয়, অনেক ক্ষেত্রে নারীদের অবাধ্য আচরণ, সামাজিকভাবে অস্বস্তিকর বলে বিবেচিত ব্যক্তিত্ব, পরিবারের বোঝা মনে হওয়া সদস্যদের ওপরও লোবোটোমি প্রয়োগ করা হয়েছিল। আজকের দৃষ্টিতে, এই অস্ত্রোপচার অনেক সময় চিকিৎসার চেয়ে নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের আত্মস্বীকৃতি ও পতন:

সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বাস্তবতা আর লুকিয়ে রাখা যায়নি। গবেষণা, পর্যবেক্ষণ এবং রোগীদের দীর্ঘমেয়াদি অবস্থার বিশ্লেষণে দেখা যায় লোবোটোমি মানসিক রোগ সারায় না বরং স্থায়ী স্নায়বিক ক্ষতি সৃষ্টি করে। রোগীর জীবনমান ভয়াবহভাবে কমিয়ে দেয়। এদিকে ধীরে ধীরে মানসিক রোগের জন্য কার্যকর ওষুধ এবং নতুন থেরাপির উদ্ভব ঘটে। তখন চিকিৎসাবিজ্ঞান বাধ্য হয় সত্য মেনে নিতে। এক সময় যে পদ্ধতিকে বিপ্লব বলা হয়েছিল, সেটিই পরিণত হয় চিকিৎসাবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটিতে। ধীরে ধীরে লোবোটোমি নিষিদ্ধ হয় এবং পরিত্যক্ত হয়।

লোবোটোমি আজ আর চালু নেই, কিন্তু এর স্মৃতি চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিবেক হিসেবে রয়ে গেছে। এটি মনে করিয়ে দেয়, ভালো উদ্দেশ্য থাকলেই যে পদ্ধতি মানবিক হয়, তা নয়। বিজ্ঞানকে এগোতে হলে প্রয়োজন প্রমাণ, সহানুভূতি ও সীমা জানা। এক সময় যাকে জাদুকরী নিরাময় মনে করা হয়েছিল, সেটিই যে হাজার হাজার মানুষের জীবন নিঃশব্দে ধ্বংস করেছিল।লোবোটোমির ইতিহাস সেই নির্মম সত্যেরই দলিল!

সম্পর্কিত নিউজ