হুইলচেয়ারের গণ্ডি পেরিয়ে নতুন স্বপ্ন,এক্সোস্কেলিটন বদলে দিচ্ছে প্রতিবন্ধী মানুষের জীবন !

হুইলচেয়ারের গণ্ডি পেরিয়ে নতুন স্বপ্ন,এক্সোস্কেলিটন বদলে দিচ্ছে প্রতিবন্ধী মানুষের জীবন !
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

হাঁটা, দাঁড়ানো কিংবা নিজের শরীরের ভার বহন, যে কাজগুলো সুস্থ মানুষের কাছে একেবারেই স্বাভাবিক, প্রতিবন্ধী মানুষের কাছে সেগুলো অনেক সময় হয়ে ওঠে আজীবনের সংগ্রাম। দুর্ঘটনা, স্নায়বিক জটিলতা বা জন্মগত সমস্যার কারণে যাঁরা চলাচলের সক্ষমতা হারিয়েছেন, তাদের জীবনে সবচেয়ে বড় সংকট হলো স্বাধীনতা হারানো। এই বাস্তবতায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এক যুগান্তকারী সংযোজন হয়ে উঠছে রোবটিক এক্সোস্কেলিটন। এটি মানুষের শরীরের বাইরে পরিধেয় এক ধরনের বুদ্ধিমান যান্ত্রিক কাঠামো, যা চলাফেরার ক্ষমতাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে। প্রতিবন্ধী মানুষের জীবনকে সহানুভূতির চোখে দেখার যুগ পেরিয়ে এখন চলছে ক্ষমতায়নের যুগ। আর সেই পরিবর্তনের কেন্দ্রে অবস্থান করছে রোবটিক এক্সোস্কেলিটন প্রযুক্তি।

এক্সোস্কেলটন, ব্যবহারকারীর শরীরে যান্ত্রিক মিথস্ক্রিয়া এবং বল প্রয়োগের মাধ্যমে গতি, ভঙ্গিমা বা শারীরিক কার্যকলাপ বৃদ্ধি করে, সক্ষম করে, সহায়তা করে। এটি একটি যান্ত্রিক ফ্রেম বা কাঠামো, যা মানুষের শরীরের বাইরে পরা হয় এবং শরীরের নড়াচড়াকে সহায়তা করে। প্রকৃতিতে যেমন কাঁকড়া বা পোকামাকড়ের দেহে প্রাকৃতিক এক্সোস্কেলিটন থাকে, তেমনি আধুনিক বিজ্ঞান মানুষের জন্য তৈরি করেছে কৃত্রিম এক্সোস্কেলিটন। রোবটিক এক্সোস্কেলিটন সাধারণত পা, হাঁটু, কোমর ও পিঠকে ঘিরে থাকে এবং  সেন্সর ও মোটরের মাধ্যমে নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণ করে। এটি ব্যবহারকারীর শরীরের ভার বহন করতে সক্ষম। এই যন্ত্র মানুষের নিজস্ব স্নায়বিক সংকেত বা শরীরের সামান্য নড়াচড়াকে শনাক্ত করে তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কাজ করে।

শারীরিক প্রতিবন্ধকতা শুধু চলাফেরার সমস্যা নয়, এটি মানসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটও সৃষ্টি করে । হুইলচেয়ারের ওপর নির্ভরশীল জীবন মানেই  শারীরিক জটিলতা, আত্মবিশ্বাসে ভাঙন, সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণে বাধা। রোবটিক এক্সোস্কেলিটন এই নির্ভরতার দেয়াল ভাঙতে শুরু করেছে। এটি ব্যবহার করে অনেক প্রতিবন্ধী মানুষ আবার দাঁড়িয়ে কথা বলতে পারছেন, নিজে নিজে হাঁটার অভিজ্ঞতা পাচ্ছেন, দৈনন্দিন কাজে অংশগ্রহণ বাড়াচ্ছেন।

এটি কেবল যান্ত্রিক সহায়তা নয়, বরং মানসিক পুনর্জাগরণও বটে।

প্রযুক্তি যেভাবে কাজ করে:
সেন্সর প্রযুক্তি,যা শরীরের ভঙ্গি, ওজনের চাপ ও সামান্য পেশী সংকোচন শনাক্ত করতে সেন্সর ব্যবহার করা হয়। মোটর ও অ্যাকচুয়েটর অংশগুলো হাঁটু ও পায়ের নড়াচড়াকে শক্তি জোগায়,যা  ঠিক মানুষের পেশীর মতো কাজ করে। কন্ট্রোল অ্যালগরিদম যন্ত্রটি ব্যবহারকারীর গতিবিধি বুঝে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেয়, যেমন- কখন পা তুলবে, কখন নামাবে। এই সমন্বিত ব্যবস্থার ফলেই যন্ত্রটি মানুষের চলাফেরার স্বাভাবিক ছন্দ অনুকরণ করতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রোবটিক এক্সোস্কেলিটন শুধু চলাফেরা করতেই সাহায্য করে না, বরং স্নায়বিক পুনর্বাসনেও বেশ ভালো ভূমিকা রাখে। এটির নিয়মিত ব্যবহারে মস্তিষ্ক ও শরীরের মধ্যে স্নায়বিক সংযোগ সক্রিয় হতে পারে। পেশীর শক্তি ও ভারসাম্য উন্নত হয়। দীর্ঘমেয়াদে আংশিক স্বাভাবিক চলাচলের সম্ভাবনাও তৈরি হয়। এ কারণে অনেক ক্ষেত্রেই এক্সোস্কেলিটনকে পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

স্বনির্ভরতার অর্থ বদলে দিচ্ছে প্রযুক্তি!

স্বনির্ভরতা মানে শুধু অর্থনৈতিক সক্ষমতা নয়, বরং নিজের কাজ নিজে করার স্বাধীনতা। রোবটিক এক্সোস্কেলিটন ব্যবহারে কাউকে ধরে দাঁড়াতে হয় না। ফলে সহায়তা ছাড়া ছোট দূরত্ব হাঁটা সম্ভবপর হয়। নিজের সিদ্ধান্তেই চলাফেরা করা যায়। এই স্বাধীনতাই প্রতিবন্ধী মানুষের আত্মমর্যাদা পুনর্গঠনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে।

একসময় প্রতিবন্ধী মানুষদের সমাজ দেখত সহানুভূতির চোখে। এখন প্রযুক্তি দেখাচ্ছে, সঠিক সহায়তা পেলে তাঁরাও আমাদের সমাজের সক্রিয় অংশ হতে পারেন। রোবটিক এক্সোস্কেলিটন, কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ায়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চলাচল সহজ করে এবং সমাজে অন্তর্ভুক্তির ধারণাকে শক্তিশালী করে। এটি কেবল একজন ব্যক্তিকেই নয়, পুরো সমাজের চিন্তাধারাকেই পরিবর্তন করে দিচ্ছে।

চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতা:
সব সম্ভাবনার মাঝেও কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে-

⇨ যন্ত্রের উচ্চমূল্য
⇨ দীর্ঘ সময় ব্যবহারে শারীরিক ক্লান্তি
⇨ সবার জন্য সমানভাবে উপযোগী না হওয়া

তবে গবেষণা ও উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় এসব সীমাবদ্ধতাও দিন দিন কমে আসছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভবিষ্যতের রোবটিক এক্সোস্কেলিটন হবে আরও হালকা, আরও বুদ্ধিমান, ব্যক্তিভেদে সম্পূর্ণ কাস্টমাইজড। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বায়োনিক প্রযুক্তির সংযোগে এক্সোস্কেলিটন কেবল সহায়ক যন্ত্র নয়, শরীরের এক স্বাভাবিক অংশে পরিণত হয়ে যেতে পারে।

রোবটিক এক্সোস্কেলিটন কোনো কল্পবিজ্ঞান নয়। এটি বাস্তবতার এক শক্তিশালী উদাহরণ, যেখানে প্রযুক্তি মানুষের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করার হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য এটি শুধু হাঁটার যন্ত্র নয়, এটি স্বপ্ন দেখার সাহস, নিজের ওপর আস্থা এবং স্বনির্ভর জীবনের প্রতীক।

সম্পর্কিত নিউজ